সেকান্দর আলম বাবর, বোয়ালখালী:

‘নদীর এপার ভাঙে ওপার গড়ে এইতো নদীর খেলা’। নদীর চরিত্রকে নিয়ে এ গান বাংলার দুঃখী মানুষগুলোর চিরায়ত রূপকে অংকন করেছেন মরমী কবি। কবির অনেক গল্প, কবিতা কাহিনীর এমনই একটি নদী বোয়ালখালীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রােতস্বিনী কর্ণফুলি। যার ভাঙ্গাগড়ার খেলায় প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে হারাতে হয়েছে নদী পাড়ের হাজারো মানুষের স্বপ্ন। সভ্যতার উৎকর্ষ হলেও এখনও এ অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারেনি তারা। আধুনিকতায়ও ভাঙ্গন কমেনি বরং যান্ত্রিকতা আর বালু তোলার প্রতিযোগিতায় কিছু সুবিধাভোগীর খপ্পরে পড়ে নদী পাড়ের মানুষগুলো প্রাকৃতিক প্ররিবেশের বাইরে এখন নতুন করে মোকাবেলা করছে কৃত্রিমতার অনৈতিক চাপ। গত কয়েক বছর আগে বোয়ালখালীর অধিকাংশ এলাকা নদী ভাঙ্গনের কবল থেকে মুক্তি পেলেও মুক্তি পায়নি রাঙ্গুনিয়ার সাথে সংসদীয় আসন শ্রীপুর-খরণদ্বীপ এলাকা। এতে হতাশ এলাকাবাসী ও নদী পাড়ের মানুষগুলো। তবে আশার কথা হচ্ছে ৯ অক্টোবর একনেক বৈঠকে পাশ হতে যাচ্ছে শ্রীপুর-খরণদ্বীপ-জ্যৈষ্ঠপুরা এলাকার প্রায় ৩০ কোটি টাকার নদী ভাঙ্গনরোধে ব্লক নির্মাণ প্রকল্প। এতে আশায় বুক বেঁধেছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি রতন চৌধুরী জানান, সব ঠিক থাকলে আগামী ১২ অক্টোবর এ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন স্থানীয় সাংসদ, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।
জানা যায়, ২০১৩ সালের ২ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় রাউজান ও বোয়ালখালী অংশে কর্ণফুলী নদীভাঙন প্রতিরোধে ৭২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে। ২১টি প্যাকেজে ভাগ করে এ প্রকল্প পাস করা হয়। এতে নদীর ডান তীরে রাউজান উপজেলার সাতটি ব্লক ও বোয়ালখালী উপজেলার বাম তীরে সাতটি ব্লক, বোয়ালখালী খালের পাঁচটি, রায়খালী খালের দুইটি ব্লকে ভাঙন প্রতিরোধে সি সি ব্লক বসানো হয়। তবে এ প্যাকেজে শ্রীপুর-খরণদ্বীপের প্রায় ৫ কিলোমিটার নদী তীর ছিল না।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের জ্যৈষ্ঠপুরা ভান্ডালজুরি খাল ও ভান্ডালজুরি জেলে ও বড়ুয়াপাড়া, শেখপাড়া, শ্রীপুরের ভারাম্বাঘাট, ভাঙ্গাপুকুর, হরিশ চন্দ্র মুন্সির ঘাট, খরণদ্বীপের খেলারঘাট পুরো এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে অকাতরে। নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে এ ভাঙ্গনের মাত্রা গত কয়েক দশকে বেড়েছে কয়েকগুণে। এছাড়া জ্যৈষ্ঠপুরা পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবল পানির ঢল ভান্ডালজুরি খালের উভয়তীর অকাতরে বিলীন হচ্ছে খালের গর্ভে। এতে স্থানীয়রা হারাচ্ছে ঘরের পাশাপাশি কবরস্থান, শ্বশান, মন্দির, মসজিদ। স্থানীয়রা জানান, গত এক দশকে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে ঘর হারিয়েছে শ্রীপুরের দিদারুল ইসলাম, মো. সেলিম, মো. হারুন, আবদুস সালাম, আবদুর রহিম, নুরুল ইসলাম, মোজাহেরুল হক, এজাহার মিয়া, শেখপাড়ার আবদুস শুক্কুর, আবুল হাশেম, ঝুনা মিয়া, মো. শফি, ভান্ডালজুরির আবদুল হক, ফরিদা বেগম, মো. ফোরকান, আছিয়া বেগম, রেজাউল করিম, নুরুল হক, সাহাব মিয়া, আবদুল গফুর, আলী হামজা, নূর হামজা, মুসলিম মিয়া, আলী আকবর প্রমুখ।
এব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম রাজা বলেন, কর্ণফুলি নদীপাড়ের মানুষগুলো বেশি অসহায়। ভাঙ্গনের সাথে তাদের যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। এ ব্যাপারে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
জানতে চাইলে স্থানীয় চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোকারম বলেন, মাননীয় সাংসদ ড. হাছান মাহমুদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জলবায়ু ফান্ড থেকে ২০১৩ সালে প্রায় ৫৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ভান্ডালজুরি খালের কর্ণফুলি লাগোয়া অংশে ব্লক ফেলে ভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। তবে পানির তোড়ে আর অব্যাহত ভাঙ্গনে তা বেশিদিন টিকেনি। পুরোটাই ব্লক ফেলানোর তদবির বারবার করা হচ্ছে। আশা করি একনেক বৈঠকে ৩০ কোটি টাকার প্রকল্প পাশ হলে দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।

Share
  • 1
    Share