মো. দেলোয়ার হোসেন, চন্দনাইশ

চন্দনাইশ পৌরসভার হারলা গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারের ৩ ভাই-বোন প্রতিবন্ধী। সবার বড় মফিজুর রহমান (৫৫) বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ বিক্রি করে জীবন অতিবাহিত করছে অতিকষ্টে।
পৌরসভার হারলা গ্রামের খুইল্যা মিয়ার ৫ ছেলে-মেয়ের মধ্যে প্রথম ৩ জনই প্রতিবন্ধী। অতি দরিদ্র হওয়ায় তাদের প্রথম থেকেই কোন রকম চিকিৎসা সেবা দিতে পারেননি বলে জানা যায়। খুইল্যা মিয়ার সামান্য ঘরভিটা ছাড়া কিছুই ছিলনা। বরকল সড়কের পাশে হওয়ায় সড়ক বড় করার সময় তাও সড়ক বিভাগের দখলে চলে যায়। সেখান থেকে ভূমি অধিগ্রহণের প্রাপ্য টাকা নিয়ে পার্শ্ববর্তী হারলা গ্রামে সামান্য জায়গা ক্রয় করে কোন রকমে বসবাস করছে তারা। সেখানে এ প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েরা দীর্ঘ ২ বছর যাবৎ মাটি ভরাট করার পর এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে টিন দিয়ে ঘর নির্মাণ করে। কোনভাবে যেন থাকা যায়। এখনও এ প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েরা তাদের সামান্য আয় থেকে সপ্তাহিক ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে চলছে জীবন।
খুইল্যা মিয়ার যৌবনে গায়ে জোরছিল বলে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাত। তাছাড়া তার স্ত্রী মোবারক খাতুন কুটিরশিল্পের কাজ করত। সে প্রতিদিন বাঁশ দিয়ে লাই, চালউন, কুলা, ঝুঁড়িসহ বিভিন্ন ব্যবহার্য্য জিনিসপত্র তৈরী করে সংসার চালাত। এখন সে আগের মত কুটির শিল্পের এসব পণ্য তৈরী করতে পারছে না। বর্তমানে প্লাস্টিকের পণ্য বাজারে আসায় এসব জিনিসপত্রের চাহিদাও কমে গেছে। একদিকে বাঁশ-বেতের দাম বেড়ে যাওয়ায় তেমন লাভজনক হচ্ছে না বলে জানান তিনি। অপরদিকে খুইল্যা মিয়ার বড় ধরণের অপারেশন হওয়ায় সে বর্তমানে কোন কাজ করতে পারছে না। ৫ জন ছেলে-মেয়ের মধ্যে মফিজুর রহমান (৫৫), কমলা আকতার (৪৭), আজম খান (৪৩) ৩ জনই প্রতিবন্ধী। অপর ১ ছেলে ও ১ মেয়ে কোন রকম থাকলেও পরিবারে স্বচ্ছলতা আসছে না। প্রথম ছেলে মফিজুর রহমান এক সময় প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চন্দনাইশ থানা বাজারের বিভিন্ন চায়ের দোকানে পানি দিত সামান্য অর্থের বিনিময়ে। কিন্তু তার সংসারে রয়েছে স্ত্রী ও ৫ ছেলে-মেয়ে। এখন মফিজ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় পানির ভার কাঁদে নিতে পারছে না। কিন্তু সে প্রতিবন্ধী জীবনের কাছে হার না মেনে এখন বিভিন্ন গাভী গরুর মালিক থেকে দুধ কিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাড়তি দামে দুধ বিক্রি করে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি মফিজের সাথে কথা হলে সে জানায়, তার ২ ছেলের মধ্যে ১ ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে, অপর ছেলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। ১ মেয়েকে বিবাহ দিয়েছে মফিজ। তার স্ত্রী অন্যের ঘরে গিয়ে আয়ার কাজ করে। ২ জনের সারাদিনে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মফিজকে। সে আরও বলেন, বৃষ্টি বা আবহাওয়া অনুকুলে না থাকলে তাদের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোন রকমে খেয়ে না খেয়েই জীবন চলতেছে। কিন্তু হাত পেতে ভিক্ষা করেনি মফিজ, তার স্ত্রী বা ছেলে-মেয়েরা। এলাকার লোকজন মফিজের পরিবারকে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন বলে জানা যায়। মফিজ বেসরকারিভাবে কোন রকম স্থায়ী আর্থিক সহায়তা না পেলেও সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ত্রয়োমাসিক ভাতা পায় বলে জানান। তার বড় বোন কমলা আকতারের বিয়ে হলেও তার স্বামী মারা যায়। তার ঘরে রয়েছে ১টি ছেলে। সে অন্যের বাড়িতে বুয়ার কাজ করে এক সময় জীবন চালাত। এখন সে ফাতেমা জিন্নাহ বালিকা বিদ্যালয়ে স্বল্প বেতনে চাকরি করে জীবন অতিবাহিত করছে। মফিজের ছোট ভাই আজম খান রিক্সা চালায়। সে প্রতিবন্ধী হওয়ায় তার রিক্সায় ভাড়াও কম হয়। আজম খান ১০ বছর আগে বিয়ে করে। তার সংসারে রয়েছে স্ত্রী, ১ ছেলে ও ২ মেয়ে।
প্রতিবন্ধী ৩ ভাই-বোন বলেন, দিনে এক বেলা, কোনদিন না খেয়েও চলে যায়। ছেলে-মেয়েরা কিছু খেতে চাইলে দিতে পারি না। তবে তাদের ঘরে অভাবের কারণে কোনো অশান্তি নেই। তারা এটাকে মেনে নিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, দিনে এক বেলায় খায় সবাই। তারা মানুষের দেয়া পুরানো কাপড় পড়েই জীবন চালাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। মফিজ বলেন, সে ছোটকাল থেকে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে তাকে সবাই অবহেলার চোখে দেখত। অবহেলাটাকে মফিজ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে। তবে স্থানীয়রা তাদেরকে আদর করে সব সময় কিছু না কিছু খেতে দেয়, টাকা পয়সা দিলে সে গ্রহণ করে ঠিক, ধন্যবাদ ও দিয়ে দেন সাথে সাথে।

Share