নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » বাঙালির আবিষ্কার ইলিশের জীবনরহস্য

বাঙালির আবিষ্কার ইলিশের জীবনরহস্য

বাংলাদেশের ‘সোনালী আঁশ’ খ্যাত পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের পর এবার দেশের বিজ্ঞানীরা জাতীয় মাছ ইলিশের জীবনরহস্যও উন্মোচনে সফল হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন বিজ্ঞানী পৃথকভাবে গবেষণা করে প্রায় একই সময়ে এই সাফল্য লাভে সক্ষম হয়েছেন। ইলিশের জীবনরহস্য তথা জিন-নকশা (জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচনের ফলে সবচেয়ে সুস্বাদু মাছ ইলিশ নিয়ে আরো গবেষণা, জাত উন্নয়ন, সংরক্ষণ এবং এর উৎপাদন বৃদ্ধিতে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে। এটি আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় সুসংবাদ।
গেল বছরই ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই-জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে ইলিশ এখন সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। এমন পরিস্থিতিতে গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কৃত হলো ইলিশের জীবনরহস্য। উল্লেখ্য, দেশীয় ইলিশের রেফারেন্স জিনোম প্রস্তুুতকরণ, জিনোমিক ডাটাবেজ স্থাপন এবং মোট জিনের সংখ্যা নির্ণয় করার জন্য গবেষণা শুরু করেছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। তারই ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি এ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ সামছুল আলমের নেতৃত্বে বিশ্বে প্রথমবারের মতো উন্মোচিত হলো ইলিশ মাছের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমেস্ট্রি এন্ড মলিকিউলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খানের নেতৃত্বে অপর একটি গবেষকদলও ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচনের দাবি করেছে। গবেষণাকাজটি গবেষকবৃন্দের নিজস্ব উদ্যোগ, শ্রম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পারস্পারিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হয়েছে। বলা যায়, এ গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলদেশের মৎস্যসেক্টর পূর্ণাঙ্গ জিনোম গবেষণার যুগে প্রবেশ করলো। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে সাফল্যের এই ধারাবাহিকতায় অন্যান্য মাছের জীবনরহস্য উন্মোচনও সহজ হবে।
প্রসঙ্গত, জিনোম হচ্ছে কোনো জীবের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। জীবের জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজনন ও পরিবেশের সাথে খাপখাওয়াসহ সব জৈবিককার্যক্রম পরিচালিত হয় জিনোম দ্বারা। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ইলিশের জিনোমে ৭৬ কোটি ৮৪ লাখ নিউক্লিওটাইড রয়েছে, যা মানুষের জিনোমের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে অসংখ্য অজানা প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে খুব সহজেই। বাংলাদেশের পানিসীমার মধ্যে ইলিশের স্টক কত এবং পদ্মা ও মেঘনা নদীর মোহনায় প্রজননকারী ইলিশগুলো ভিন্ন ভিন্ন স্টক কি না তা জানা যাবে এই জিনোম সিকোয়েন্সর মাধ্যমে। উল্লেখ্য, ইলিশ বছরে দুইবার প্রজনন করে থাকে। জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে এই দুই সময়ের ইলিশ জিনগতভাবে পৃথক কি না তা জানা যাবে। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট নদীতে জন্ম নেয়া পোনা সাগরে যাওয়ার পর বড় হয়ে প্রজননের জন্য আবার একই নদীতেই ফিরে আসে কি না সেসব তথ্যও জানা যাবে এই জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে। নিশ্চিত করা যাবে ইলিশের টেকসই আহরণ। ইলিশের জন্য দেশের কোথায় কোথায় ও কতটি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন তাও নির্ধারণ করা সহজ হবে। দেশীয় ইলিশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ইলিশ থেকে জীনতাত্ত্বিকভাবে স্বতন্ত্র কি না তাও নিশ্চত হওয়া যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সংবেদনশীল ও খাপ খাওয়ার জন্য নিয়ামক জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে ইলিশের বায়োলজির ওপর বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিরূপণ করাও সহজ হবে।
ইলিশ আমাদের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। সুপ্রাচিনকাল থেকেই আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পুষ্টি সরবরাহে এ মাছ অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু এতোদিন এই সুস্বাদু মাছটির জীবনরহস্য আমাদের কাছে অজানা ছিল। আমাদের বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলে এখন সে রহস্য উন্মোচন হলো। পাট ও মহিষের পর তৃতীয় গবেষণাসাফল্য হিসেবে ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন করলেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। উল্লেখ্য, বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ হয় বাংলাদেশে এবং দেশের মোট উৎপাদনের ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় দুই-শতাংশ। আশা করা যায়, জীবনরহস্য উন্মোচনের ফলে পুষ্টিসরবরাহ, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইলিশের বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হবে। এখন উভয় গবেষণার সুফল কিভাবে বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে, সেই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

Share