ইমাম হোসাইন রাজু

নি¤œমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণে বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনাসহ দিনদিন বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি। গত এক মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২০ জনের। এছাড়া ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এই বিস্ফোরণ ঘটছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতনমহল।
কেবল গ্যাস সিলিন্ডার নয়, প্রাকৃতিক গ্যাসের লাইন বিস্ফোরণের ঘটনাতেও বাড়েছে হতাহতের সংখ্যা। এছাড়াও যানবাহনে ব্যবহার করা নি¤œমান সিলিন্ডারের কারণে গত দেড় মাসে মেডিকেলের তথ্য অনুযায়ী দুর্ঘটনার সংখ্যাও কম নয়। এসব সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর রি-টেস্টের নিয়ম থাকলেও তা মানছেন না কেউই। সর্বশেষ গত সোমবার রাতে কর্ণফুলী শিকলবাহায় জাহাজের কাজ করতে গিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হন মানিক হোসেন, হীরক মোল্লা ও সাজ্জাদ হোসেন নামে তিন শ্রমিক। এদের মধ্যে সাজ্জাদ ও হীরক মোল্লাকে চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করেন। বাকি সাজ্জাদ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর আগে ৯ নভেম্বর নগরীর বহদ্দারহাটের এক কিলোমিটার এলাকায় বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাবার পথে সিএনজি ট্যাক্সির সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয় এক শিশুসহ পাঁচজন। এদের মধ্যে সৈয়দ আমেনা বেগম নামের এক নারীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। আরেকজনের অবস্থা অশংঙ্কাজনক। একইদিন বাঁশখালীতে মাইক্রোবাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়। তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান মাইক্রোবাসে থাকা যাত্রীরা। গত ১ নভেম্বর হাটহাজারীতে সিএনজি ট্যাক্সির সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৫ জনকে আনা হলে ৪ জনই মৃত্যুবরণ করেন। এর আগেও ৯ জুলাই বাঁশখালী উপজেলায় পণ্যবাহী মিনি ট্রাকের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এবং ওই গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে একটি মোটরসাইকেলের আরোহীসহ ছয়জন গুরুতর দগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তিনজনের।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের তথ্য অনুসারে, গত দেড় মাসে বার্ন ইউনিটে ভর্তি হন প্রায় দেড়শ রোগী। এদের মধ্যে বেশিরভাগ রোগীই ছিলেন গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত। এর মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত রোগীর সংখ্যাই ৪৯ জন। ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসাশেষে গত দেড় মাসে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন ৯২ জন। আর মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। এর আগে গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তঃবিভাগের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ৯শ ৮৪ জন। এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৭৭ জনের। সর্বমোট হিসেব অনুযায়ী গত দশ মাসে দগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৩ জনের। এর মধ্যে গত জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়।
বার্ন এ- প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ পূর্বকোণকে বলেন, গত দেড়মাসে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত রোগী। এসব রোগীদের নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছি। আমাদের এখানে মাত্র ২৬ শয্যার বেড। কিন্তু আজ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫০ জন। বাধ্য হয়ে আমরা তাদের বাইরে চিকিৎসা দিচ্ছি।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় গ্যাস সংক্রান্ত যত দুর্ঘটনা ঘটেছে বেশিরভাগই অসচেতনতার অভাবে হয়েছে। একটু সচেতন হলেই প্রাণহানির মতো দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, নি¤œমানের গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণেই মূলত এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে বাজারে নি¤œমানের সিলিন্ডার দখল করে নিয়েছে। আর যানবাহনের যে সকল দুর্ঘটনা ঘটছে তা অবশ্যই মালিক ও চালকদের গাফেলতির কারণেই ঘটছে। আমরা এ বিষয়ে একাধিক যানবাহন সমিতিকে বিনা পয়সায় চালকদের সচেতনতার জন্য প্রশিক্ষণ দিতে বলেছি। কিন্তু তাদের এ বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখিনি।
তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বিস্ফোরণ একটি বোমার মতোই ক্ষতিসাধন করে থাকে। যার ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতা ও আইনে বাধ্যবাধকতা না থাকায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকি দিনদিন বেড়েই চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন এবং যানবাহনের মালিক ও চালকের অবহেলায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ নিয়ে চট্টগ্রামের সড়কগুলোতে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে সিলিন্ডারযুক্ত লক্ষাধিক যানবাহন। এসব সিলিন্ডার ব্যবহার এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই যানবাহনে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠছে। ভুয়া সনদ দেখিয়ে পুরোনো সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন অনেকেই।
যানবাহন সিএনজি রূপান্তরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুসারে, গত ১৫ বছরে সিএনজি, বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কারসহ প্রায় দেড় লাখ যানবাহন সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এসব গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর পরীক্ষা করানোর কথা থাকলেও তা মানছেন না বেশিরভাগ গাড়ির মালিক।
সিএনজি রূপান্তরণ প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকো সিএনজি কনভার্সনের ম্যানেজার এসএম বাবুল দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, সড়কে চলাচল করা যানবাহনগুলোর ৮০ শতাংশ গাড়িতে সিএনজি সিলিন্ডার বসানো আছে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর এসব গাড়ি রি-টেস্ট করানোর কথা থাকলেও বেশিরভাগ যানবাহন রি-টেস্ট করে না। এছাড়া অধিকাংশ গাড়ির মালিকরা কমদামে লোকাল দোকান থেকে সিলিন্ডার বসিয়ে নেয়। যার মধ্যে অধিকাংশ সিলিন্ডারের মেয়াদ থাকেই না। এর ফলেই এসব বিস্ফোরণসহ বড় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শহীদুলাøহ পূর্বকোণকে বলেন, যে সকল গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটছে এদের বেশিরভাগ গাড়ি বৈধ নয়। এছাড়াও গাড়িতে লাগানো সিলিন্ডার অবৈধ ও মেয়াদউত্তীর্ণ। এখন পর্যন্ত যে সকল গাড়ির সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে তার বেশিরভাগই অবৈধ। প্রতিটি সিলিন্ডারের নির্দিষ্ট একটি মেয়াদ থাকে। কিন্তু এ সিলিন্ডারগুলো এখন থেকে প্রায় ১০ বা ১৫ বছর আগে লাগানো। যার ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। রি-টেস্ট সার্টিফিকেট ছাড়া আমরা কখনোই গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করি না। যেসব গাড়িতে সিলিন্ডারের মেয়াদ থাকে সেগুলোকে আমরা ফিটনেস সার্টিফিকেট দিয়ে থাকি। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানিই মূলত রি-টেস্ট করে থাকে। এরপরও আমরা প্রতিনিয়ত সড়কে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি।

Share
  • 42
    Shares