নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » ইম্পিরিয়ালিজম ইন এশিয়া

ইম্পিরিয়ালিজম ইন এশিয়া

১৯২৮ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত যে লিওনার্ড উলফের আলোচিত গ্রন্থ ‘ইম্পিরিয়ালিজম অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’। উলফ যখন এই বইটি লিখেছেন ভারতে তখন ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদ ক্ষমতাসীন। বইটি লিখার পর প্রায় এক শতাব্দী পার হয়ে গেছে তারপরও এই বইটির আবেদন আগের মতো রয়ে গেছে। ভারতে সা¤্রাজ্যবাদের পতনের ধ্বনি উলফ আগেই শুনতে পেরেছিলেন। বইটি মোট ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত। আর এর তৃতীয় অধ্যায় হলো ইম্পিরিয়ালিজম ইন এশিয়া’। বা এশিয়ায় সা¤্রাজ্যবাদ। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে সা¤্রাজ্যবাদের কারণ ছিল পশ্চিম ইউরোপে একটা নতুন ধরনের সভ্যতার বিকাশ। এই নতুন সভ্যতাটি ইউরোপের বাইরের জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে গোড়ার ব্যাপারটা ছিল অর্থনৈতিক। যোগাযোগের নতুন ব্যবস্থা এবং যানবাহন ব্যবহারের মাধ্যমে এই দেশগলো ইউরোপের নতুন শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে সেসব দেশের কাছে উন্মোচিত হতে চাচ্ছিল দেশগুলোকে তারা অপরাপর মহাদেশের অনুন্নত দেশ হিসেবে আখ্যা দিত। এশিয়ার বিকাশের পথে অদ্ভুত কিছু প্রতিকূলতা ছিল। আফ্রিকান, মাউরি বা আমেরিকান ইন্ডিয়ানরা যেমন তাদের অঞ্চলের আদিবাসী, এশিয়ার বড় একটা অংশে ঠিক সেই অর্থে আদিবাসী জনগোষ্ঠী বাস করে না। ভারত, পারস্য, চীন জাপানে প্রাচীন সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল এবং তা সেখানে তাদের নিজস্ব, বিস্তৃত, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ধারা তৈরি করেছিল। ইউরোপের শিল্পোন্নত, বাণিজ্যিক, শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক সভ্যতা বহুলাংশে এশিয়ার এই সভ্যতাগুলোর উৎকর্ষের বিরুদ্ধে ছিল। ইউরোপের ব্যবসায়ী একজন চীনাকে নীচু শ্রেণির এবং বিলুপ্তপ্রায় সভ্যতার অ ধিকারী মনে করলে, ওই চীনাও তেমনি ইউরোপীয়কে অসভ্য মনে করতো । সে বাঁচতে চাইতে যেভাবে তার পিতা তার বেঁচে ছিল। সে তার উদ্ভুত উপায়ে বেচা বিক্রি করতে চাইতো, যন্ত্রপাতি, রাইফেল, রেলওয়ে, স্টিমারে তার আগ্রহ ছিল না। এশিয় জনগণের বেশির ভাগই তখন বিভিন্ন জাতিরাষ্ট্রে সংগঠিত, নিজেদের সভ্যতা নিয়ে গর্ব ছিল তাদের, সম্পূর্ণ নতুন অর্থ ব্যবস্থা, তার প্রতিষ্ঠান এবং একটা বহিরাগত সভ্যতা গ্রহণের জন্য এমন জনগোষ্ঠীকে জোড় করাটা কোনো সহজ কাজ ছিল না। এক্ষেত্রে ভারতের কথা সর্বাগ্রে আসে কারণ এশীয়দের মধ্যে কেবল ভারতীয়রাই দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপীয়দের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত ছিল। উনিশ শতকের সা¤্রাজ্যবাদ বিকাশের আগেই যেখানে কিছুটা ইউরোপীয় কর্তৃত্ব ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং ইউরোপীয় দেশের বণিক দেশগুলোর ভেতরে আঠারো শতকজুড়ে ভারতে বাণিজ্য এবং ভারতীয় সম্পদের একচেটিয়া বাজার ধরে রাখার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল। এই যুদ্ধে প্রধান ছিল ফ্রান্স, হল্যান্ড, গ্রেট বৃটেন ও পতুর্গাল এবং তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় ভারতে এবং শ্রীলংকায় তাদের অবস্থান ধরে রেখেছিল। আঠারো শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউরোপীয় বণিক এবং ভারতে তাদের শাসক সরকারের মধ্যে সম্পর্কটা কোনোভাবেই সা¤্রাজ্যবাদী ছিল না এটা লক্ষ্য করা জরুরি। এশীয় অঞ্চল এবং এশীয় শাসকরা ইউরোপীয় অঞ্চল এবং ইউরোপীয় শাসকদের মতোই ব্যবহার পেতো। গ্রেট বৃটেন ইউরোপীয় রাজা এবং স¤্রাটদের সাথে যেভাবে চুক্তি করতো ভারতীয় শাসকদের সাথেও সেভাবেই করতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং অন্য ব্যবসায়ীরা ভারতীয় শাসকের অনুমোদনসহকারে এবং ভারতীয় রাজনীতি অনুসারে তাদের কাজ করতো। