জিগারুল ইসলাম জিগার, রাঙ্গুনিয়া

রাঙ্গুনিয়ার ১৫ ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা ও বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর খরন্দ্বীপ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৭ সংসদীয় আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের প্রধান দল বিএনপি থেকে মনোনয়ন কে পাচ্ছেন তা নিয়ে ধুম্্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার (১৩ নভেম্বর) পর্যন্ত ৮ জন সম্ভাব্য প্রার্থী বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে এই আসনে লড়তে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। আরো ৪ জনের মনোনয়ন সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক দল এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি মো. নুরুল আলমও এই আসন থেকে প্রার্থী হতে লড়ছেন। আশির দশক থেকে রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপির গোড়াপত্তন ঘটানোর অন্যতম কারিগর তিনি। ১৯৯১ সালের ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিএনপি মনোনীত

প্রার্থী ছিলেন। রাজনীতির নানা ধাপ পেরিয়ে তিনি এখন গাঁটছড়া বেঁধেছেন কর্নেল অলি আহমদের এলডিপির সাথে। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে রাঙ্গুনিয়া আসন থেকে বিএনপির টিকেটে পরপর দু’বার এমপি নির্বাচিত হন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসি হওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রাউজানের মরহুম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামীলীগের প্রার্থী ড. হাছান মাহমুদের কাছে হেরে কারাবন্দী হবার পর থেকেই রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হতে শুরু হয়। বর্তমানেও বিএনপিতে বিবদমান তিনটি গ্রুপ লড়ছে মনোনয়নযুদ্ধে। পাল্টাপাল্টি দুটি কমিটিও রয়েছে বিএনপির। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পরিবারের অনুসারী গ্রুপটি চাচ্ছে তাঁর ছেলে ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে প্রার্থী করতে। তাদের অনুসারী কমিটির আহবায়ক শওকত আলী নুর ও যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক মহসিন। তাদের নেতৃত্বে রাঙ্গুনিয়া বিএনপির বৃহত্তর অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন চৌধুরী পরিবার। এর বাইরে আরেকটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন উত্তর জেলা বিএনপির আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব কারান্তরীণ নেতা আসলাম চৌধুরী। তাঁর অনুমোদিত কমিটির সভাপতি অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন বাহার, সাধারণ সম্পাদক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবু আহমেদ হাসনাত। তবে এই কমিটির সভাপতি হিসেবে কুতুব উদ্দিন বাহার পরিচয় বহন করলেও সাধারণ সম্পাদক বিরত রয়েছেন। বিবদমান এই দুটি গ্রুপের বাইরে আশির দশকে রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপির রাজনীতির গোড়াপত্তন ঘটাতে কাজ করা গ্রুপটিকে ছায়া দেন কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। তিন গ্রুপের একাধিক নেতা দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন গতকাল। আজকালের মধ্যে আরো কয়েকজন দলীয় মনোনয়ন নেবেন বলে বিএনপি সূত্র জানায়। তবে কে হচ্ছেন দল বা জোটের প্রার্থী তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে জল্পনা কল্পনার শেষ নেই।
চৌধুরী পরিবারের অনুসারীদের দাবি, মরহুম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী অথবা স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরীকে মনোনয়ন দিলে জয় নিশ্চিত করা যাবে। বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত হুম্মাম কাদের চৌধুরীর গ্রীন সিগন্যাল পেয়ে তাঁর জন্য দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে সোমবার রাতে রাঙ্গুনিয়া বিএনপির আহবায়ক শওকত আলী নুর ও অধ্যাপক মো. মহসিনের নেতৃত্বে শতাধিক নেতাকর্মী ঢাকায় যান। