নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা অফিস

নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মতবিভেদ জিইয়ে রেখেই গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। ভোট কবে হবে, আদৌ হবে কিনা-এমন সংশয়ের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন জানালো আগামী ২৩ ডিসেম্বর হবে একাদশ জাতীয় সংসদের ভোট। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে ভোটের এই তফিসল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। সরকারি প্রচার মাধ্যমে এই ভাষণ প্রচার করার পরেই উল্লাস দেখা গেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের জোটসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। উল্টোদিকে, হতাশা ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন কুড়ি দলের জোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তাৎক্ষণিক মনোভাব স্পষ্টভাবে আঁচ করা যায়নি।
সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে তারা দুই দফা সংলাপ করলেও সমাধান মিলেনি। এ অবস্থায় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে আরও সংলাপ চেয়ে তফসিল ঘোষণার দিন-তারিখ পিছানোর দাবি করা হয়েছিল। তবে নির্বাচন কমিশন সেই দাবিতে কান না দিয়েই গতরাতে তফসিল ঘোষণা করলো। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৯ নভেম্বর সোমবার, বাছাই ২২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২৯ নভেম্বর বৃহস্পতিবার। ভোটগ্রহণ ২৩ ডিসেম্বর রবিবার।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যুগ্ম সাধারণ মাহবুব উল আলম হানিফ নিজের সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে, একটা উৎসবমুখর পরিবেশে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে যে ধোঁয়াশা দুই একটি দল সৃষ্টি করেছিল, সেই ধোঁয়াশাটা কেটে গেল।’ সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী জাতীয় পার্টির কো চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘ইসিকে স্বাগত জানাই। জাতীয় পার্টি দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করে। জাতীয় পার্টি নির্বাচনমুখী দল।’
এদিকে, বিরোধী বিএনপির তরফে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, সরকারের ইচ্ছাতেই একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এই তফসিল জনগণের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হয়নি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম অংশীদার জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) আ স ম আবদুর রবও বলেছেন, দেশের প্রধান বিরোধী পক্ষ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট-সরকার যখন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সংলাপ অনুষ্ঠান এবং আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার একপাক্ষিকভাবে তফসিল ঘোষণা করে নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন। ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’-এর এক নেতা বলেছেন, শুক্রবার (আজ) রাজশাহীর জনসভা থেকে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। আওয়ামী লীগ অবশ্য, আজ শুক্রবার থেকেই দলের আগ্রহী প্রার্থীদের কাছে মনোনয়ন ফরম বিতরণ করবে বলে জানিয়েছে। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দল জাতীয় পার্টি ফরম বিতরণ করবে শনিবার থেকে।
নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনে এবার ভোট দেবেন ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ ভোটার। এরমধ্যে পুরুষ ৫ কোটি ২৫ লাখ ৪৭ হাজার ৩২৯ জন ও নারী ৫ কোটি ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ১৫১ জন। সম্ভাব্য ভোট কেন্দ্র ৪০ হাজার ১৯৯টি। এতে ভোট কক্ষ থাকবে ২ লাখ ৬ হাজারেরও বেশি। প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ৫টি করে ভোট কক্ষ থাকে। ভোটের অন্তত ১৫দিন আগে কেন্দ্রের গেজেট প্রকাশ করবে ইসি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রথম থেকে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে যথাক্রমে- ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ, ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬ সালের ৭ মে, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি।
