নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » বাবার মায়া বাবার হাসি

বাবার মায়া বাবার হাসি

একটি বছর হয়ে গেল ‘বাবা’ ডাকটি আর ডাকতে পারি না। প্রিয় বাবার সেই আদর মাখা হাসিমুখখানা আর দেখতে পাই না, সেই মায়াভরা কন্ঠটি আর শুনতে পাই না। প্রায়ই চেষ্টা করি ভাবতে এটি একটি দুঃস্বপ্ন। ঘুম ভাঙলেই দেখব সবই ঠিক আছে। কিন্তু না, এ দুঃস্বপ্ন আর কাটে না। বাবা আমাদের ছেড়ে সত্যিই চলে গিয়েছে। অ-নে-ক দূরে! যেখানে বাবাকে স্পর্শ করা যাবে না। কপালে হাত রেখে বলা যাবে না ‘ভাল আছ তো বাবা?’
২০১৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যা। লাইফ সাপোর্টে দ্বিতীয় দিনে গভীর ঘুমে থাকা বাবার চারপাশে আমরা। সবার কলেমা, দোয়া ও কান্নার মধ্যে যে যার মত চেষ্টা করছি বাবাকে ফিরে পেতে। মনিটরে রিডিং গুলো আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। আশা-আশংকার মাঝে বাবাকে মুখে গায়ে হাত বুলিয়ে পরম মমতায় ডেকেই চলেছি, ‘বাবা…, বাবা…, বাবা…’। মনে হচ্ছে বাবার ঘুম গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। হঠাৎ ক্ষীণ একটি শব্দ শোনা গেল। এ জীবনে শোনা সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে বেদনার একটি শব্দ- ‘আর নেই’। সব যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। আমাদের বাবা আর নেই! অদ্ভুত কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম আমরা।
অসুস্থ অবস্থায় বাবা ছিল আমাদের কারও না কারও চোখে চোখে। ‘প্রয়োজনের সময় সঠিক মনোযোগ না পেয়ে যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায়’ Ñ এই আশঙ্কায়। আই-সি-ইউ তে থাকলেও আমরা কেউ না কেউ কাছেই কেবিনে, না হয় ভিতরে। চলে যাওয়ার আগের রাতেও বাবার সাথে আই-সি-ইউ তে ছিলাম আমরা দুই ভাইবোন বাবাকে ফিরে পাবার আশায়, বাবাকে হারানোর আশঙ্কায়। তারপরও এমন একটি জায়গায় বাবা চলে গেল যেখানে আমাদের এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশের আর কোন সুযোগ নেই। সান্ত¦না খুঁজি মনে ‘আমাদের সবাইকে তো একদিন যেতে হবে, কিন্তু মানুষের এত ভালবাসা আর সম্মান অর্জন করে বাবার মত বিজয়ী বেশে কয়জন যেতে পারবে !’
সফল-সরল-সুন্দর জীবন বাবার। দাদা-দাদীর ঘর আলো করে জন্ম ১৯৩৪ সালে, চট্টগ্রামের রাউজান থানার কদলপুর গ্রামে। এখানেই তাঁর বেড়ে উঠা। স্কুলের অংকের টিচারের বাবাকে নিয়ে অনেক উচ্চাশা। কিন্তু খুবই অল্প বয়সে কিছু একটা করার ইচ্ছায় শহরে চলে আসতে হয় বাবাকে। সততা, বুদ্ধিমত্তা ও কাজের প্রতি একাগ্রতার ফলে একটি সুগার মিলে কাজের সময় বাবার সুযোগ আসে বিদেশে ট্রেনিং এর। দু’বার নমিনেশন পেয়েও কোন কারণে যেতে না পারায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়, আর চাকরিতে নয়। সেটা ছিল ১৯৬৪ সাল। কোন রকম পূর্ব-পরিকল্পনা ছাড়া নাম-মাত্র পুঁজিতে এক টুকরো জায়গার ওপর শুরু হয় বাবার মোটর পার্টস/সার্ভিসিং-এর ক্ষুুদ্র এক ব্যবসা। ধীরে ধীরে বাবা একটি দুটি গাড়ির মালিক হতে শুরু করে। অকশন থেকে কেনা পুরানো গাড়ি। কঠোর পরিশ্রম আর বুদ্ধিমত্তায় গাড়িগুলো নতুন করে তুলত বাবা। গাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিছু দেশব্যাপী নিজের ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার কাজে ব্যবহার ও কিছু বিক্রি করা, এভাবেই বাড়ছিল ব্যবসার পরিধি। ট্রান্সপোর্ট কাজে যোগ হল বড় ট্রেইলার। গড়ে উঠল দেশের বিশ্বস্ত ও বৃহত্তম রোড ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি ‘সফি মোটরস্ লিমিটেড’। গড়ে তুলল দেশের প্রথম প্রাইভেট কন্টেইনার ডিপো। বাবা ‘আলহাজ সৈয়দ মোহাম্মদ শফি’ হয়ে উঠল একজন ‘আইডল’।