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে যথারীতি নেতাকর্মীরা মনোনয়ন ফরম নিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে মনোনয়ন ফরম না নিয়ে ফেরত আসেন। এ খবরে ধুম্্রজালের সৃষ্টি হয় নেতাকর্মীদের মাঝে। প্রতিপক্ষের কেউ কেউ রটাচ্ছেন চৌধুরী পরিবার নির্বাচন করবে না। তবে উপজেলা বিএনপির একাংশের যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক মো. মহসিন বলেন, নির্বাচনের তফসিল পেছানোয় সময় পাওয়া গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই হুম্মাম কাদের আসবেন লন্ডন থেকে। তাই তিনি আসলেই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে জমা করা হবে। অন্য একটি সূত্র জানায়, ভোটের মাঠে নামার আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হচ্ছে কিনা তা বুঝতে আরো একটু পর্যবেক্ষণ করতে চায় চৌধুরী পরিবার। তাই আপাতত মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে বারণ করা হয় নেতাকর্মীদের। হুম্মাম কাদেরের জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ না করলেও তার চাচা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী গতকাল রাঙ্গুনিয়া আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। তিনি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে রাঙ্গুনিয়া থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে গিয়াস কাদের চৌধুরী নিজের আসন রাউজান থেকে রাঙ্গুনিয়াকে বেশি নিরাপদ মনে করছেন বলে সূত্র জানায়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পরিবারের পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ব্যাপারে এখনো কোন প্রকাশ্য ঘোষণা না আসায় রাঙ্গুনিয়ায় স্থানীয়ভাবে প্রার্থী তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। চৌধুরী পরিবারের বাইরে গতকাল পর্যন্ত রাঙ্গুনিয়া আসনে লড়তে বিএনপির মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইউনুছ চৌধুরী, সিনিয়র বিএনপি নেতা আজম খাঁন, উপজেলা বিএনপি নেতা শিল্পপতি আলহাজ ইলিয়াছ চৌধুরী, উত্তর জেলা বিএনপির বিগত কমিটির সহ শিল্প বিষয়ক সম্পাদক মো. আইয়ুব, উপজেলা বিএনপির অপর পক্ষের সভাপতি বর্তমানে কারান্তরীণ অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন বাহার, উত্তর জেলা জিয়া পরিষদের আহবায়ক রোটারিয়ান জসিম উদ্দিন চৌধুরী ও উত্তর জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মুরাদ চৌধুরী। রাঙ্গুনিয়া আসনে বিএনপির প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সেক্ষেত্রে হুম্মাম কাদের চৌধুরী প্রার্থী হবার সম্ভাবনা অনেকটা নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক মহসিন। হুম্মাম কাদেরই নির্বাচন করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, এর বাইরে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া অন্যদের ধারা সম্ভব হবে না। সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, অবস্থা বুঝে চৌধুরী পরিবার ভোটের মাঠ থেকে বিরত থাকলে তাদের পছন্দনীয় প্রার্থীকে দাঁড় করানো হবে রাঙ্গুনিয়ায়। সেক্ষেত্রে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবু আহমেদ হাসনাত অথবা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আলহাজ শওকত আলী নুর প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা যায়। কাল-পরশু তারাও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করবেন বলে জানান। উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইউনুছ চৌধুরী বলেন, বিএনপি গণতান্ত্রিক দল। কোন ব্যক্তি বা পরিবারের কাছে দলের কার্যক্রম থেমে থাকতে পারে না। সবার অধিকার আছে মনোনয়ন চাওয়ার। উত্তর জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি আনছুর উদ্দিন বলেন, রাঙ্গুনিয়া আসনে হুম্মাম কাদের বিএনপির প্রার্থী হবেন এটা অনেকটা নিশ্চিত। দলীয় কর্মী সমর্থকের পাশাপাশি চৌধুরী পরিবারের আলাদা ইমেজ রয়েছে রাঙ্গুনিয়ায়। উপজেলা বিএনপির আহবায়ক শওকত আলী নুর বলেন, এলাকায় তাঁরা কোনো দলীয় কর্মসূচি পালন করতে পারেন না। মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে অধিকাংশ দলীয় নেতা শহরে থাকেন। হুম্মাম কাদেরই বিএনপির প্রার্থী হবেন এটা নিশ্চিত। তবে কোন কারণে এর ব্যত্যয় ঘটলে তিনি মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান। ২০ দলীয় জোটের শরীক দল এলডিপি নেতা মো. নুরুল আলম দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন এবং জোটের কাছে রাঙ্গুনিয়া আসনটি কর্র্নেল অলি আহমদ অগ্রাধিকার ভিত্তেতে দাবি করেছেন জানিয়ে উপজেলা এলডিপির আহবায়ক সাবেক চেয়ারম্যান ফজলুল কাদের তালুকদার জানান, ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নুরুল আলমের নেতৃত্বে রাঙ্গুনিয়ার আনাচে-কানাচে যে পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে তা এখনো দৃশ্যমান। রাঙ্গুনিয়ার মানুষ তাঁকে ভোলেনি। তিনি ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হলে জয় সহজ হবে বলে তিনি জানান।

Share
  • 22
    Shares