সেকান্দর আলম বাবর, বোয়ালখালী

৭১এর ১৩ মে এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় পাঞ্জাবিরা হানা দেয় বোয়ালখালীর পোপাদিয়ায় ষষ্ঠীচরণ চৌধুরীর বাড়িতে। পাঞ্জাবিদের আসার খবরে ওই এলাকার সনাতন ধর্মালম্বীরা পার্শ্ববর্তী মুসলিম এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। কিছু বৃদ্ধ নর-নারী এলাকায় থাকলেও যুবক-যুবতীর মধ্যে অদম্য সাহসে নিজ ঘরের মধ্যে বিধবা মাকে নিয়ে রয়ে যান উচ্চ শিক্ষিত, প্রতিবাদী, দেশপ্রেমিক যুবতী ‘রমা চৌধুরী’। সেসময় তাঁর স্বামী ছিল ভারতে, তিন শিশু সন্তান আর বিধবা মায়ের জীবনের মায়া তাঁকে এতটুকু টলাতে পারেনি। যথারীতি পাঞ্জাবিরা আসল, যুবতী নারীর প্রতি তাদের লিপ্সা পূরণ করতে এতটুকু সময় নিল না। সর্বস্ব হারালেন এ সাহসী। এতেও ক্ষান্ত হয়নি হায়েনারা, যাওয়ার সময় তাঁর ঘরটিও জ্বালিয়ে দেয়।
একাত্তরে ঘর ছেড়ে না যাওয়া প্রসঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শী ইউপি সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন ভদ জানান, ‘রমাদি’র এমন সাহসে আমরাও হতবাক। পাঞ্জাবিরা পোপাদিয়ায় আসার খবরে আমি, ইছহাক চৌধুরী, এস এম ফরিদসহ কয়েকজন মিলে প্রতিরোধের চেষ্টা করি। কিন্তু তাদের সংখ্যা ও অস্ত্রসস্ত্রের কাছে পিছু হটি। তারা ওই সময় প্রশান্ত সেন গুপ্তের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়, স্থানীয় ঋতু আচার্য্যের স্ত্রীকে ধর্ষণ করে। এক বিহারীর নির্যাতন আর ধর্ষণের শিকার হন রমাদিও। চাইলে তিনি পালিয়ে যেতে পারতেন। পাঞ্জাবিরা এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নির্যাতন আর নিজের সর্বস্ব হারানো রমাদি’কে উদ্ধার করি। তাঁকে বলতে শুনেছি, সবাই পালিয়ে গেলে পাকিস্তানি নরপশুদের রুঁখবে কে? কাউকে না কাউকে তো প্রতিরোধ করতে হবে। আমি আমার স্থান থেকে না হয় প্রতিবাদটা করলাম।’
সরেজমিনে দেখা যায়, এখনও জরাজীর্ণ ঘরে সেই পোড়া চিহ্ন নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে ঘরটি। স্বাধীনতা পরবর্তী তিনি এর নাম দেন ‘দয়ার কুঠির’। তিনি মুছতে দেননি পোড়া কাঠের সেই স্মৃতিচিহ্ন। বর্তমানে ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ছে, চারদিকের বেড়া খসে পড়ছে। কোনোরকমে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টায় ঘরটি জরাজীর্ণভাবে টিকে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই এ ঘর থেকে চির বিদায় নিলেন। রেখে গেছেন তাঁর আর্থিক অনটনে ধুঁকে ধুঁকে জীবন শেষ করা জীবিত একমাত্র পুত্র সন্তান জওহরকে। মুক্তিযুদ্ধে এমন সাহসের সরকারি স্বীকৃতিটুকুও নেননি এ বীরঙ্গণা। খোদ ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেও চাননি এ স্বীকৃতি। বরং নিজ বাড়ি দিয়ে শুরু করে জেলায় জেলায় অন্ততঃ একটি করে হলেও অনাথ আশ্রম করার স্বপ্নের কথা বলে গেলেন তাঁকে। এমনই বাস্তবতায় এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে রমা চৌধুরীর ঘরটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে গড়ে তোলার। সাথে সাথে এখানে একটি কমপ্লেক্স করে তার জীবনের শেষ ইচ্ছে ‘দিপংকর অনাথালয়’ গড়ে তোলার।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আছিয়া খাতুন পূর্বকোণকে বলেন, বীরঙ্গনা রমা চৌধুরীর পোড়া ঘরটিকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। ওখানে কি পরিমাণ জমি আছে তাদের তা দেখতে ইউপি চেয়ারম্যনকে বলা হয়েছে। এখানে তাঁর শেষ ইচ্ছে অনাথালয় করার ব্যাপারে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব।

Share