কিংবদন্তী শ্রমিকনেতা কমরেড আবুল বাশার ছিলেন এ দেশের সা¤্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনের সামনের কাতারের সৈনিক। তিনি কমিউনিস্ট তথা বামপন্থী নেতা হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। শ্রমিক আন্দোলন দিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু হলেও তিনি ক্রমে ক্রমে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। শ্রমিক আন্দোলনের গোড়াতেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন শ্রমিক শ্রেণীর নিজস্ব রাজনৈতিক দল ছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সমাজতন্ত্র কায়েম করা সম্ভব নয়। এই উপলব্ধিই তাঁকে একাধারে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং পার্টি নেতার পরিচয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে সহায়তা করেছিল। তিনি স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে যে বিপ্লবী ধারার শ্রমিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলেন তার মাধ্যমে শ্রমিকদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে সত্যিকারের জননেতা হয়ে উঠেছিলেন। আবুল বাশার ছিলেন জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, কমিউনিস্ট আন্দোলনের অগ্রণী নেতা, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রথম সভাপতি এবং রুগ্ন শিল্প সমিতির উপদেষ্টা।
২০১০ সালের ৭ নভেম্বর কিংবদন্তী এ শ্রমিকনেতা আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নেন। ওইসময় তিনি শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছাড়াও ছিলেন পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য। আবুল বাশার ১৯৩৪ সালে লক্ষীপুরের এক গ্রামীণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই পূর্ব বাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা – ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’ – স্লোগান হাজির করলে পাকিস্তান সরকার তাদের বিরুদ্ধে দমননীতি গ্রহণ করে । ফলে গোপনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কমিউনিস্টরা শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিশেষ করে শিল্পে শিল্পে ইউনিয়ন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন । সরকার ও মালিক উভয়েই শ্রমিক সংগঠন করার বিরুদ্ধে ছিলেন। ঠিক ওই সময়ে ১৯৫৩ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে আবুল বাশার লক্ষ্মীপুর থেকে চট্টগ্রাম চলে আসেন এবং চিটাগাং জুট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড এ শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন, শুরু করেন শ্রমিক আন্দোলন। ১৯৫৬ সালে আবু হোসেন সরকারের আমলে প্রথম তাঁর ওপর হুলিয়া জারী হয় । এরপর ১৯৫৮ সাল থেকে পুরো পাকিস্তান আমলে তিনি প্রায় সময়ই মাথায় হুলিয়া নিয়ে আত্মগোপনে থেকেই শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করেন। এসময় তিনি গোপন কমিউনিস্ট পাটির সদস্য হিসেবে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি তথা ন্যাপের রাজনৈতিক কর্মকা-েও যুক্ত হন। ১৯৫৭ সালেই তিনি পূর্ব পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৬১ সালের মার্চ মাসে তিনি চট্টগ্রাম শহর থেকে গ্রেফতার হন। প্রায় পনের মাস জেলে আটকে রাখার পর ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে নিজ গ্রাম কেরোয়াতে তাঁকে অন্তরীণ করে রাখা হয়। প্রায় দশ মাস অন্তরীণ থাকার পর তিনি ১৯৬৩ সালের শ্রমিক কর্মচারীদের ডাকে গোয়েন্দা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে আবারও কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলে ফিরে আসেন। ১৯৬৪ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রাম থেকে আবারও গ্রেফতার হন তিনি।
এসময় চট্টগ্রামের জেলখানা ও কোর্টহিল এলাকা লক্ষাধিক শ্রমিক ঘেরাও করলে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। দেশের শ্রমিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে এটা ছিল এক অনন্য ঘটনা। আবুল বাশার শুধু পাট শ্রমিক নন, তিনি চট্টগ্রামসহ সারাদেশের প্রতিটি সেক্টরের শ্রমিকদের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হন। তিনি বিদ্যুৎ, রেল, বন্দর, প্রেস, দোকান কর্মচারী, টেক্সটাইলসহ প্রায় সব খাতে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শ্রমিকশ্রেণী স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষা লাভ করে রাজনৈতিক সংগ্রামে এগিয়ে আসেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের মাধ্যমে ১৯৬৭ সালে পাটকলে ২১ দিন টানা ধর্মঘট ও বিজয় অর্জনের পাশাপাশি ‘শ্রমিক কৃষক অস্ত্র ধর, পূর্ববাংলা স্বাধীন কর’ স্লোগান শ্রমিকদের মধ্যে চালু করে দেন। আবুল বাশারের নেতৃত্বে শ্রমিকদের বিশাল একটি অংশ ৬৯এর গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
