১৯৭৬ সালের ৩রা মার্চ কূলকাঠী ইউনিয়নের আখড়পারা গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে মোহাম্মদ মোছাব্বার মাঝি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা: মৃত মোঃ জারাল মাঝি। মাতাঃ মোসাঃ কুলসুম বিবি। তার স্ত্রীসহ ৬জনের অভাব আর ক্ষুধাপীড়িত সংসার। ছোটবেলায় মাত্র দেড় বছর বয়সে মোছাব্বার মাঝি কালাজ¦রে আক্রান্ত হলে দরিদ্র পরিবারের সচেতনতা ও অর্থের অভাবে সু-চিকিৎসা না হওয়ার কারণে তার দুটি চোখের দৃষ্টি শক্তি চিরতরে হারিয়ে ফেলে তিনি স্থায়ীভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। দরিদ্র পরিবার তাই বাধ্য হয়ে মোছাব্বার তার ছোট বোনকে নিয়ে নলছিটি শহরে ভিক্ষা শুরু করেন। যখন তার বয়স ২২বছর তখন মোছাব্বার বিয়ে করেন। অন্ধ অবস্থায় স্ত্রীর ভরণ-পোষণ চালানোর জন্য এখানে সেখানে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করতেন। কখনো ফেরী ঘাট, কখনো লঞ্চঘাট আবার কখনো বাসস্ট্যান্ড। এরই মধ্যে তার বাবা মারা গেলে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়িতে এসে সরকারী পরিত্যক্ত একটি আবাসস্থলে তিনি চার বছর অবস্থান করে ভিক্ষার উদ্দেশ্যে বরিশাল রূপাতলী উকিল বাড়ির বারান্দায় তিনি স্ত্রীসহ আশ্রয় নেন। সেখানে তার স্ত্রী একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। ২০১৪ সাল পযন্ত ভিক্ষা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তার বাবা মারা যাবার পর ছয় শতাংশ জমি ভাগে পান। এই জমির মধ্যে ভাগিদার আছেন তার বোন, তার দুই চাচাত ভাই। তার ভিটামাটি কাঠের ঘেরা ও টিনের চালের ঘর ছাড়া কিছুই ছিল না। প্রতিদিন গ্রামের এপাড়া থেকে ওপাড়া, শহরের এ-গলি থেকে ঐ-গলি, বিভিন্ন বাজারের এ দোকান থেকে ঐ দোকানে তার স্ত্রীকে নিয়ে অসহায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তিতে বেরিয়ে পড়েন। বর্তমানে তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তারা বাড়ির সন্নিকটে স্কুলে পড়াশুনা করে। দারিদ্রের কারণে তাদের পড়াশুনা যখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, তখন সেই সময় কোডেক সমৃদ্ধি কর্মসূচি কুলকাঠি ইউনিয়নে বাস্তবায়ন শুরু করে। কোডেক ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের আওতায় সমৃদ্ধি কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য হলো, কুলকাঠি ইউনিয়নকে ভিক্ষুক মুক্ত করা। তারই ধারাবাহিকতায় ভিক্ষুক মোছাব্বারকে আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকান্ডের জন্য এক লক্ষ টাকা অনুদান দিয়ে দুইটি গাভী, একটি অটো ভ্যান ও দশটি মুরগী এবং দশটি হাঁস কিনে দেয়া হয়।
প্রথম পর্যায়ে ভ্যান গাড়ি পরিবহন থেকে প্রতিদিন ১৫০ টাকা ও গরুর দুধ বিক্রি করে প্রতিদিন ৮০ টাকা আয় হওয়ায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মোছাব্বার একসময় ¯হায়ীভাবে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দেন। এভাবে মোছাব্বর ও তার পরিবার এক নতুন জীবন ও জীবিকার প্রবাহে এগুতে এগুতে দেখা যায় তার দুইটি গাভী থেকে পাঁচটি গাভী হয়েছে। মোছাব্বর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও একজন অর্থ উপার্জনসক্ষম ব্যক্তি হিসেবে নিজ সংসারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি গড়ে তোলেন এবং পরিবারের নানা কাজ ও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দুধ বিক্রি করে দৈনিক ১৫০টাকা, ভ্যান ভাড়া থেকে দৈনিক ১০০ টাকা এবং মুরগীর ডিম বিক্রি করে গড়ে প্রতিমাসে ৫০০/= টাকা আয় করেন।
এই আয়ের টাকা দিয়ে মোছাব্বর মাঝি সংসার পরিচালনা ও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ বহন করে থাকেন। খরচের পর যে টাকা থাকে তা তিনি কোডেকে সঞ্চয় অর্থ হিসেবে জমা করেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মোছাব্বর এখন অনেক দক্ষতায় সমৃদ্ধ একজন উদ্যোক্তা। যেমন, মাছ ধরা, মাটি কাটা, গরুর খাবার সংগ্রহ করা সবই তিনি নিজে করেন। সেই ক্ষেত্রে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতা তার জীবন ও জীবিকার পথকে কিছুতেই বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি।
বর্তমানে মোছাব্বর-এর কোডেকে সঞ্চয় তহবিলে ৪,৬৪০ টাকা, ব্যাংকের হিসাবে ২২৩ টাকা জমা রয়েছে এবং ইতিপূর্বের আয় থেকে তিনি এক কাঠা জমি ক্রয় করেছেন। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার সুবিধার জন্য ঘরে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা করেন। ছেলে মেয়ে ও পরিবারের বিনোদনের জন্য একটি রঙিন টেলিভিশন কিনে দেন। তার ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়ায় খুব ভালো এবং প্রতি বছর ভালো ফলাফল করে আসছে।
বর্তমানে মোছাব্বার মাঝি একজন উদ্যামী ও উদ্যোক্তা সদস্য হিসেবে সবার নিকট পরিচিত।

লেখক পরিচিতিঃ উন্নয়ন কর্মী
সধহরশপড়ফবপ@মসধরষ.পড়স

Share