বাক্-স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মূল্য কত হতে পারে? একজন মানুষের জীবনের সমান? না কি ১১০ বিলিয়ন ডলার? খুবই দুঃখজনক হলেও মনে হচ্ছে, বাক্-স্বাধীনতার জন্য জামাল খাসোগীকে দিতে হলো দুইটারই সমপরিমাণ মূল্য। অন্যভাবে মানেটা চিন্তা করলে দাঁড়ায় বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র-বাণিজ্যের কাছে তার জীবনের মূল্য কিছুই না, বলে গণ্য করা হলো।
সারা বিশ্বের জনগন এখন জামাল খাসোগীর ব্যাপারে খবর পাচ্ছে। তরতাজা, টাটকা খবর। এগুলো ঢাকবার কোন উপায়ই নাই। কিন্তু তারপরেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেহায়াপনা দেখলে মনে শঙ্কা জাগে, মানবতা কত নীচে নামলে পরে বিশ্বের গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী অ্যামেরিকার মত দেশের প্রধান কিনা মানুষের জীবনের উপরে অস্ত্র-বিক্রীকে প্রাধান্য দেয়। কোথায় গেছে মনুষ্যত্ব!
যারা জানেন না, তাদের সুবিধার্থে সংক্ষেপে ঘটনা বলি। সৌদী নাগরিক জামাল খাসোগী, পেশায় একজন সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বিশ্বের নানান দেশের পত্রিকায় তাঁর মূল্যবান বিশ্লেষণমূলক সম্পাদকীয় এবং অপ-এড বের হয়। মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে অনেক জ্ঞানী জামাল খাসোগীর মতামত-আলোচনা, পর্যালোচনা, বিশ্লেষণের গুরুত্ব অনেক। সকলেই তাঁর সমাদর করেন। এককালে সৌদি সরকারের হয়েও কাজ করেছিলেন। ওয়াশিংটনে সৌদি এমব্যাসিতে উপদেষ্টা হিসাবে ছিলেন। পররবর্তীতে সরকারের নীতি-বিবর্জিত পলিসির বিরুদ্ধে দ্বিমত পোষণ করে বিরোধিতা শুরু করেন। বিশেষ করে বর্তমান যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান (গইঝ)-এর কাজকর্ম তাঁর অপছন্দনীয় মনে হয়। সেই থেকেই সৌদি সরকারের রোষানলে পড়েন তিনি। জামাল খাসোগী অনেক বছর অ্যামেরিকায় বসবাস করেন এবং এদেশের গ্রীনকার্ড হোল্ডার, পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট। এর পরের ধাপ হলো তাঁর জন্য অ্যামেরিকান নাগরিক হওয়া। কিন্তু সাংবাদিক পেশায় যুক্ত থাকার ফলে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি থাকার পরিকল্পনা করেন, এবং তুরস্কের ইস্তানবুলে বসবাস শুরু করেন। সেই সময়ে, হাতিজা জেঙ্গিস (ঐধঃরপব ঈবহমরু) নামের এক তুর্কী রমণীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় এবং তা থেকে তাদের বিয়ের কথাবার্তা হয়। সৌদি নাগরিক হিসাবে, জামাল দেশের বাইরে অন্য আর এক দেশের নাগরিককে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, সেজন্য নিয়ম মোতাবেক ইস্তানবুলের সৌদি কন্স্যুলেটে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে চান। সেটাই হলো তাঁর কাল।