বিভিন্ন জায়গায় বাবার সাথে গেলে বুঝতাম বাবার গ্রহণযোগ্যতা কত বেশি ছিল। একদিন বাবা হাসপাতালে যাচ্ছিল ডাইয়ালাইসিস করতে। সাথে আমি। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বসে থাকব ওখানে সেজন্য আরামের কথা ভেবে খুবই সাধারণ বেশে ছিলাম। পথে হঠাৎ বাবা ড্রাইভারকে বলল সার্কিট হাউজে গাড়ি ঢুকাতে। ওখানে আজ কোন কারণে অনেক ডিপ্লোমেট-ভিআইপিরা আছে। তাদের দাওয়াত করবে আমার ভাইয়ের ছেলের আকিকায়। বিপদে পড়লাম। কারণ, বাবা বলবে ‘আমার মেয়ে, প্রফেসর, কেমিস্ট্রির, চিটাগাং ইউনিভার্সিটির, আমেরিকায় ডিগ্রি করেছে…..’।
আশা করলাম আমাকে নামতে হবে না। বাবা নামল। আমি চুপ করে বসে থাকলাম গাড়িতে। বাবা নরম গলায় বলল ‘না-মো!’। আস্তে করে নামলাম কারণ কোন কিছুতে বাবাকে ‘না’ বলে কষ্ট দিব তা কল্পনাও করতে পারি না। আবেগাপ্লুত হলাম বাবার প্রতি সবার সম্মান ও ভালবাসা দেখে। বাবাকে দেখে সার্কিট হাউজের কর্মচারীর চোখে-মুখেও আনন্দ। অন্যরকম এক আন্তরিকতা, ভালবাসা ও শ্রদ্ধা। যা অর্থ, ক্ষমতা বা ডিগ্রি দিয়েও নিশ্চিত করা যায় না।
ব্যবসায় ও বিভিন্ন কাজে বাবার সততা-স্বচ্ছতা, দৃঢ়তা-দূরদর্শিতা ও কঠোর পরিশ্রমের কথা সর্বজনবিদিত। দুর্লভ এক সরলতা ও নিরপেক্ষতার কারণে কখনও কারও প্রতি বিদ্বেষের লেশমাত্র দেখিনি। বাবা তাঁর সাফল্যের পিছনে যাদের অবদান আছে দেখতাম তাদের ব্যাপারে সচেতন থাকতে। শিক্ষার প্রতি ভালবাসা, গরিব-দুঃখী অসহায়ের প্রতি মমতা, দায়িত্বশীলতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বাবাকে উৎসাহিত করেছে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অকাতরে দান করতে। বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন জনের মুখে জানতে থাকলাম বাবার নিরব দান ও সাহায্য সহযোগিতার পরিধি কত ব্যাপক ছিল।
বাবার ধৈর্য ও সহ্যক্ষমতা, বাবার ইস্পাত কঠিন মনোবল, নতুন করে ভাবতে শেখায়। সাতটি বছর ধরে বাবার চিকিৎসার ব্যাপারে আমরা যখন দেশে-বিদেশে বিভিন্ন হসপিটালে ডাক্তার নার্সদের বিভিন্ন অভিযোগে অস্থির করে তুলেছি। বাবার মধ্যে কখনও দেখিনি কারও প্রতি কোন ক্ষোভ বা অভিযোগ। কষ্টের মধ্যেও দেখতাম মুচকি হাসত।
বাবার উপর ছিল আমাদের নিশ্চিত এক নির্ভরশীলতা। ২০১৫ সালের কথা। ঢাকা-সিঙ্গাপুরে জটিল এক অবস্থা কাটিয়ে যেন বাবার নতুন জন্ম হল। অনেক কষ্টে মুখে এক চা-চামচ সুপ খাওয়া কিংবা কারও সাহায্যে এক কদম হাঁটা থেকে শুরু করে সাত-আট মাসের মাথায় বাসায় অনেকটা আই-সি-ইউ সেট-আপে ঠিকই বাবা সুস্থ হয়ে উঠেছিল। সেবার সিঙ্গাপুর থেকে দেড় মাসের চিকিৎসাশেষে বাবাকে নিয়ে আমরা দেশে ফেরার সময় এয়ার এম্বুলেন্সে হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। লক্ষ্য করলাম পাইলটরা প্লেন না চালিয়ে পেপার পড়ছে, হাসাহাসি করছে দুজন, সামনে দেখছেও না। মনে হচ্ছিল ছোট্ট প্লেনটি আমাদের নিয়ে আকাশে হারিয়ে যাচ্ছে। ভয়ংকর একটি ব্যাপার! কিন্তু আশ্চর্য, ভয় হয়নি তেমন। কারণ, ‘বাবা তো আছে সাথে, হোক না অসুস্থ’। সেই পরম নির্ভরশীলতার বাবা আজ আর নেই। অব্যক্ত শূন্যতার এক অনুভূতির মাঝে কাটছে আমরা আট ভাইবোন, মা ও পরিবারের অন্যদের দিনগুলি।
বাবা আসলে এখন কোথায়? বাবা কি আমাদের দেখছে? ভাবার চেষ্টা করি বাবা আসলে আমাদের আশে-পাশেই আছে, হারিয়ে যায়নি। মাঝে মাঝে মনটি অস্থির হয়ে ওঠে। আমাদের এত আরামে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে বাবা কোথায় ঘুমাচ্ছে? হঠাৎ মনে হয় বাবা যেন হাসছে। যেন হাসিতে বাবা বলছে ‘তোমরা এমন করছো কেন? আমিতো ভালই আছি’।
মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রার্থনা, আমাদের বাবা যেন তাঁর কাছে সত্যিই ভাল থাকে, শান্তিতে থাকে।

লেখক : প্রফেসর, রসায়ন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Share
  • 5
    Shares