মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

নবজাতককে কোলে নিয়ে জীবনের দুঃখকষ্ট ভুলে আনন্দে মেয়ে ওঠেন বাঙালি মেয়েরা। মানবজাতির মতো এমন অপূর্ব মিল দেখা যায় প্রাণীকূলের মধ্যেও। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার দম্পতির ঘরে আসা শাবক (বাঘের বাচ্চা) দুটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে বাঘিনী (পরি) বাচ্চা দুটিকে যক্ষের ধনের মতো জড়িয়ে রেখে যতœ-আত্তি করে চলেছে মা বাঘ।
গত ১৯ জুলাই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার দম্পতির (রাজ পরি) ঘরে এই শাবক দুটির জন্ম হয়। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসাইন শুভ জানান, সাদার মধ্যে ডোরা কাটা বাঘ বিরল। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জন্ম নেওয়া সাদা বাঘটি হচ্ছে দেশে প্রথম সাদা বাঘ।
শুধু বাঘবাঘিনী নয়, গত কয়েক বছরে নান্দনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। পরতে পরতে উন্নয়ন আর নতুনত্বে ছোঁয়া। দর্শনার্থীদের জন্য নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে।
চট্টগ্রামের অন্যতম এই বিনোদনকেন্দ্রে ঢুকতেই এখন মুগ্ধতায়ভরা। বিশাল এলাকাজুড়ে চলছে এভিয়ারি পার্ক নির্মাণের কাজ। এছাড়াও পশুপাখির সঙ্গে নতুন যুক্ত হচ্ছে রেড ক্যাঙ্গারু, উটপাখি, ইমু মরুভূমির উট। নভেম্বরের মধ্যে তা যুক্ত হচ্ছে। এজন্য এক কোটি টাকা খরচের বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ রুহুল আমীন বলেন, গত বছরে চিড়িয়াখানায় প্রায় কোটি টাকার উন্নয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে অবকাঠামানো উন্নয়ন, প্রধান গেটরাস্তাঘাট নির্মাণ এবং নতুন নতুন পাখপাখালি যুক্ত করা হয়েছে।
১৯৮৯ সালে পাহাড়বেষ্টিত মনোরম পরিবেশে চিড়িয়াখানার যাত্রা শুরু হয়। পাহাড়ের নান্দনিকতা অক্ষুণœ রেখে পরতে পরতে নতুনত্ব আনা হয়েছে। গত বছর পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দুই হাজার ফলদবনজ চারা রোপণ করা হয়েছে। এই চারা গাছগুলো পাহাড়ের সবুজাভ প্রকৃতিকে মায়াময় করে তুলেছে।
চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের আনন্দ উপভোগের জন্য ৫৩ প্রজাতির ২৮৪টি পশুপাখি রয়েছে। এর মধ্যে অনেক বিরল প্রজাতির পাখিও রয়েছে। এসব পশুপাখিকে ওয়েবসাইটের আওতায় আনা হয়েছে। এখন এক ক্লিকেই সব পশুপাখির আদ্যোপান্ত জানা যাবে। পুরো চিড়িয়াখানা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। ডিসি অফিস, সদস্য সচিব কিউরেটরের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পুরো চিড়িয়াখানা মনিটরিং করছেন।
শিশুদের জন্য প্রথমবারের মতো আলাদা করে কিডস জোন নির্মাণ করা হয়েছে। শিশুদের খেলাধুলার জন্য কয়েকটি দোলনা, নাগরদোলা বসানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের হাঁটা, বিশ্রামের জন্য বেঞ্চ সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। পুরো এলাকা আরসিসি ঢালাই করা হয়েছে। তাতে শোভা পাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ রঙবেঙয়ের আলপনা। তিন বছর আগে অরক্ষিত চিড়িয়াখানাকে পশ্চিম দক্ষিণ পাশে দেয়াল নির্মাণ করে সুরক্ষা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের আগে কোনো দেয়াল ছিল না। অরক্ষিত ছিল। কুকুরের উপদ্রব আর বখাটেদের উৎপাত ছিল। ছিল ময়লাআবর্জনার ভাগাড়। এখন সুরক্ষা করা হয়েছে। হাঁটার পথে কিছুদূর পর পর নির্মাণ করা হয়েছে বাঘসিংহসহ বিভিন্ন প্রাণীর ভাস্কর্য।
গত দুই বছরে চিড়িয়াখানায় যুক্ত হয়েছে বাঘ, জেব্রা, সিংহী। পশু হাসপাতালটিকেও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এসব প্রাণী যুক্ত হওয়ার পর দর্শনার্থীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সরকারি কোনো অনুদান ছাড়া একমাত্র চিড়িয়াখানার আয় দিয়েই সব ধরনের উন্নয়ন কাজ সাধিত হয়ে আসছে।
চিড়িয়াখানার প্রবেশমূল্য এক টাকা দিয়ে শুরু হয়েছিল। বর্তমানে প্রবেশমূল্য রাখা হয়েছে ৫০ টাকা। টিকেট বিক্রি বাবদ প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার টাকা আয় হয়। তবে শুক্র শনিবার দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় হয় বলে জানান চিড়িয়াখানা ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল আমীন।
রুহুল আমীন আরও বলেন, চিড়িয়াখানার টিকেট বিক্রির টাকাসহ নিজস্ব তহবিল দিয়ে নতুন রূপে দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য অন্যন্য রূপে সাজানো হচ্ছে। উন্নত দেশের বিনোদন কেন্দ্রগুলোর আদলেই আলাদাভাবে চিড়িয়াখানাকে সাজানো হচ্ছে।
বিভিন্ন দেশ থেকে জেব্রা, বাঘসহ নানা প্রাণী পাখি আনার পর সবকটি খাঁচা অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিদেশ থেকে আরও কিছু প্রাণী যুক্ত হচ্ছে চিড়িয়াখানার পশুপাখির বহরে। প্রাণিকূলের সংখ্যা বাড়ানোর পর থেকে দর্শনার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে।
চিড়িয়াখানা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, চিড়িয়াখানায় বর্তমানে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্ন জাতের প্রাণী রয়েছে। সাধারণ দর্শকের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। তিনি বলেন, এক সময় চিড়িয়াখানার ভিতরে যেতে ভয় পেতো। এখন অনেক উন্নয়ন কাজ হয়েছে। সুরক্ষা করা হয়েছে। এখন আর কোনো ভয় নেই।
আগ্রাবাদ থেকে আসা মোহাম্মদ কামরুল হাবিব বাঘের বাচ্চা প্রসবের বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশ তো অনেক উন্নত হয়েছে। চিড়িয়াখানার পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, চিড়িয়াখানার অবকাঠামোগত অনেক পরিবর্তন হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন নবরূপে সাজানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের মন ভরাচ্ছে।
চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ বলেন, দৃষ্টিনন্দনভাবে চিড়িয়াখানাকে সাজানোর পাশাপাশি নতুন প্রাণী যুক্ত করা হচ্ছে। সবকিছু মিলে নতুনভাবে সাজছে চিড়িয়াখানা

Share
  • 36
    Shares