সৌদিরা শত্রুবধের সুযোগ পেলো, সমালোচকের মুখ এবার বন্ধ করে দেওয়া যাবে। প্রথম যেইদিন তিনি কাগজ নিয়ে গেলেন, তাকে বলা হলো চারদিন পরে, ২রা অক্টোবর আবার আসতে। তিনি সরলমনে চারদিন পরে সেই যে কন্স্যুলেটে ঢুকলেন, এরপরে আর বের হলেন না। তাঁর বাকদত্তা হাতিজা সেই কন্স্যুলেটের বাইরে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকলেন। জামালের আর কোনই নিশানা নাই। মোবাইল ফোন বাইরে হাতিজাকে দিয়ে গিয়েছিলেন, তাই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগও সম্ভব হচ্ছিলো না। তারপরে একসময় হাতিজা সকলের কাছে ঘটনা বলে সাহায্য চাইলেন। যেহেতু সংবাদপত্রের মানুষ, তাই সহজেই খবর প্রচারিত হতে থাকল খুবই দ্রুত। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো জামাল খাসোগীর সৌদি কন্স্যুলেটে অন্তর্ধানের কথা।
সবচেয়ে বেশী জোর গলায় চিৎকার করতে থাকলো তুর্কী মিডিয়া। কেন? রাজনীতি আর কূটনীতি বুঝা ভীষণ দায়। তুরস্ক কেন এত উঠেপড়ে লেগেছে? সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের কলহ করে বেশী কিছু কি লাভ আছে? বিশেষ করে সেই কলহের সূত্র ধরে ট্রাম্প তো তুরস্ককে শাস্তিস্বরূপ অনেক কিছুই করতে পারে। আর যাই হোক না কেন সৌদি আরবের রাজপরিবার তো আবার ট্রাম্পের জানের জিগারী দোস্ত। হাঁ ভাই হাঁ। আমার কথা তো সেইখানেই। ট্রাম্পের মত মুসলিম-বিদ্বেষী একটা ব্যক্তিত্ব, কিন্তু টাকা-পয়সা ও ব্যবসার কারণে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমীরাত হলো তার প্রাণের বন্ধু। আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে তার প্রথম বিদেশ সফরই ছিলো সৌদি আরবে! সেখানে তাকে কত সাদর অভ্যর্থনা জানানো হলো, তলোয়ার-নৃত্যের দৃশ্য দেখলাম। এটা ছিলো ঠিক সেই সময়ই, যখন ট্রাম্প একের পর এক মুসলিম-ঠেকানো ইমিগ্রেশান নীতি ও এক্সিকিউটিভ অর্ডার দিচ্ছিলো। অথচ, মুসলমানদের পবিত্র দেশের সরকার প্রধানদের সে কি আচরণ! আমার সঙ্গে কথা বলার সময়ে এক সাধারণ সৌদি নাগরিক একবার হাস্যোচ্ছলে বলেছিলো অ্যামেরিকার বাহান্নটা স্টেট আছে, সেটা আমি জানি কিনা? আমাদের সকলের জানামতে অফিসিয়ালি অ্যামেরিকার তো পঞ্চাশটা স্টেট, আমি তাই একটু বোকা বনে গিয়েছিলাম। সে হাসতে হাসতে বললো, তোমার জানা পঞ্চাশটা সঠিক, কিন্তু তারপরেও আনঅফিসিয়ালি একান্ন নাম্বার হলো ইস্রায়েল আর বাহান্ন নাম্বার হলো সৌদি আরব। চিন্তা করে দেখুন, কি ধৃষ্টতা! কি অপমানজনক ব্যাপার!
