নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা অফিস

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাস্তা করানো হবে’- এ উদ্ধৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠন আন্তর্জাতিক জঙ্গিদের সহায়তায় হামলা করে। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সাহায্যে প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটনাস্থল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩ নম্বর বঙ্গবন্ধু এভিনিউর সম্মুখে যুদ্ধে ব্যবহৃত স্পেশালাইজড মারণাস্ত্র, আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটনা ঘটানো হয়। প্রশ্ন ওঠে কেন এই মারণাস্ত্রের ব্যবহার? এটা কাম্য নয়।’ গতকাল বুধবার ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব কথা বলেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ওই ধরনের হামলা হলে সাধারণ মানুষ ‘রাজনীতিবিমুখ’ হবে। শেখ হাসিনাকে হত্যা করে দলকে নেতৃত্বশূন্য করতেই যে এই হামলা হয়েছিল এবং তাতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে এ মামলার তদন্তে উঠে আসে। ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায়’ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ওই হামলায় যুদ্ধে ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড ব্যবহারের প্রসঙ্গ টেনে বিচারক বলেন, প্রশ্ন ওঠে, কেন এই মারণাস্ত্রের ব্যবহার? রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের উপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয়, দলকে নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা। রাজনীতিতে অবশ্যম্ভাবীভাবে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়।
বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন রায়ে বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে দলই থাকবেন, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা মোটেই গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়। দ-বিধিতে করা হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার রায়ে ১৪টি বিষয়কে বিবেচ্য হিসাবে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে বিচারক তার রায়ে বলেন, প্রসিকিউশন পক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে ‘পরিকল্পিত অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র’ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
রায়ের পর্যালোচনায় তিনি বলেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ‘পরাজিত শক্তি’ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ওই হত্যাকা-ের পর চার জাতীয় নেতাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। এরপরও ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়। ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করানো হবে’- এই উদ্ধৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে। বিচারক বলেন, সাধারণ জনগণ এ রাজনীতি চায় না। সাধারণ জনগণ চায়, যে কোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে যোগ দিয়ে সে দলের নীতি, আদর্শ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ধারণ করতে। আর সমাবেশে আর্জেস বিস্ফোরণ করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এ ধারা চালু থাকলে পরবর্তীতে দেশের জনগণ রাজনীতি-বিমুখ হয়ে পড়বে। গ্রেনেড হামলার পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে তার চিকিৎসক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তা পর্যালোচনা করার কথাও বিচারক রায়ে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বনানীর যে বাড়িটি ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিত, তা ওই সময় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কি না, সেখানে তারেক রহমান ষড়যন্ত্রের সভা করেছিলেন কি-না, জঙ্গি নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বৈঠক করেছে কি না- সেসব বিষয়ও বিবেচনা করা হয়েছে রায়ে। ঘটনার সময় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ফলে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীর ডান কানে গুরুতর জখম হয়। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে উল্লেখিত নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব বলে আদালত মনে করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ‘সাধারণ জনগণ এ রাজনীতি চায় না। সাধারণ জনগণ চায় যে কোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে যোগ দিয়ে সে দলের নীতি, আদর্শ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানধারণ করতে পারবে। আর সেই সভা-সমাবেশে আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণকে হত্যার ধারা চালু থাকলে পরবর্তীতে দেশের সাধারণ জনগণ রাজনীতি-বিমুখ হয়ে পড়বে। আদালত চায় না সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ শরিফের ঘটনার, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ওপর নৃশংস হামলার, রমনা বটমূলে সংঘটিত বোমা হামলার এবং অত্র মোকদ্দমায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ওপর নৃশংস বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার পুনারাবৃত্তি।

Share