নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশ ভাবনা

বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশ ভাবনা

পরিবেশ সংরক্ষণে শিক্ষা ও সংস্কৃতিঃ পরিবেশ সংরক্ষণে জনগণকে দায়িত্বশীল করতে হলে তাদের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের সাথে সাথে পরিবেশ সম্পর্কীয় শিক্ষা-অর্জনের ব্যবস্থাও অত্যাবশ্যক। যে বিপুল জনগোষ্ঠীর হাতে পরিবেশ সৃষ্টি ও ধ্বংস নির্ভর করছে, তারা “একটি মাত্র পৃথিবী -সকলের যতেœ, সকলের জন্য“ বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এই শ্লোগানটি আদৌ জানেন না। কারই তাঁরা নিরক্ষর। নিরক্ষর বলে তাঁরা জানেন না, যে গাছটি তিনি নিধন করছেন, তা তাঁকে অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে, তাঁর দেহ নি:সরিত বিষ শুষে নিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া পাহাড়ী অঞ্চলে বন সংরক্ষণ কল্পে একটি আন্দোলন গড়ে উঠেছে সরকারী সহযোগিতায়। এ অঞ্চলের অধিবাসী/কর্মী সকালে পাহাড়ী এলাকায় যখন কাজ করতে যায়, তখন তাঁরা কোরাসের ভঙ্গিতে শপথ নেন যে, তাঁরা বৃক্ষ নিধন করবেন না। শপথটির অংশ বিশেষ হচ্ছে:
“আমার উত্তরে আমার দক্ষিণে আমার পূর্বে আমার পশ্চিমে আমার শব্দে আমার নৈ:শব্দে যা বিরাজিত এবং বিস্তৃত তারই নাম প্রকৃতি। আমি স্বজ্ঞানে জানি আমিও এই প্রকৃতির অন্তর্গত। প্রকৃতির কল্যাণতম রূপ সম্পর্কে আমি সচেতন হতে বাধ্য। আমি জানি এই আকাশ এই বাতাস এই জল এই স্থল আমাকে ঘিরে থাকা এই প্রাণসম্পদ কতো অসীম এবং কতো মহিমাম-িত। প্রকৃতিকে ধারণ করে আছে যে বৃক্ষ সে আমাদের প্রিয়তম পৃথিবীর মধ্যে এনেছে জীবনের উজ্জ্বল সব সঙ্গতি। এই বৃক্ষের বিরুদ্ধে যায় এমন কোন কাজ আমি নিজে কখনো করবো না এবং অন্য কাউকে করতে দেবো না কখনো।”
এই শপথ বাক্য পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যেই উচ্চারিত। একমাত্র শিক্ষা ও অক্ষরজ্ঞান দানের মাধ্যমেই এভাবে অঙ্গীকার বদ্ধ হওয়া যায়। এছাড়াও এই অঞ্চলের লোকগীতি, গণসংগীত রচিত ও গাওয়া হয় বৃক্ষ প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের কথামালা দিয়ে। তেমনি, আমাদের দেশে যে শিক্ষা, যে সংস্কৃতি বিস্তৃত হয়ে আছে, তাতে যদি বৃক্ষ ও প্রকৃতি লালনের কথা গেঁথে দেয়া হয়, তাহলে পরিবেশ সংরক্ষণচর্চা ও মানুষের সচেতনতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। এবং এভাবেই একটি সামাজিক আন্দোলনের দ্বার উন্মোচন করা যাবে।
পরিবর্তনের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সামঞ্জস্য গড়ে তোলা :
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন সভ্যতা চলমান। সভ্যতা এক স্থান হতে অন্য স্থানে চলে যায়। এর পেছনে প্রকতির ভূমিকা রয়েছে। মানুষের ভূমিকা রয়েছে। জলবায়ু-আবহাওয়া এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যায়। জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের সভ্যতারও পরিবর্তন ঘটে। আর, তাই এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার বিন্যাস ঘটাতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে এই বিন্যাস বেশী প্রয়োজন, আর তা হচ্ছেঃ
উপকূলীয় অঞ্চলে ফসলের বিভিন্নতা আনয়ন।
ফসল রোপণের ধরন পরিবর্তন।
কৃষি ও মৎস্য শিল্পে অভ্যাস ও কৌশল পরিবর্তন।
জলসেচের পরিমান ও সময়সূচী পরিবর্তন।
পেশা ও আয়ে বহুমুখিতা আনয়ন।
গৃহস্থালী ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন।
