নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » শাহানশাহ মাইজভা-ারী (কঃ) এবং ঐশীপ্রেমের অসীমতা

শাহানশাহ মাইজভা-ারী (কঃ) এবং ঐশীপ্রেমের অসীমতা

শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী (কঃ) হলেন মাইজভা-ার দরবার শরীফের অনন্ত মহাসমুদ্রের এক অনন্য আলোকধারা। সম্পর্কের দিক থেকে তিনি মাইজভা-ার দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ হযরত গাউসুল আযম শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহর (কঃ) প্রপৌত্র এবং গাউসুল আযম বিল বিরাসত হযরত শাহসুফি সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবা ভা-ারী কেবলা আলমের দৌহিত্র। পবিত্র সৈয়দী শোণিত ধারার অকৃত্রিমতার কারণে শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী দৈহিক সত্তাগত আকৃতিতেও ছিলেন পুণ্য¯œাত আলোকধারা।
শাহানশাহ মাইজভা-ারী কেবলা আলম মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের একজন মাদারজাত অলি। তাই মা’রিফাতের বাদশাহ শিশুকালে তাঁর অন্তরে অবলীলায় প্রবেশ করে শুরুতে তাঁর জন্য (শাহানশাহ) অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক সবকিছু বিনাশ করে দেন।
সূরা আল নমল এর ৩৪নং আয়াতে উল্লেখ আছে, ‘বাদশা যখন কোন গ্রামে প্রবেশ করেন তখন সেখানে পূর্বের সবকিছু বিধ্বস্ত করে ফেলেন”। উপর্যুক্ত আয়াতের হাকীকত বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, এ ধরনের পরম সৌভাগ্যবানরা তাওহীদের কান্তিময় ¯িœগ্ধ আভায় অতি নৈকট্যশীলদের একজন হন, যিনি বা যাঁরা ভূমিষ্ট হবার পর মা’রিফাতের বাদশাহকে অনন্ত ইশকের প্রোজ্জ্বলতায় ধারণ করে বিশুদ্ধতা লাভ করেছেন। শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী এঁদেরই অনন্য একজন। এতে নিঃসন্দেহে দৃঢ় আস্থা পোষণ করা যায় যে, পার্থিব জীবনের শুরুতে তাঁর অন্তরে ঈমান এবং আখলাক বিজয়ী বেশে প্রবেশের মাধ্যমে চিরন্তনতা অর্জন করে।
বাবা ভা-ারী কেবলা আলম তাঁর পবিত্র জবানে উল্লেখ করেছেন, “আমি সামশুল হুদা (সুলতানুল আরেফিন হযরত শাহসুফি সৈয়দ সামশুল হুদা মাইজভা-ারী) এবং জিয়াউল হককে (শাহানশাহ হযরত শাহসুফি সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী) আমার মকতবে সবক দিয়েছি।” মাইজভা-ার শরীফে বাবা ভা-ারী কেবলা আলমের পাঠশালার নাম “মকতবে ইশ্ক”। আল্লামা ইকবালের মতে মকতবে ইশকের অত্যাবশ্যকীয় বিধান হচ্ছে ইশকের শিক্ষার্থীদের কোন প্রকার ছুটি মিলে না। এ ধরনের পাঠশালার ছাত্ররা মুর্শিদ কর্তৃক নির্ধারিত পাঠ্যক্রম নিয়ে অহর্নিশ ব্যস্ততম সময় অতিবাহিত করি। মকতবে ইশ্কের প্রধান পাঠ হচ্ছে “দিল দিয়া দর্দ লিয়া।” অর্থাৎ অন্তরকে উদার এবং উজাড় করে দিয়ে যত সব দুঃখ জ¦ালা যন্ত্রণা বেদনা বহন করতে হবে।
কয়েকের মধ্যে “মকতবে ইশকের” শিক্ষার্থী হবার অনুপম সৌভাগ্যধারী শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী পার্থিব নিয়ম অনুযায়ী লেখাপড়ার জন্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে ক্রমান্বয়ে বি এ ফাইনালের জন্য নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ অবস্থায় পরীক্ষা কক্ষে ঐশী প্রেমের উদ্দাম ঢেউয়ের প্রাবল্যে উত্তাল উদ্দীপ্ত হয়ে সাদা খাতা রেখে কক্ষ থেকে বের হয়ে পড়েন। চট্টগ্রামের মোহসেনীয়া মাদরাসায় পরীক্ষা কক্ষে “ঐশী প্রেমের উত্তাল ঘূর্ণি প্রবাহের হাল”এর পূর্বে তাঁর মাতামহ বাবা ভা-ারী কেবলা আলমের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছিল। মহান আল্লাহ বাবা ভা-ারীর দৌহিত্র শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারীর মধ্যেও একই উদ্দীপনার (মওজ) অনুরননের মাধ্যমে মূলতঃ “মকতবে ইশকে” সর্বোচ্চ মানের সনদ প্রাপ্তির প্রতিস্থাপন ঘটিয়েছেন। কানুনগোপাড়া কলেজ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটার পর শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী অতি দ্রুত ইশকে ইলাহীতে তন্ময় এবং ভাববিভোর হয়ে পড়েন। খাওয়া পরাসহ সকল প্রকার জাগতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্ঘুম কালাতিপাতের মধ্যে নিজের শয়নকক্ষে একাকী নিরন্তর সাধনায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। পরিচিতজন, আত্মীয় স্বজন এমনকি পিতা-মাতা ভাই বোনদের থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে তানহায়ীকে (একাকীত্ব) পরমানন্দে বরণ করে নেন।
