হলটিও বেশ বড়। স্ক্রীনে সেমিনারের বিষয়বস্তু ভেসে আসছে। একজন মেয়ে অনায়াসে উঠে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে আমাদের ওয়েলকাম জানালো। হলটিতে অনেকগুলো রাউন্ড টেবিল। চারপাশে অংশগ্রহণকারীরা বসে আছে। কোন টেবিল এখনো ফাঁকা আছে। আমরা একটা ফাঁকা টেবিলে বসে পড়লাম। আমাদের মত ঘটা করে উদ্বোধন করা এরকম কিছু হলো না। মেয়েটি ওয়েলকাম জানানোর পর আরেকজন ডায়াসে গেলেন। তিনিই প্রথম সেশনটি পরিচালনা করলেন। বেশ চমৎকার ইংরেজী বলতে পারেন। সিঙ্গাপুরের তিনি। এত সুন্দর করে বলে সহজে বুঝা যায়। স্ক্রীনে সব একের পর এক ভেসে আসছে। তিনি যেন ধারাবর্ণনা দিয়ে যাচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের সাথে ব্যাংকিং যে কত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে তা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের পরিসংখ্যান থেকে সহজে বুঝা যাচ্ছে। এসব দেশের কতভাগ ব্যাংক গ্রাহক এসব নতুন প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হচ্ছে তার তথ্যেও দেখানো হচ্ছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, এসব দেশের সাথে বাংলাদেশের নামটি নেই। জানতে চাইলে এরা বললেন, যে সব দেশের ষাট ভাগের উপরের লোকজন ব্যাংকিং সেবা মোবাইলের মাধ্যমে সম্পন্ন করে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ আমাদের দেশে মোবাইলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ব্যাংকগুলোর সেবা এখনো এ প্রযুক্তি ব্যবহারে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তবে, সেমিনারে পর্যালোচনা থেকে মনে হলো আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং সেবাকে ঐ স্তরে নিয়ে যেতে পারবে।
প্রদর্শনীর লবির উত্তর পাশের কাচের জানালা দিয়ে মেকং নদী দেখা যায়। মেকং নদী চায়না ভিয়েতনাম হয়ে থাইল্যান্ডে এসে ঢুকেছে। তবে এটি তার শাখা নদী। এখানে এর নাম ‘ চায়ো ফ্রয়া’। প্রদর্শনী দেখার ফাঁকে ফাঁকে অনেকে এখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নদী দেখে , নদীটি অনেক বড়। নদীতে পালতোলা নৌকা থেকে শুরু করে লঞ্চ স্টীমার সবই চলাচল করে। এ লবিতে ঢোকার আগে বামে রিভার ভিউ নামে একটা নাম ফলক চোখে পড়েছে। এটা দেখে এদিকে একটি নদী বয়ে গিয়েছে তা বুঝা যায় না। ওয়াশ রুমে গিয়ে বুঝতে পারলাম হোটেলটি একবারে নদীর তীরে। এখান থেকে নদীটি ভাল করে দেখা যায়। রিভার ভিউ আসলে একটি হলের নাম। এ হলটির ওপাশটা গ্লাসের। এ গ্লাসের ভিতর দিয়ে খুব সুন্দর নদীর দৃশ্য দেখা যায়। এ হলটি প্রায় সময় আগে থেকে বুকিং দেয়া থাকে। হলটিতে ঢুকে কয়েকজন কিছুক্ষণ নদীর দৃশ্য দেখলাম। সেমিনার শেষে বিকেলে নদীতে বোটে চড়ে কিছুদূর ঘুরে আসা যায়। একথা বলতে রাজী হয়ে গেলাম। হোটেল থেকে বের হয়ে খানিকটা হেঁটে নদীর পাড়ে গেলাম। নদীর কোন তীর কিনারা খুঁজে পেলাম না। পুরাটাই যেন ঘাট। স্টিলের বড় বড় প্লেট। টিকিট নেওয়া হল। একটা বড় লঞ্চ অনেক যাত্রী নিয়ে এসে ঘাটে ভিড়তে না ভিড়তে আবার ছেড়ে চলে গেল। লাইনের সামনের দিকে কিছু উঠতে পারলো। আমরা দাঁড়িয়ে