ইফতেখারুল ইসলাম

বাল্যবিবাহ এবং শিশু নির্যাতন বন্ধে চট্টগ্রামের শিশুরা শিশু হেল্প লাইন ‘১০৯৮’ এর সেবা গ্রহণে অনেক পিছিয়ে। চট্টগ্রামের অধিকাংশ অভিভাবক এবং শিশুরা জানেনই না হেল্পলাইনে কল করে যেকোন শিশু যেকোন মুহূর্তে সাহায্য নিতে পারে। সমাজসেবা অধিদপ্তর, পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা এই সেবা দিতে বাধ্য। প্রচারণা এবং সচেতনতার অভাবে সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম, সিলেটসহ কয়েকটি বিভাগ। অপরদিকে এগিয়ে গেছে রংপুর এবং বরিশাল।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হেল্পলাইনে মোট কল আসে দুই লাখ ১৪ হাজার ৬০১টি। এর মধ্যে পুরুষের কল এক লাখ ৯২৬৯টি, মহিলার কল ৬৬ হাজার ৫৩০টি, হিজড়া ১২টি, নিরব ৩৮ হাজার ৭৯০টি। বিভাগ হিসেবে মোট কলের সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ কল এসেছে ঢাকা থেকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশ কল এসেছে রংপুর থেকে। এছাড়া বরিশাল ১৭ শতাংশ, খুলনা ১১ শতাংশ, চট্টগ্রাম ৮ শতাংশ, রাজশাহী ৬ শতাংশ এবং সিলেট ৫ শতাংশ। একই সময়ে এই হেল্পলাইনের সাহায্য নিয়ে সারাদেশে বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছে ১৩৪৩টি। বিভাগভিত্তিক বাল্যবিবাহ বন্ধের চিত্রে দেখা যায়, বরিশাল থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ কল এসেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ কল আসে রংপুর থেকে। এরপর আছে খুলনা ১৫ শতাংশ, ঢাকা ৭ শতাংশ, ময়মনসিংহ ৬ শতাংশ, চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী তিন শতাংশ করে।
অপরাজেয় বাংলাদেশ চট্টগ্রাম জোনের ইনচার্জ মাহাবুব উল আলম পূর্বকোণকে বলেন, দেশে একেকটা সেবার জন্য একেকটি হেল্পলাইন চালু হচ্ছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এতগুলি নম্বর মনে রাখা কঠিন। হেল্পলাইনে সেবা নেয়ার হার কম হওয়ার এটিও একটি কারণ। সরকারের উচিত সব ধরনের সেবা একটি হেল্পলাইনের মধ্যেই নিয়ে আসা। একটি নম্বরে টোল ফ্রি কল করলেই যে যার প্রয়োজনীয় সেবা পেলে সবাই ওই নম্বরে কল করবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত শিশুদের নির্যাতন, অপহরণ কিংবা শিশুদের যেকোন ধরনের সাহায্যের জন্য এই হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। ২০১০ সালের নভেম্বর মাস থেকে পুরান ঢাকার ৮টি থানা ২০ ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে এটি পরিচালিত হয়। অপরাজেয়-বাংলাদেশ নামক একটি এনজিও পরীক্ষামূলকভাবে চাইল্ড হেল্পলাইন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করার পর সরকার দেশব্যাপী এ কার্যত্রম পরিচালনার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এই হেল্পলাইনের উদ্বোধন করেন। যার মাধ্যমে সারাদেশের শিশুরা বিনামূল্যে এই সেবা গ্রহণ করতে পারে। এর মধ্যে যেসব কল এসেছে তার বেশিরভাগই শিশুদের নিয়ে। তবে অনেকেই কোন কারণ ছাড়াও কল করেছে। কেউ কেউ গল্প করার জন্য কিংবা মনের দুঃখ প্রকাশ করার জন্যও কল করেছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের চাইল্ড হেল্পলাইন-১০৯৮ সিএসপিবি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহায়মেন পূর্বকোণকে জানান, তথ্য না জানার কারণে অনেকেই সেবা নিতে পারছেন না। সচেতনতা সৃষ্টি হলে মানুষ সহজেই সেবা পেতে পারে। ইতিমধ্যে অনেক উপকারভোগী হেল্পলাইনে কথা বলেই সমাধান পেয়ে যাচ্ছেন। মূলত সরকারের বিদ্যমান যেসব সেবা রয়েছে হেল্পলাইন তার যোগাযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। আবার এই হেল্পলাইন নিয়ে এনজিওরা কোথাও কোথাও কাজ করেছে। তাই সেসব এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ওইসব এলাকা থেকে বেশি ফোন এসেছে। তিনি জানান, শিশু আইনে শিশু রক্ষার কথা বলা আছে। এই হেল্পলাইন ২৪ ঘণ্টা বিশ্বস্ত টেলিফোনিক পরিসেবার মাধ্যমে শিশুর জরুরি সেবা/ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে উদ্ধার ছাড়াও টেলিফোনি কাউন্সিলিং, কেস ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরাসরি অথবা রেফারালের মাধ্যমে শিশুর জন্য যথাযথ প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা করে।
হেল্পলাইনে উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিশু আইন ২০১৩ এর প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা ও যত্ন প্রদানের লক্ষ্যে এই হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। শিশুদের বিশেষ যত্ন ও জরুরি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক/ প্ল্যাাটফর্ম স্থাপন করা। এর মাধ্যমে শিশু এবং প্রাপ্ত বয়স্কদেরকে শিশু অধিকার বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। দেশের যেকোন স্থান থেকে সেন্ট্রালাইজ কলসেন্টারের মাধ্যমে সপ্তাহে সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা টেলিফোনিক পরিষেবা দেয়া। যখন কোন শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান থেকে উদ্ধার করতে হয়, তখনই মোবাইল টিম সরেজমিনে শিশুর কাছে যায়। শিশুর যত্ন ও সুরক্ষা বিধানের লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদী/দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করার জন্য পরিষেবা প্রদানকারীর সাথে মোবাইল টিম প্রয়োজনে লিংক করে দেয়। ওই টিমে প্রবেশন অফিসার হিসেবে উপজেলা সমাজসেবা অফিসার কাজ করেন।
এই হেল্পলাইন সেবার কথাটি সাধারণ মানুষের কাছে যথাযথভাবে না পৌঁছানের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহায়মেন বলেন, প্রকল্প থেকে প্রচারণা চলছে। তবে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ওয়ার্ডপর্যায়ে যেসব কমিটি রয়েছে তারাও এই সচেতনতায় ভূমিকা রাখতে পারে। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন সচেতন নাগরিক হিসেবে তা ছড়িয়ে দেয়া সবার দায়িত্ব। তাহলে শিশুরা অনেক বেশি উপকৃত হবে।

Share
  • 31
    Shares