ষাটের দশকে তিনি পূর্ব বাংলার জাতীয় পর্যায়ের শ্রমিক নেতা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও গোপনীয়তার কারণে রাজনৈতিক নেতা হিসাবে নিজেকে প্রকাশ করা সহজ ছিল না। কিন্তু পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার প্রশ্নে এবং নকশাল রাজনীতির নীতি ও কর্মকৌশল গ্রহণ না করার প্রশ্নে তিনি আপোষ করেন নি। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক অবস্থান কী হওয়া উচিত তা প্রমাণ করলেন। কমরেড আবুল বাশার এবং কমরেড দেবেন সিকদার ১৯৬৯ সালের দিকেই শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক কর্তব্য হিসাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রাম বা যুদ্ধের কর্তব্যকে প্রধান বলে মত প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তারা স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং নকশালপন্থীদের তথাকথিত দুই কুকুরের কামড়া-কামড়ি ও শ্রেণী শক্র খতমের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেন।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭৩ সালে ‘জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন’ গঠন করে আবুল বাশার পুনরায় শ্রমিক আন্দোলনকে সংগঠিত করেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার সংগ্রাম শুরু করেন। আবুল বাশারের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসন আমলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পাশাপাশি শিল্প কলকারখানার ইউনিয়নগুলো ছিনিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে শ্রমিক জনতার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলা।
কমরেড আবুল বাশার শুধু শ্রমিকদের ঐক্যে বিশ্বাস করতেন তা নয়; তিনি শ্রমিক শ্রেণীর পার্টিগুলোর ঐক্যও কামনা করতেন। মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী বামপন্থীদের ঐক্যে তিনি সক্রিয় ছিলেন। চীনপন্থীদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন তাদের সঙ্গে নানাভাবে ঐক্য করার চেষ্ঠায় কমরেড আবুল বাশার নানাভাবে যুক্ত ছিলেন। সর্বশেষ তিনি ১৯৮৫ সালের ১৭/১৮ অক্টোবর বাংলাদেশের মজদুর পার্টি ও বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে ঐক্যে নেতৃত্ব দেন। কমরেড আবুল বাশার মজদুর পার্টির সম্পাদক ছিলেন। এই দুই পার্টির ঐক্য কংগ্রেসে কমরেড আবুল বাশার ঐক্যবদ্ধ নবগঠিত বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি নির্বচিত হয়েছিলেন। ঐ কংগ্রেসে ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন কমরেড রাশেদ খান মেনন। সেই ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি পরবর্তীতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্যের প্রতীক হিসাবে কাজ করে গেছে।
তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল শ্রমিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলনের এক ক্লাসিক মহাকাব্য। প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনে বীরত্ব, সংগ্রাম, সফলতা এবং নিরন্তর লেগে থাকাই ছিল তার অভ্যাস বা চর্চা। একমাত্র মৃত্যুই তাঁর কর্মকে থামিয়ে দিয়েছে কিন্তুু তাঁর শিক্ষা এখন ও অত্যন্ত মূল্যবান এবং তরুণদের জন্য অনুকরণীয়। বার্ধক্যও তাঁকে অবসরে পাঠাতে পারেনি; আমৃত্যু রাজনীতি ও শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন ছিল তাঁর সংগঠন। আর তিনি ছিলেন শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের যাদুকর। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে, মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে কমরেড আবুল বাশারের শিক্ষা হলো শ্রমিক আন্দোলন পুনর্গঠন বা তৈরী ব্যতিত শ্রমিক শ্রেনীর অধিকার আদায়করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিজীবনে নিরহংকারী, সৎ ও নির্লোভ কমরেড আবুল বাশার জাতীয় ও শ্রমিক রাজনীতি, মানুষের অধিকার রক্ষার আন্দোলন, মহান মুক্তি সংগ্রামে অবদান ভবিষ্যত বিপ্লবী প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, চট্টগ্রাম জেলা

Share
  • 15
    Shares