রয়েছি। দশ পনের মিনিট পর পর লঞ্চ আসে। লঞ্চের উপরের ছাউনিটা রঙীন। রোদে এটাকে আরো উজ্জ্বল দেখায়। সারি সারি সিটগুলোতে যাত্রীরা উঠে বসে। একশ সিটের কম হবে না। কোনটাতে দেড়শ বা দুইশ জনের বসার সিট আছে। তবে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে উপরের রেলিং ধরে বাইরে তাকিয়ে থাকে। এগুলো বেশ বড়। অনেকটা স্টিমারের মত। পরের লঞ্চটা বেশ বড়। এটা এসে ভীড়তেই আমরা এগিয়ে গিয়ে উঠে পড়ি। অবশ্য নামার যাত্রীদের আগে নামতে দিতে হয়। তবে, খুব দ্রুত নামতে হয়। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেনা। তাড়াতাড়ি ঘাট ছেড়ে চলে যায়। উঠানামা দ্রুত করতে হয়। হুইসেল বাজিয়ে ঘাটে ভিড়ে আবার হুইসেল বাজিয়ে ঘাট ছেড়ে চলে যায়। আমরা উঠে প্রথমে সিট পাইনি। দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। ঢোকার ওখানে কাউকে দাঁড়াতে দেয় না ভেতরের দিকে চলে যেতে হয়। পরের ঘাটে গিয়ে সিট পেয়ে যায়। বেশীরভাগ পর্যটক। ছেলেমেয়ে নানান দেশ থেকে এসেছে। আমার পাশের সীটে যে বসেছে সে এসেছে অষ্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে। এতদূর থেকে কেন এসেছে কি জানি। অষ্ট্রেলিয়ায় অনেক কিছু আছে দেখার। খুব একটা কথা বলতে চায় না। বাইরে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর পর মোবাইলে ছবি তুলছে। আসলে নদীর তীরের স্থাপনাগুলো দেখার মত। কিছু কিছু পুরানো স্থাপনা তাদের ঐতিহ্য ধরে আছে। বিভিন্ন ধরনের বিল্ডিং গড়ে উঠেছে। ডিজাইনের দিক থেকে কিংবা নির্মাণশৈলীর দিক থেকে একেক ইমারত যেন একেক রকম। আবার প্রত্যেকটির সাথে কোথাও যেন মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
এসব দালানকোঠা যতসব স্থাপনা সবগুলোতে তাদের ঐতিহ্যের এক ধরনের ছাপ লক্ষ্য করা যায়। কতদূর পর পর এত বড় নদীর ওপার থেকে এপারে ব্রীজ নির্মিত হয়েছে। নদীতে বসে দূর থেকে দেখলে ভারী সুন্দর দেখায়। পড়ন্ত বিকালের রোদটুকু নদীর জলে এসে পড়েছে। ঢেউগুলো যখন চলমান বড় স্টিমারের ্েঢউয়ের সাথে আছড়ে পড়ে তখন রোদের ছোয়ায় ঝলমল করে ওঠে। এসব ঢেউ নদীর দুকূল ভেঙে যেন কিনারায় গিয়ে আছড়ে পড়ে। কখনও শান্ত মনে হয় না। ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের উপর দিয়ে লঞ্চ ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যায়। ঘাটের পর ঘাট যাত্রী উঠানামা করে চলতে থাকে। যে যেখানেই নামুক এক টিকিট এক ভাড়া। আমরা দু’পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে রাজবাড়ির ঘাটে গিয়ে নেমে পড়ি। এ ঘাটে লোকজন খুব বেশী। সব পর্যটক। তবে, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের দেখা গেল অনেক। তারাও মনে হয় রাজবাড়ি দেখতে এসেছে। ঘাট থেকে হেঁটে যতই সামনের দিকে যাচ্ছি ততই যেন পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। ফুটপথে একটু জায়গা নেই হাঁটার। পর্যটকেরা ফিরে আসছে। তারা সবাই রাজবাড়ি দেখে ফিরে আসছে। বিশাল এলাকাজুড়ে রাজবাড়ী। একটা দুটো প্রাসাদ নয়, ছোট-বড় মাঝারী অনেক প্রাসাদ। যতসব কারুকাজে ভরা যেদিকে তাকাই। কোন কোন ভবন যেন রাজমুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। বহুকাল থেকে এসব ভবন রাজ ঐতিহ্যের স্মারক বহন করে চলছে। এক ভবনের চেয়ে আরেক ভবনের ঔজ্জ্বল্য যেন বেশী। সহজে চোখ ফেরানো যায় না। স্বল্প সময়ে সবকিছু দেখা সম্ভব নয়। সারাদিনের জন্য সময় নিয়ে গেলে অনেক কিছু দেখা যায়। রাজাকে এখানকার মানুষ দেবতা মানে। তাই, বুদ্ধ মূর্তির পাশে রাজার মূর্তিও দেখা যায় অনেক জায়গায়।
