এম. জাহেদ চৌধুরী চকরিয়া-পেকুয়া

ফেনী থেকে যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিল স্টারলাইন পরিবহনের একটি বাস (ঢাকামেট্রো১৫০৬৩৮) গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১ টার দিকে বাসটি চকরিয়া উপজেলার বরইতলী নতুন রাস্তার মাথা এলাকায় পৌঁছুলে বিপরীতমুখী লেগুনার (স্থানীয় নাম ম্যাজিক গাড়ি) সাথে ধাক্কা লাগে। ওই ধাক্কায় ম্যাজিক গাড়িটির একপাশ ভেঙ্গে যায়। ম্যাজিক গাড়িকে বাসটি দ্বিতীয় দফায় ধাক্কা দিলে সেটি দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলে হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যু হয় মামেয়ে, গাড়ির চালক ছাত্রসহ সাতজনের। আহত হয়েছেন আরো চার যাত্রী। নিহতরা হলেন : চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের লালব্রিজ পূর্ব বৃন্দাবনখিল এলাকার মঞ্জুর আলমের ছেলে মো. জহির আলম (৩২), হারবাং পাহাড়তলী এলাকার ছৈয়দ আলমের ছেলে মীর কাশেম (২৭), বরইতলী ইউনিয়নের উপরপাড়ার রুহুল কাদেরের ছেলে কক্সবাাজর পলিটেকনিক কলেজের হোটেল এন্ড টুরিজম বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শফিকুল কাদের তুষার (২২), লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি স্টেশন এলাকার আহমদ হোসেনের ছেলে লেগুনা চালক খায়ের আহমদ (৪০), চুনতি শাহ সাহেবের দরগাহ গেট এলাকার মোস্তাক আহমদের স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৫৫) এবং তার মেয়ে প্রবাসী আবুল হাশেমের স্ত্রী জায়তুন নাহার (৩০) এবং চুনতির পূর্ব সিকদার পাড়া এলাকার মৃত যতীন্দ্র মোহন সিকদারের স্ত্রী বাসন্তী সিকদার (৬৫) আহতদের স্থানীয় চট্টগ্রামের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী দোকানদার শামীম উদ্দিন বলেন, আমার চোখের সামনেই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। আমি দোকানে মালামাল বিক্রয় করছিলাম। এসময় কক্সবাজারের দিকে যাচ্ছিল যাত্রীবাহী বাস স্টারলাইন। গাড়িটি চলছিল বেপরোয়া গতিতে। চোখের পলকেই ওটি বিপরীত দিক থেকে আসা ম্যাজিক গাড়িকে দুদফা ধাক্কা দেয়। সময় সড়কে রক্ত ছিটকে পড়তে দেখি। সাথে সাথে দোকান থেকে বের হয়ে গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি নিথর পড়ে আছেন জন নারীপুরুষ। ওসময় ঘটনাস্থলে জড়ো হওয়া লোকজন কয়েকজনকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সকাল ১১ টায় দুর্ঘটনার পর চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লোকজনের ভিড়। সে ভিড়ের মাঝে কয়েকটি মরদেহ।
দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায় লেগুনায় চালকসহ যাত্রী ছিলেন ১১ জন। আহত হন চারজন। এলাকার কয়েকশ লোক ছাড়াও হতাহতের আত্মীয়রা পুলিশ ফাঁড়িতে জড়ো হন। তারা নিকটাত্মীয়দের মৃতদেহ দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সৃষ্টি হয় শোকাবহ পরিস্থিতির।
দুর্ঘটনায় পতিত গাড়ি দুটি জব্দ করে ফাঁড়িতে আনা হয়। ওই গাড়ির মধ্যে স্টারলাইন বাসের নম্বরটি হাতের লেখা ছিল আর লেগুনা বা ম্যাজিক গাড়ির কোন নম্বর প্লেটই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় লোকজন জানান, আজিজনগর থেকে বানিয়ারছড়া পর্যন্ত মহাসড়কটির ভালো হলোও সড়কটি আঁকাবাকা, উঁচুনিচু পাহাড় সমতল এলাকা দিয়ে গেছে। এই অংশের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড নেই। হাতেগোনা কয়েকটি থাকলেও তা সহজে নজরে পড়ে না। বাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে স্পিডব্রেকার বা জেব্রা ক্রসিং না থাকায় বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো