নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » অনির্বান জ্বালানী ও বিদ্যুতের জন্য চাই পরিকল্পিত উদ্যোগ

অনির্বান জ্বালানী ও বিদ্যুতের জন্য চাই পরিকল্পিত উদ্যোগ

‘অনির্বাণ আগামী’ শ্লোগানকে সামনে রেখে সারাদেশে পালিত হলো জাতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সপ্তাহ-২০১৮। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের সার্বিক সাফল্য জনগণের কাছে তুলে ধরাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। জনগণকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে প্রতি বছর জাতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সপ্তাহের আয়োজন করা হয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। সে বিবেচনায় বর্তমান সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎউৎপাদন বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেয়। সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে এখন বিদ্যুৎসংকট অনেকটাই কেটে গেছে। বিদ্যুৎউৎপাদনক্ষমতা এখন বিশ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। যদিও এখনও দেশ পুরোপুরি লোডশেডিং মুক্ত হয়নি, তবে দেশের ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎসুবিধার আওতায় এসেছে। আগামি কয়েক বছরের মধ্যে শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎসুবিধার আওতায় আনার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এটি আমাদের জন্যে আশা জাগানিয়া সুসংবাদ, সন্দেহ নেই।
বিদ্যুৎ এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুতের ব্যবহার জীবনের অনুষঙ্গ বলে বিবেচিত হচ্ছে, বিবেচিত হচ্ছে উন্নয়ন-সমৃদ্ধির চাবিকাঠি হিসেবেও। কল-কারখানায় উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। যার কারণে দেশকে দ্রুত সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বিদ্যুৎখাতের উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় শুরু থেকেই। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিদ্যুৎঘাটতি পূরণে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদ্যুৎউৎপাদন শুরু করে। এতে উৎপাদনখরচ একটু বেশি হলেও সময়ের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রেখেছে। নিয়েছে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন পরিকল্পনা। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত প্রায় সাড়ে ৯ বছর সরকারি ও বেসরকারি খাতে ৯৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১৩,৮১১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ১৪,১৩৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৫৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। নানামুখী পদক্ষেপের কারণে বিদ্যুৎউৎপাদনে নবযুগের সূচনা হয়েছে। দেশস্বার্থে তা অব্যাহত রাখতে হবে। জানা গেছে, আগামী ২০২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎউৎপাদন বাড়িয়ে ২৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট করার মহাপরিকল্পনা আছে সরকারের। সময়ের চাহিদার আলোকে সরকারের এ ধরনের পরিকল্পনা সাধুবাদযোগ্য।
তবে কাক্সিক্ষত ফল পেতে দুর্নীতি প্রতিরোধসহ আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদ্যুৎচুরি বন্ধের লক্ষ্যে সারাদেশে প্রি-পেইড মিটার চালুর পাশাপাশি বস্তিএলাকাসহ বিভিন্ন বাসা-বাড়ি, কারখানা, দোকান ও নানা স্থাপনায় অবৈধ সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। নিতে হবে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের কৌশলী উদ্যোগ। প্রয়োজনে কম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে রেশনিং ব্যবস্থা করে হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। সরকারি প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও উৎসাহিত করতে হবে। বেসরকারি খাত যাতে তাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহকপ্রতিষ্ঠানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে সে জন্যে জাতীয় গ্রিডকে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত। সে লক্ষ্যে নীতিমালা সংশোধন এবং প্রয়োজন হলে বেসরকারি ট্রান্সমিশন লাইন (সঞ্চালন লাইন) তৈরির অনুমতি প্রদান করা উচিত। একই সঙ্গে বিদ্যুৎখাতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্যে যৌক্তিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও থাকা উচিত। গ্রাহকপ্রান্তে বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ও অধিক দক্ষ বৈদ্যুতিকযন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করে বিদ্যুতের চাহিদা মোকাবিলা করতে হবে। পুরানো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদনে পরিপূর্ণ সক্ষম করে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের জনগণের আর্থিক সক্ষমতার পরিধি বিবেচনায় স্বল্প খরচে বিদ্যুৎউৎপাদনের ক্ষেত্র সন্ধান করতে হবে। সমুদ্র উপকূলের বায়ুপ্রবাহ এমনকি চলমান যান ও মেশিনসহ নানা উৎসকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো যায়। সরকারি-বেসরকারি নানা স্থাপনা এবং রিমোট এরিয়ায় নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিতে হবে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারকে সহজলভ্য করা ও এ বিষয়ে জনদৃষ্টি আকর্ষণে নানামুখি কর্মসূচি থাকা উচিত।

Share