পৃথিবীর বুকে পবিত্রতম মানুষ হিসেবে স্বীকৃত ‘আহলে বায়েত’। আহলে বায়েতের শুদ্ধতম উত্তরাধিকারত্বের শোণিত ধারায় আবির্ভূত হন শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী (কঃ)। পারিবারিক সম্মান, সম্ভ্রান্তধারা, এমনকি মান্না সালওয়ার মতো রিজিকের আঞ্জাম হযরত গাউসুল আযম শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভা-ারী কেবলা আলম স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। কোন স¤্রাট, রাজা বাদশাহ এবং দাম্ভিক শাসকেরা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং পারিতোষিক দিয়ে যে আনুগত্য এবং ভালবাসা কখনো অর্জন করতে পারে না, অনায়াসে পরম আনুগত্য, বিন¤্র শ্রদ্ধা এবং প্রাণাধিক ভালবাসা তাঁরা অর্জন করে নিয়েছেন। ফিতরতের অববাহিকতায় এ ধরনের পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যে জন্ম নিয়ে শাহানশাহ সার্বক্ষণিক আনন্দঘন সুখভোগ এবং আরাম আয়েশকে পরিত্যাগ করে ঐশী সাধনার পরম কষ্টকর কণ্টকাকীর্ণ “হিম্মতে মদিনা” জিন্দেগীতে নিজেকে সমর্পণ করে আধ্যাত্মিক জগতে উপমা স্থাপন করেছেন।
শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী (কঃ) একদিকে ছিলেন আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারিত্বের উপমা, অন্যদিকে বিরাম বিশ্রামহীন সাধনার কারণে আধ্যাত্মিক সাধকদের জন্য অত্যুজ্জ্¦ল দৃষ্টান্ত। তাঁর সাধনার রীতি ছিল বিজলীর মতো দ্রুততম এবং ভয়ভীতি শংকাহীন লা পরোয়া। আল্লামা জালাল উদ্দীন রুমীর ভাষায় আধ্যাত্মিক সাধনায় এ ধরনের অবিশ্রান্ত পথচলা হচ্ছে ‘জাহেদগণ ভয়ে ভয়ে পায়ে হেঁটে চলে, আশেকগণ বিজলী ও হাওয়ার চাইতে বেশি গতিতে এগিয়ে চলে।”
শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী কেবলা আলম বিভিন্নমুখী কর্মতৎপরতা এবং সাধনার মাধ্যমে এমন স্তরে উপনীত হয়েছেন, গরীবে নেওয়াজ সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর (কঃ) ভাষায়, তুমি যদি তাঁর (আল্লাহর) মুখ দর্শন করতে চাও, আমার চেহারার দিকে তাকাও আমি তাঁর দর্পণ, তিনি আমার থেকে পৃথক নন।”মাহবুবে ইলাহী হযরত খাজা নিজাম উদ্দিন (কঃ) এর প্রিয়তম অনুগামী সুফি সাধক, কবি আমির খসরু (রহ”) উল্লেখ করেছেন, “আমি তুমি হলাম, তুমি আমি হলে, আমি দেহ হলাম, তুমি হলে প্রাণ, এরপর কেউ যেন বলতে না পারে। আমি একজন, তুমি আরেকজন।” মহান আল্লাহর অনুপম নৈকট্য প্রাপ্ত শাহানশাহ হলেন আধ্যাত্মিক পদ মর্যাদায় বাদশাহর বাদশা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে মাইজভা-ার শরীফের মূল আদর্শ তাওহীদের সার্বজনীন রূপ প্রকাশ করে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তাই তিনি ঘোষণা করেছেন, “আমার দরবার প্রাচ্যের বায়তুল মোকাদ্দাস।” তাঁর সাধনা রীতি, কর্মোদ্দীপনা, অগণিত কারামত প্রদর্শন, ভক্ত হৃদয়ে ঐশী প্রেম জ¦ালা সৃষ্টি, সর্বাবস্থায় নিজের মধ্যে আশেক মাশুকাস্ত”- ‘মাশুক আশেকাস্ত” বিরাজমান রেখে বিরহ মিলন বিচ্ছেদকে ঐশী লহরীতে একাকর করে মানব হৃদয়ে ‘হা’ হু’ শব্দের দ্যোতনা সৃষ্টি করে দেয়ার মতো উন্মুক্ত শক্তি প্রদর্শনের কারণে শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী মাইজভা-ার দরবার শরীফে স্বতন্ত্র অবস্থানে স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে আছেন।

Share
  • 1
    Share