হয়। এতে দুর্ঘটনা নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়ালেও স্থানীয় হাইওয়ে পুলিশ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিরিংগা হাইওয়ে পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনায় পতিত দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। ম্যাজিক গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে গেছে। গাড়ির চালকও মারা গেছেন। বাসের চালক হেলপার পালিয়ে গেছে। নিহতদের স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
যেভাবে দুর্ঘটনা : স্টার লাইন পরিবহনের বাস ফেনী চট্টগ্রাম থেকে যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিল। বাসটি কক্সবাজারের প্রবেশমুখ চকরিয়ার বরইতলী নুতন রাস্তার মাথা সংলগ্ন সেতু এলাকায় পৌঁছুলে বিপরীত দিক থেকে যাত্রী নিয়ে আসা ম্যাজিক গাড়িটির (লেগুনা) সামনে পড়ে। ওসময় ম্যাজিকটি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। দ্রুতগতির বাসটি ম্যাজিকের বাম পাশে ধাক্কা দিলে কাঁত হয়ে পড়ে ছোট গাড়িটি। ওইসময় দ্বিতীয় দফায় ম্যাজিককে ধাক্কা দেয় বাসটি। ফলে গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে যায়। হতাহত হন ১১ জন।
মেধাবী তুষারের অকালমৃত্যুতে মা বাবার স্বপ্নভঙ্গ : বরইতলীর বাসিন্দা ব্যবসায়ী রুহুল কাদেরের দ্বিতীয় সন্তান শফিকুল কাদের তুষার। মেধাবী এই ছাত্র তুষার এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন কক্সবাজার পলিটেকনিক কলেজে। ওই কলেজে হোটেল এন্ড টুরিজম বিষয়ে প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে দ্বিতীয় সেমিস্টারে উত্তীর্ণ হন। মাবাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পড়ালেখায় ফাঁকি দেননি কোনোসময়। দুদিন পূর্বে কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফেরেন তুষার। গতকাল মঙ্গলবার বরইতলীর বাড়ি থেকে বের হয়ে ম্যাজিক গাড়িতে উঠে হারবাংস্থ খালার বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। সেখান থেকে ফিরে কলেজে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা সকল পরিকল্পনা স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে রুহুল কাদেরের পরিবারের।
মাবোন হারিয়ে বিপর্যস্ত স্কুলছাত্রী তানজিনা : সড়ক দুর্ঘটনায় মা রোকেয়া বেগম বড় বোন জায়তুন নাহার মারা গেছেন শুনেই স্কুল থেকে চিরিংগা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে ছুটে আসে তানজিনা। মাবোনের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেই কয়েক দফা সংজ্ঞা হারায় তানজিনা। জ্ঞান ফিরতেই চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি করছিলো। আহাজারির ফাঁকে ফাঁকে আত্মীয়দের জড়িয়ে ধরে বলছিলো আমাকে এখন আদর করবে কে? পড়তে বলবে কে? স্কুলে যাওয়ার টাকা দেবে কে ? জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তানজিনা বলে, আমি আধুনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণীতে পড়ি। সকালে মা আমাকে স্কুলে যাওয়ার কোচিংয়ের টাকা দিয়ে চকরিয়া সদরে যান বড় বোনকে নিয়ে। সেখান থেকে ফেরার পথেই দুর্ঘটনার শিকার হন। আমি এলাকার লোকজন থেকে জেনেই স্কুল থেকে পুলিশ ফাঁড়িতে ছুটে আসি। মনে করেছিলাম মাবোন দুর্ঘটনায় আঘাত পেয়েছে। কিন্তু এখানে এসে দেখি আমার অতি আপনজন মা মেজ আপা আমাকে ফেলে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সময় কয়েকজন আত্মীয় তানজিনাকে সান্ত¦না দিতে গিয়ে তারাও কান্নায় ভেঙে পড়েন

Share
  • 108
    Shares