স্বাস্থ্য ও পয়:প্রণালী ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস।
সম্পদ ও উপকরণ লভ্যতায় বিন্যাস।
স্বল্প ও দীর্ঘ-মেয়াদী নিজস্ব কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে উৎসাহ প্রদান।
মৎস্য ও কৃষি শিল্প-অবকাঠামো পুনঃবিন্যস্ত।
এই পৃথিবীতে প্রাণের জন্ম ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, আলো-তাপ, বায়ু-পানি-মাটি ও উদ্ভিদের এক অনন্য আন্তক্রিয়ায় যে অনুকূল নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই নিরাপদ পরিবেশের কোলেই প্রাণ আর জীবনের স্পন্দন ও স্ফূরণ ঘটেছিল। আর, ভবিষ্যতে এই প্রাণ আর জীবনের বিলুপ্তি যদি ঘটে, তাও কিন্তু এক প্রতিকূল পরিবেশের জন্যই ঘটবে। যার জন্য বিশাল ভাবে দায়ী থাকবে এই মানবপ্রজাতি। কারণ পৃথিবীর আর অন্য কোন প্রাণী প্রকৃতি হতে তার প্রয়োজনের অধিক আহরণ করে না। কিন্তু মানুষ করে এবং অতিরিক্তই করে। তাই প্রকৃতি প্রতিশোধ না নিয়ে কখনো ছাড়বে না।
পরিবেশকে নিরাপদ করা না গেলে মানুষ কখনো নিরাপদ হতে পারে না, এই কথাটি আমাদের মতো ক্ষুদ্র দেশের জন্য ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। ভৌগোলিকভাবে নাজুক অবস্থানের এই দেশের উপকূলীয় পরিবেশকে নিরাপদ বিধান যতদিন না করা যাবে, ততদিন এই অঞ্চলের বিশাল মানবগোষ্ঠীকে নিরাপদ বলা যাবে না। বিগত এক দশক যাবৎ বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণমুখী প্রচুর আন্দোলন গড়ে উঠেছে এবং জনগণকে পরিবেশ সংরক্ষণে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে সাহায্যও করছে এ সব আন্দোলন। তথাপি সমগ্র সমাজ সেই ‘চিপকো‘ আন্দোলনের মানুষদের মতো যতোদিন না পরিবেশ রক্ষাকারী জৈব উপাদানগুলোকে জড়িয়ে ধরে রক্ষা না করছে, ততোদিন কোন অঙ্গিকারই সফলতার মুখ দেখবে না। হিমালয় পাদদেশে গাড়োয়াল অঞ্চলের পাহাড়ী এলাকায় কাঠের ঠিকাদার কাঠ কাটার জন্য আসলে ঐখানকার গ্রামবাসীরা বৃক্ষগুলোকে জড়িয়ে ধরে গাছ কাটতে বাধা দেয়। তখন থেকেই সেখানে প্রকৃতি রক্ষার্থে ‘চিপকো‘ আন্দোলন গড়ে উঠে। (হিন্দি ও গাড়োয়ালী ভাষায় চিপকো কথাটির অর্থ জড়িয়ে ধরা)। ঠিক এভাবেই সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে উপকূলীয় পরিবেশ সংরক্ষণার্থে আমাদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
আমরা যে বনের, মাঠের, বাগানের ও সাগর-নদীর Ñ এগুলোর সাথে যে আমাদের সম্পর্ক রয়েছে, প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে আমাদের যে, আদিঅন্ত সম্পর্ক রয়েছে, এই চেতনার বীজ সমাজের মধ্যে অংকুরিত করতে হবে। তবেই আমরা পরিবেশ সংরক্ষণ করতে পারবো। তথা নিজেদের রক্ষা করতে পারবো। আর এই চেতনা সৃষ্টি করার প্রথম শর্ত হচ্ছে অনুন্নত আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি সাধন। একজন সাধারণ মানুষের যেখানে তার বর্তমান বছরটাই কাটছে না, সেখানে তাকে ২০৩০ সালে সমুদ্র ফুলে উঠে তাকে যে ডুবিয়ে মারবে – এই কথা তাকে মোটেই প্রভাবিত করবে না। কারণ, অনুন্নত আর্থ-সামাজিক অবস্থায় মানুষকে সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও বস্তুনিষ্ঠতা হতে সদা দূরে সরিয়ে রাখে। আগামী প্রজন্মের কাছে পরিবেশকে লালন করার একটি বীজ যদি এখন আমরা বপন না করে যেতে পারি – তবে হয়তো পরিবেশ করুন ভাবে আমাদের ধ্বংস করবে – আসুন আমরা সেই ধ্বংস থেকে মুক্তির সঠিক পথ খুঁজে বের করি।

লেখক পরিচিতিঃ উন্নয়ন কর্মী
ঊ-সধরষ: সধহরশপড়ফবপ@মসধরষ.পড়স

Share