প্রশাসনকে সহায়তায় থাকবে সেনাবাহিনীও : বাংলাদেশ টেলিভিশনে গতকাল সন্ধ্যায় প্রচার করা ১৩ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের এই ভাষণে সিইসি কে এম নুরুল হুদা জানান, নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে ৭ লাখ কর্মকর্তা কাজ করবেন। এছাড়া নির্বাচনী এলাকায় বিপুলসংখ্যক নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ড, আনসারসহ সশস্ত্র বাহিনীও মোতায়েন করার কথা জানান নূরুল হুদা। সিইসি বলেন, পোলিং এজেন্টরা ফলাফল ঘোষণা না করা পর্যন্ত কেন্দ্রে থাকবেন। ভাষণের শুরুতেই সিইসি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং ভাষা আন্দোলনে প্রাণ হারানো শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড : জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সিইসি সর্বস্তরের জনগণকে নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রতিটি দলকে একে অন্যের প্রতি সহনশীল ও রাজনীতিসুলভ আচরণের অনুরোধ জানান তিনি। সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা জানিয়ে সিইসি বলেন, এই প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কখনও প্রতিহিংসা বা সহিংসতায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে অনুরোধ জানাই।
ভাষণে সিইসি আরও বলেন, ভোটার, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, প্রার্থী, প্রার্থীর সমর্থক এবং এজেন্টরা যেন বিনা কারণে হয়রানির শিকার না হন বা মামলা-মোকদ্দমার মুখে না পড়েন, তার নিশ্চয়তা দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কঠোর নির্দেশ থাকবে। দলমত নির্বিশেষে সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ধর্ম, জাত, বর্ণ ও নারী-পুরুষভেদে সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। ভোট শেষে নিজ নিজ বাসস্থানে নিরাপদে অবস্থান করতে পারবেন। নির্বাচনের সময় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা হবে জানিয়ে সিইসি বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় সব প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পাবে। সবার জন্য অভিন্ন আচরণ ও সমান সুযোগ তৈরির জন্য নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা হবে। এসব নিয়ে শিগগরিই পরিপত্র জারি করা হবে।
অল্প কিছু কেন্দ্রে ইভিএম : নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিতে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অল্প কিছু আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে জানিয়ে সিইসি বলেন, প্রথাগত পদ্ধতির পাশাপাশি নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে অনেকগুলি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ ভোটগ্রহণে ইভিএম ব্যবহার সফল হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রদর্শনীর মাধ্যমে ইভিএমের উপকারিতা সম্পর্কে ভোটারদের জানানো হয়েছে। তারা ইভিএম ব্যবহারে উৎসাহ দেখিয়েছে। সিইসি নুরুল হুদা বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, ইভিএম ব্যবহার করা গেলে নির্বাচনের গুণগত মান উন্নত হবে এবং সময়, অর্থ ও শ্রমের সাশ্রয় হবে। সে কারণে শহরগুলোর সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা থেকে দ্বৈবচয়ন প্রক্রিয়ায় বেছে নেওয়া অল্প কয়েকটিতে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট নেওয়া হবে। ইভিএম ব্যবহার ছাড়াও প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিতে কমিশনের নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রার্থীদের তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচনের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আদান-প্রদান পদ্ধতি সংক্রান্ত সফটওয়্যার ও প্রোগ্রাম আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হয়েছে। সরাসরি অথবা অনলাইনেও মনোনয়নপত্র দাখিলের বিধানও রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সাতটি করণীয় নির্ধারণ করার কথা জানিয়ে সিইসি বলেন, ২০১৭ সালে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিলাম। সংলাপের মাধ্যমে ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষক সংস্থা, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নারীনেত্রী সংগঠনের কাছে কর্মপরিকল্পনাটি তুলে ধরেছিলাম। তাদের পরামর্শ এবং সুপারিশ বিচার বিশ্লেষণের পর করণীয় বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যেমনÍ কিছু আইন ও বিধি সংশোধন করা হয়েছে, সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে, প্রায় ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রের বাছাই কাজ সম্পন্ন হয়েছে, ৭৫টি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এছাড়া, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সক্ষমতা অর্জন প্রশিক্ষণ কমসূচি চলছে এবং প্রথমবারের মতো পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার প্রসঙ্গ টেনে সিইসি কে এম নুরুল হুদা বলেন, এরই মধ্যে নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হয়ে গেছে। কমিশনাররা সংবিধানের আলোকে সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করার শপথ নিয়েছেন। নির্বাচনী সরঞ্জাম কেনা ও ছাপানোর কাজ প্রায় শেষ। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে পারস্পরিক পরামর্শ আদান-প্রদানও করা হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে কমিশনের যাবতীয় প্রস্তুতি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

Share
  • 6
    Shares