সৌমিত্র চক্রবর্তী হ সীতাকু

সীতাকু-ে ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুঝুঁকি জেনেও ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করছে না অন্তত ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্ধলক্ষ শিক্ষার্থী ও হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। ফুট ওভারব্রিজ কাছে থাকলেও দু-এক মিনিট সময় বাঁচাতে তারা ব্রিজের ওপর দিয়ে না গিয়ে চলন্ত বাস-ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের সামনে দিয়েই দৌড়ে পার হচ্ছে। ফলে ওভারব্রিজ থাকলেও দুর্ঘটনা থামছে না। অন্যদিকে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৮টি ফুটওভার ব্রিজ একপ্রকার অকেজো পড়ে থাকছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীতাকু- উপজেলাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি খুবই ব্যস্ত একটি সড়ক। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সাথে সারাদেশের যোগাযোগের সংযোগস্থল হওয়ায় প্রতিদিন এ পথে গড়ে ২০ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন রকম যানবাহন চলাচল করে। কয়েক বছর আগে ব্যস্ত মহাসড়কটি চারলেনে রূপান্তরিত হওয়ার পর এখানে চলাচলকারী গাড়িগুলোর গতিও বেড়ে গেছে অনেক। এতে দূরের যাত্রীরা উপকৃত হলেও ঝুঁকি বেড়েছে এ উপজেলার মহাসড়ক সংলগ্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার অর্ধলক্ষ শিক্ষার্থী ও সড়কের আশেপাশে গড়ে উঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্মচারীসহ সাধারণ মানুষের। কারণ, এ সড়কে এত বেশি যানবাহন চলাচল করে যে যা এড়িয়ে পারাপার খুবই কঠিন। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এ অকাল মৃত্যুর তালিকায় স্কুলশিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা বেশি হলেও ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী, কৃষক, শ্রমিকসহ অন্যদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।
ফলে সচেতন অবিভাবকরা উদ্বিগ্ন। বিগত দিনে সড়ক নিরাপদ করার জন্য আন্দোলন করেছে এ এলাকার শিক্ষার্থীরাও। আর এসবের সম্মিলিত চেষ্টার ফলে সড়ক ও জনপদ বিভাগ উপজেলায় ৭টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুটওভারব্রিজ স্থাপন করেছে। পর্যায়ক্রমে আরো স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এছাড়া একটি বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান একটি বালিকা স্কুল এন্ড কলেজের সামনে নিজ অর্থায়নে একটি ওভারব্রিজ নির্মাণ করে দিলে উপজেলায় বর্তমানে ফুট ওভারব্রিজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮টিতে। এদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এলাকার নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন জনের দাবির প্রেক্ষিতে মহাসড়কে মৃত্যু ঠেকিয়ে নিরাপদে পারাপারের জন্য ৮টি ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হলেও এগুলো চালু হওয়ার পর দেখা যায়, শিক্ষার্থীসহ বেশিরভাগ মানুষই এগুলো ব্যবহার না করে দুয়েক মিনিট সময় বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পার হচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, এখানে গড়ে নির্মাণ করা ফুটওভার ব্রিজগুলো রয়েছে যথাক্রমে উপজেলার ভাটিয়ারী বিজয় স্মরণী কলেজ ও হাজী টিএসসি উচ্চ বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে, মাদামবিবিরহাট বাজারে, বারআউলিয়া হাফিজ জুট মিলস উচ্চ বিদ্যালয় ও সবুজ শিক্ষায়তন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে, ঘোড়ামরা ফকিরহাট এলাকায়, কুমিরা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের সামনে, বাড়বকু- উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে, উপজেলা গেটের সামনে এবং বড়দারোগারহাট বাজারে।
পরিদর্শনকালে দেখা যায়, যেখানে ফুটওভার ব্রিজগুলো স্থাপন করা হয়েছে সেখানেই রয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে এগুলোতে নিয়মিত সাধারণ মানুষ পারাপার হবার কথা। কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। সামনে ফুটওভারব্রিজ

থাকলেও হাতে-গোণা কয়েকজন শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এসব ব্যবহার করছে। আর বেশিরভাগ মানুষই ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পারাপার হচ্ছে। ফুটওভারব্রিজ থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পারাপারের বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটিয়ারী বিজয় স্মরণী ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ অজুহাত দেখিয়ে বলেন, লক্ষ করে দেখুন ফুটওভারব্রিজটি আমাদের কলেজ গেট থেকে কয়েকশ হাত উত্তরে। সেখানে পৌঁছানোর আগেই আমরা কলেজের সামনে দিয়ে মহাসড়ক পার হয়ে যাচ্ছি। এভাবে যেকোন সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তাকে সতর্ক করার চেষ্টা করলে ফয়সাল বলেন, আমি গাড়ি দেখে-শুনেই পার হই, কিছু হবে না। ভাটিয়ারী হাজী টিএসসি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্রী শান্তা ও ৭ম শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়ার বক্তব্যও প্রায় একই। তারা বলেন, স্কুল থেকে কিছুটা হেঁটে গিয়ে আবার ব্রিজে উঠতে মন চায় না। তাই এভাবে পার হচ্ছি। এভাবে পার হওয়ায় ঝুঁকি আছে স্বীকার করলেও তারা দেখেশুনে পার হন বলে জানান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটিয়ারী হাজী টিএসসি উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলাহাজ নাজিম উদ্দিন বলেন, বিষয়টি আমরাও লক্ষ করেছি। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ে আলাপ-আলোচনাও হয়েছে। অতি শীঘ্রই সেখানে একজন লোক নিয়োগ করব। তিনি শিক্ষার্থীদের স্কুল শুরুর আগে ও ছুটিশেষে ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করাবেন।
এদিকে, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সচেতন আছে বলে অজুহাত দেখালেও সীতাকু- হাইওয়ে পুলিশ ও এলাকাবাসীর মতে এখানে অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটছে ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পারাপার হতে গিয়ে। গত একবছরে এখানে গাড়িচাপা পড়ে মারা গেছে অন্তত ৮০ জন। এর মধ্যে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও রয়েছে। বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার ওসি মো. আহসান হাবীব বলেন, এখানে অধিকাংশ মানুষই গাড়িচাপা পড়ে মারা যায়। শিক্ষার্থীদের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারের বিষয় নিয়ে আমি ভাটিয়ারী স্কুল ও মাদামবিবিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে মিটিংও করেছি। এরপর দুয়েকদিন ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার হয়, তারপর আবার আগের অবস্থা। তিনি বলেন, একমাত্র মধ্যখানের ডিভাইডার যদি বন্ধ করা যায় তাহলে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে বাধ্য হবে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মামুন বলেন, সীতাকু-ের বেশিরভাগ স্কুল-কলেজই মহাসড়কের পাশে। উপজেলায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২৯টি। এর মধ্যে ২০টির মত মহাসড়কের পাশে। এছাড়া আরো অনেক কলেজ, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা আছে মহাসড়কের পাশে। এ কারণে অনেক স্কুলের সামনেই ফুটওভারব্রিজ করা হয়েছে। কিন্তু এটা সত্যি যে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পার হচ্ছে। এ কারণে দুর্ঘটনা বন্ধ হয় না। এ ব্যাপারে সবাই সচেতন না হলে দুর্ঘটনা ও অকাল মৃত্যু ঠেকানো যাবে না।

Share
  • 199
    Shares