দেশে ফেরার দিন আর কোন সিডিউল রাখা হয়নি। ফ্লাইট সিডিউল চারটায় হলে একটার মধ্যে বিমান বন্দরে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। একটায় পৌঁছাতে না পারলে দুইটার মধ্যে পৌঁছাতে হবে। হোটেল থেকে বিমান বন্দর পেীঁছাতে এক ঘন্টা লাগবে। বারটার আগে চেক আউট হয়ে রওনা দিতে হবে। ব্রেক ফাস্ট করার পর প্রায় তিন ঘন্টা সময়টাতে কিছু একটা দেখা যায়। হোটেল থেকে নয়টায় চেক আউট হয়ে গাড়ি করে আমরা তিনজন সিয়াম প্যারাগনের দিকে রওনা হলাম। রাস্তা ফাঁকা থাকায় আধা ঘণ্টার মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম। যেই প্যারাগন বলেছে দেখতে সেই রকম। শপিং মল থেকে শুরু করে অনেক কিছু আছে। সকাল সকাল এত পর্যটক কোথা থেকে এল কি জানি! নীচ তলায় অনেক বড় রেস্টুরেন্ট। ছেলেমেয়ে নিয়ে অনেকে ব্রেকফাস্ট করছে। আমরা খোঁজ নিতে নিতে সী ওয়ার্ল্ডের গেটে এসে থামলাম। ব্যাগ ল্যাগেজ নিয়ে ভিতরে ঢোকা নিষেধ। এখন ব্যাগ কোথায় রেখে যাই। আরো খোঁজ নিয়ে জানা গেল রাখার ব্যবস্থা আছে। বাইরের দিকে গিয়ে দেখা গেল কেউ কেউ অনলাইনে ট্রাই করছে ল্যাগেজ রাখার জন্য। ট্রাই করতে করতে খালি বক্স পাওয়া গেল। অনেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাই করছে। আমাদের হাতে সময় কম। নম্বর ভেসে উঠলো। আমরা ল্যাগেজ রেখে সী ওয়াল্ডের দিকে চলে এলাম।
গেট দিয়ে নীচে নেমে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নিলাম। লাইনে অনেক ছেলেমেয়ে বাবা-মার সাথে। ছোটদের জন্য এটা অদ্ভুত জগৎ। তারা বেশ আনন্দ পায়। ভেতরে ঢুকে আমরা কম অবাক হয় নি। যতই ভেতরের দিকে যাচ্ছি ততই অবাক হচ্ছি। সত্যিই সী ওয়ার্ল্ড। সমুদ্রের জলজ প্রাণীকে নিয়ে এটি আরেকটি জগৎ গড়ে তোলা হয়েছে। যেন, কোন সুড়ঙ্গ পথে বিশাল গুহার ভিতর ঢুকে পড়েছি। যেন এ গুহার শেষ নেই। যেদিকে তাকাই জলরাশির ভেতর সমুদ্রের নানা প্রজাতির প্রাণীকূল অবাধে বিচরণ করছে। হঠাৎ দেখি ডালপালা মেলে মানকচু পাতার মত মাথার উপর দিয়ে কি যেন ভেসে যাচ্ছে। অপূর্ব সুন্দর সামুদ্রিক এ প্রাণীর নাম জানা গেল না। নানা রংয়ের মাছেরা পাখনা মেলে ভেসে বেড়াচ্ছে। কাচের গ্লাস দিয়ে এমনভাবে দেয়াল তৈরী করেছে বিশাল জলরাশির ভেতর এরা সাঁতার কাটছে। তিমি থেকে শুরু করে হাঙ্গর আরো অনেক রকমের জলজ প্রাণীর বিচরণ দেখে অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। ছেলেমেয়েরা কাচের গায়ে হাত লাগিয়ে রঙিন মাছগুলোকে ধরতে চায়। এসব মাছেরা কাচ ঘেঁষে ঘেঁষে ভেসে বেড়ায়। অনেকে মোবাইলে ছবি তুলছে। চলবে

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও বিশিষ্ট ব্যাংকার

Share