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যে, আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা এবং এশিয়ায় সা¤্রাজ্যবাদের জন্মের পূর্বে দুই বা তারও বেশি শতক ধরে ইউরোপীয় এবং ভারতীয় শাসক এবং জনগণের মধ্যে ক্রমাগত যোগাযোগ হতো এবং সেখানে জাতিগত কোনো সংঘাত দেখা যেতো না। ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীরাই মূলত সেখানে জাতিগত বিবাদের জন্ম দিয়েছে এবং সেটাকে রক্ষা করেছে, ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে ভারতে ও বাকি এশিয়ায় চলমান জাতিগত বিবাদ আজ সেই স্থান দখল করেছে। কিন্তু আঠারো শতকে ভারতে একচেটিয়া বাণিজ্যের ব্যাপারে ইউরোপীয়দের নিজেদের ভেতরে যেভাব প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছিল এবং এর সঙ্গে শিল্প বিপ্লবের প্রথম প্রভাব যেরকম অনুভূত হয়েছিল। এ বিষয়গুলো ইউরোপীয়দের সঙ্গে ভারতীয়দের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। আঠারো শতকের শেষার্ধের ইউরোপীয় যুদ্ধে এশিয়ায় ফ্রান্স, গ্রেট বৃটেন, হল্যান্ড এবং পতুর্গাল স্বেচ্ছায় একে অন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ব্রিটেনের শত্রুদের বিরুদ্ধে একটা আধাসামরিক যন্ত্রে পরিণত হওয়া এবং প্রায়ই সাধারণ সেনা এবং নৌবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করাটা স্বাভাবিক ছিল। এই ক্ষুদ্র পদক্ষেপ থেকে শুরু হয় কোম্পানী দ্বারা ভারতীয়দের দমনপীড়ন; অঞ্চল দখল এবং সার্বভৌমত্ব দখল, বস্তুত এটা ছিল পুরো ভারতের জয়ের সূচনা। ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংসের অধীনে আসলে এটাই ঘটতে শুরু করে। এভাবে এটি এমন অবস্থায় এসে দাঁড়ায় যে, শতাব্দীর মাঝামাঝিতে ইউরোপীয় সা¤্রাজ্যবাদের প্রভাব যখন প্রকৃতই এশিয়ায় প্রবেশ করতে শুরু করলো। এশিয়ায় ভারতই তখন একমাত্র পরাধীন অঞ্চল। ভারত তখন নিরাপদভাবে দখল করা ব্রিটেনের সা¤্রাজ্যবাদের একটি অংশ। এ কারণেই সা¤্রাজ্যবাদের সময়ে ভারতের ইতিহাস বাকি এশিয়া থেকে ভিন্ন। এই ইতিহাস সা¤্রাজ্যবাদ বিষয়ক শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই আগ্রহের জায়গা, কারণ এটি সা¤্রাজ্যবাদের অধিক সুবিধা অসুবিধা এবং চূড়ান্ত অসম্ভাব্যতাকেও দেখায়। ভারত সরকার ছিল ইংরেজ সরকার দ্বারা চালিত। এশীয়দের ওপর চরমভাবে আরোপিত একটা বিদেশি ইউরোপীয় সরকার। এই সরকার অপরিহার্য ভাবেই ইউরোপীয় মতাবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। এ সম্পর্কে ভালো কিছু বলতে গেলে বলতে হয় এটা একটা দক্ষ সরকার ছিল, কিন্তু তবে ভারতীয় সভ্যতার নয়। এটি ছিল একটা পশ্চিমামানের সরকার। এর মূল প্রচেষ্টা ছিল বস্তুগত উন্নতির দিকে এবং এক্ষেত্রে সরকারেরও অর্জনও ছিল বেশ। সরকার রাস্তা, সেতু, রেলপথ নির্মাণ সেচকাজ করেছিল এবং ভারতের বিভিন্ন জাতিধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তি বজায় রেখেছিল। ভারতে ইংরেজি-আইন, তাদের ন্যায়ের ধারণা এবং ইংরেজি শিক্ষানীতির সূচনা করেছিল। ভারতীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক শোষণকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে এটি সবকিছু করেছিল। বিশেষত যেখানে শোষণ চালালে ব্রিটিশ শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য সুবিধা হয়।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, মানবাধিকারকর্মী।

Share