নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » বিশ্বমানের নগরী কি চট্টগ্রাম হতে পারবে?

বিশ্বমানের নগরী কি চট্টগ্রাম হতে পারবে?

চট্টগ্রাম আজও বড়োই সঙ্কটে আছে। একে মহানগরী বলা হয় বটে। কিন্তু চরিত্রগত ও প্রকৃতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যস্ত-ব্যতিব্যস্ত শহরটিকে মোটেই মহানগরীর স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। বিশ্বমানের নগরী হয়ে-ওঠা তো এখনও দূর অস্ত! এই অভিধা চট্টগ্রামকে অর্জন করতে হলে আরো বহু পথ যেতে হবে। আয়ত্ত্বের মধ্যে আনতে হবে অনেক অনেক ধরনের পরিবর্তনকে। বর্তমানে উপযুক্ত দীর্ঘ মেয়াদী ও স্বল্প মেয়াদী উদ্যোগ ও পরিকল্পনা ব্যতিরেকে যে উন্নয়নের ধারা গদাই লস্করী চালে চলছে Ñ তা আামদের ভিশন-২০৪১ এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় না।
আমাদের এই পর্যবেক্ষণের মূলকথা হলো, চট্টগ্রামকে প্রকৃতই একটি বিশ্বমানের নগরীতে রূপান্তরিত করতে হলে উন্নয়ন প্রকৃতির আরও গভীরে যেতে হবে। প্রয়োজন আছে এতে বহুমুখী ধারার সংযোজন। এক্ষেত্রে সবচাইতে বড়ো যে বিষয়টি দরকার তা হলো, সুদূরপ্রসারী ভাবনাকে যুক্ত করে আমাদের পরিকল্পনা কমিশন এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে বাস্তবায়নে প্রভাবিত করতে সক্ষম এমন একটি সম্মিলিত শক্তির অস্তিত্ব তৈরির উদ্যোগের কথা আমাদের সকলকে ভাবতে হবে। আক্ষরিত অর্থে বলতে হলে উল্লেখ করা যায় যে, বিশ্বমানের ভবিষ্যতের চট্টগ্রাম গড়তে রাজধানী ঢাকায় সিদ্ধান্তগ্রহণকারী কেন্দ্রগুলোতে এখানকার প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহকে বারবার সামনে নিয়ে আসতে পারার মতো পলিসি লবিং গ্রুপের জন্ম দেওয়া দরকার।
সম্প্রতি দৈনিক পূর্বকোণ আয়োজিত ‘বিশ্বমানের নগরী : আমাদের করণীয়’ শীর্ষক একটি গোলটেবিলের আলোচনায় বিভিন্ন বক্তাদের অভিমত পর্যালোচনা করে আমাদের ভাবনায় এই সারবস্তুটুকু অনুভূত হয়েছে। বর্তমান সরকার অবশ্য চট্টগ্রামের জনগণের চাহিদা ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নানাক্ষেত্রে উন্নয়ন ও পরিবর্তন আনার উপর বিশেষ পদক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞবৃন্দ তাঁদের মূল্যবান অভিজ্ঞতার যে চিত্র প্রকাশ করেছেন তা বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। তাঁদের মতে, নগরীতে দৃশ্যমান উন্নয়ন যেমন হচ্ছে, তেমনই দৃশ্যমান দুর্ভোগও ব্যাপকভাবে সৃষ্টি করে চলেছে। আশাবাদ ব্যক্ত করে বক্তারা বলেছেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটলে এই দুর্ভোগ-ভোগান্তি অবশ্য হ্রাস করা সম্ভব। বিক্ষিপ্ত উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রতি তোয়্াক্কা না করায় ক্রমশ এই মহানগরী বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলতে চলেছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিভিন্ন সরকারের আমল থেকে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ শিরোপা চট্টগ্রামকে দেওয়া হলেও এতে বাস্তব সারবত্তা কখনো ছিলো না। সে সুযোগও এখানে সংযোজিত হয় নি। ফলে, সেই বহুযুগ আগেকার সৌন্দর্যের চট্টগ্রামের ‘প্রাচ্যের রানী’র রূপ-যৌবন এখন আর নেই। এতে অকাল-বার্ধক্যের জরা এসে চারদিক ছেয়ে গেছে ক্রমাগত বঞ্চনা ও অবহেলায়। সেকালের প্রাচ্যের রাণী এখন যেনো ক্রমাগত সেবার যোগান দিয়ে চলা জীর্ণ-শীর্ণ চাকরানী।
গোল টেবিল বৈঠকে সঞ্চালনায় ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচক ছিলেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ, সাদার্ন ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আলী আশরাফ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়–য়া, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি ফারুক আহমেদ ও বিশিষ্ট ক্রীড়া ভাষ্যকার নিখিল রঞ্জন দাশ।
প্রকৃতই যদি বিশ্বমানের মহানগরী রূপে চট্টগ্রামকে আমরা দেখতে চাই, তাহলে প্রথমেই আমাদের উন্নয়ন চাহিদাকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তার বাস্তবায়নে অনাগতকালের প্রয়োজনীয়তাকেও গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হতে হবে। অতীতের বেআইনী নগরায়নের জটিলতাকে নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখে প্রয়োজন অনুসারে পরিবর্তনের কঠোর ও নির্মম পদক্ষেপও নিতে হতে পারে আমাদের। অতীতের নিউইয়র্ক শহরের ইতিহাসকে পাঠ করলে আমরা এমন পদক্ষেপের বিষয়টি জানতে পারবো। পরিবর্তনের সেই দৃঢ়তার প্রয়োগের ফলেই আজ নিউইয়র্ক বিশ্বমানের নগরীর উদাহরণ হতে পেরেছে। বিশ্বে অন্যান্য উন্নত দেশের মহানগরীর ক্ষেত্রে এই ধরনের উদ্যোগ রয়েছে। আমরা কি পারবো সেই কঠিন-কঠোর-নির্মম সিদ্ধান্ত নেবার মতো সাহসী হতে?

Share