যাই হোক, জামাল খাসোগীর কথায় ফিরে আসি। সৌদি সরকার তো সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছু জোর গলায় অস্বীকার করা শুরু করলো। চোরের মা’র বড় গলা আর কি! সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ থাকার পরেও প্রথমে বলেছিলো, না জামাল খাসোগীকে চিনিনা। পরে বললো, ওহ্ ভুল হয়ে গেছে। ওকে আমরা চিনি, কিন্তু সে তো কন্স্যুলেটে আসে নাই। পরে ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পরে বললো, হ্যাঁ সে এসেছিলো বটে, কিন্তু তারপরে তো সে এখান থেকে বের হয়ে গেছে, আমরা আর কিছুই জানিনা।
চোরের মা’র যদি বড় গলা হয়, তাহলে চোরের ‘বড়মামা’র গলা যে আরো কত বিকট হতে পারে তা তো কল্পনা করতেই পারছেন। সেই ‘বড়মামা’, মানে আমাদের ট্রাম্প, জোরালো বক্তব্য দিয়ে দিলো, নাহ্ সৌদি সরকার নির্দোষ, তারা সত্য কথাই বলছে। বড়সড় একটা চারিত্রিক সার্টিফিকেট দিয়ে দিলো তাদের। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তাদেরকে অত্যন্ত সহজ-সরল-সাদা-সিধে মানুষ হিসাবেই চিনে। সৌদি রাজপরিবার ও সরকার, তার মতই (!) সত্যের ধারক ও বাহক। তারা কখনই এরকম জঘন্য কাজে জড়িত থাকতে পারে না। ট্রাম্প নিজে একজন সৎ চরিত্রের মানুষ, এবং সৌদি রাজপরিবারও তার মতই নিষ্পাপ! এবং তাই সে তাদের অত্যন্ত সমীহ করে। সবশেষে ট্রাম্পের কথা হলো, এতকিছু না হলেও, ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র-চুক্তি বলে তো কথা। একজন প্রেসিডেন্ট হয়েও, ট্রাম্প পুরাপুরি নির্লজ্জ বেহায়ার মত প্রেস কনফারেন্সে তার মত দিলো, ১১০ বিলিয়ন ডলারের ব্যাপারটা বেশী গুরুত্বের; মানুষ গুম হয়ে যাওয়াটা তেমন কিছুই না। এই হচ্ছে ট্রাম্প এডমিনিস্ট্রেশানের তত্ত্বাবধানে মানবাধিকার বা বাক্-স্বাধীনতার বা প্রেস-ফ্রীডমের বর্তমান অবস্থা। অস্ত্রব্যবসা ছাড়াও আর একটা ব্যাপার হলো, ইরানকে দমন করা। সৌদি আরব আর ইরানের সম্পর্ক খুব একটা মধুর নয়; ট্রাম্প সেটাকেই তাঁর নিজের অনুকূলে লাগাতে চায়।
আস্তে আস্তে আরো গোপন তথ্য বের হয়ে আসা শুরু করলে, বাধ্য হয়ে উপায় না দেখে, তখন সৌদি সরকারও কিছু কিছু স্বীকার করা শুরু করলো। কেনো জামাল খাসোগীকে চারদিন পরে আসতে বলা হয়েছিলো? তাঁর মানে কি সৌদিরা প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সেই চারদিন ব্যবহার করেছিলো? ২রা অক্টোবার, যেদিন জামাল খাসোগী দ্বিতীয়বার কন্স্যুলেটে গেলও, কেনো সেদিন সেখানের সকলকে অঘোষিত ছুটি দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো? গুটিকয়েক বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছাড়া, আর কেউ যাতে জানতে না পের, সেইজন্য কি?
সেদিনই, ২রা অক্টোবর, দশ-পনেরো জনের হিট-স্কোয়াড প্লেনে করে ইস্তানবুলে গিয়ে, কাজ শেষ করে আবার ফিরে এসেছে। তাদের ছবি ও ভিডিও বের হলো। সেই হিট-স্কোয়াডের কয়েকজন যে, সৌদি যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমানের অত্যন্ত কাছের লোক, সেটাও প্রকাশ পেতে শুরু করলো। তুরস্ক জানালো, যে তাদের কাছে অডিও (এবং হয়তো বা ভিডিও) টেপ রয়েছে, যেখানে শুনা যাচ্ছে কীভাবে জামাল খাসোগীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। এখানে অবশ্য একটা খটকা থাকে, তুরস্ক কি করে এই টেপ পেলো? তারা কি কূটনৈতিক প্রোটোকল ও আইন না মেনে, লুকিয়ে লুকিয়ে সৌদি কন্স্যুলেটে গোপন টেপ রেকর্ডার বসিয়েছিলো?
এদিকে ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে তার ধামাধরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও-কে পাঠালো সৌদি আরব আর তুরস্ক দুই দেশই ঘুরে আসতে ও দুই সরকারের সঙ্গেই কথা বলতে। ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলো, খুবই দ্রুত এর তদন্ত ও রিপোর্ট চায়; তা নাহলে অ্যামেরিকান ইন্টেলিজেন্স, এফ বি আই পাঠাতে পারে। কিন্তু কিছু পরেই সে ডিগবাজি খেয়ে বললো, নাহ, সৌদি সরকারের যতদিন দরকার, আমরা ততদিন অপেক্ষা করবো। এর মাঝে যে অনেক অনেক আলামত গায়েব করে ফেলা যাবে সেটা কোন ব্যাপার না। জামাল খাসোগী অ্যামেরিকান নাগরিক না হলেও, তাঁর গ্রীনকার্ড আছে; এবং সে অনেকদিন অ্যামেরিকায় ছিলো, ও এখানের বহুল প্রচলিত ওয়াশিংটন পোস্ট খবরের কাগজের সে একজন গন্যমান্য কলামিস্ট। আর সেসব কিছু না হোক, সে তো একজন বিশ্ববিদিত সাংবাদিক; বা নিদেনপক্ষে সে-ও তো একজন মানুষ। তারও তো জীবন ছিলো, পরিবার ছিলো, একজন বাক্দত্তা ছিলো। সেগুলোর কি কোনই মুল্য নাই? নাকি সবই ১১০ বিলিয়ন ডলারে ভেসে যাবে?
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে দেশে দেশে সংগ্রাম চলে। কত দেশের সরকার একনায়কতন্ত্র বা একদলীয় ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য কত ধরনের দমননীতি চালায়। অ্যামেরিকা এই নিয়ে কত গর্ব করতো, তাদের দেশের সাংবাদিকরা বক্তব্য প্রকাশে কত স্বাধীন। হ্যা, তা সত্য বটে। এবং বিশ্বের অন্যান্য সব দেশ থেকেই হয়তো এখনো অনেক অনেক স্বাধীন। কিন্তু কিছু কিছু ট্রেন্ড বেশ আশঙ্কাজনক। আপনাদের মনে আছে, নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে ট্রাম্প কীভাবে একজন ডিস-এব্যাল, হিস্পানিক সাংবাদিককে ব্যাঙ্গ করেছিলো? তাকে প্রশ্ন করতে সুযোগ তো দেয়ই নাই, বরং সিকিউরিটি দিয়ে তাকে হল থেকে বের করে দিয়েছিলো? গতবছরে মন্টানার রিপাবলিকান ক্যান্ডিডেট গ্রেগ জিয়ানফোর্ট এক সাংবাদিককে ধাক্কা দিয়ে মেরেছিলো বা তুলে আছড়ে ফেলেছিলো। ট্রাম্প কিন্তু সে ব্যাপারে কিছুই বলে নাই, বরং, গ্রেগ-এর হয়ে ক্যাম্পেইন করেছিলো। পরবর্তীতে অবস্থা প্রতিকূলে যাওয়া শুরু হলে, গ্রেগ সেই সাংবাদিকের কাছে মাফ চায়, এবং পরে সেই কংগ্রেসম্যানের বিরুদ্ধে আইনী মামলাও হয়। তার সাজাও হয়।
তবুও, আমাদের মনে আশঙ্কা থাকে। আমি একজন অতিক্ষুদ্র মানুষ, কিন্তু আমিও কিছুটা লেখালেখি করি। জামাল খাসোগীর মত বড়মাপের ব্যক্তিত্বের এরকম করুণ পরিণতিতে আমরা সকলেই চিন্তিত, সকলেই আশঙ্কায় ভুগছি। নিজেদের জীবন নিয়ে তেমন চিন্তা নয়, চিন্তা হচ্ছে বাক্-স্বাধীনতার আয়ু নিয়ে। চিন্তা হচ্ছে মানব-সভ্যতার দুর্দশা নিয়ে। ট্রাম্প ও তাঁর চ্যালা-চামুন্ডাদের মত ধারক ও বাহকের হাতে জিম্মী হয়ে এই বিশ্ব আর কতদিন থাকবে এরকম?

লেখক পরিচিতি : আমেরিকার টলিডো, ওহাইও-তে বসবাসরত। ইঞ্জিনিয়ার, ইন্ডিপেন্ডেট-কনসালটেন্ট, ভ্রমণপিয়াসী।

Share