নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » মৃত্যুফাঁদ অরক্ষিত লেভেলক্রসিং

মৃত্যুফাঁদ অরক্ষিত লেভেলক্রসিং

চট্টগ্রামসহ সারাদেশে জালের মতো বিস্তৃত হয়ে আছে অসংখ্য অবৈধ ও অরক্ষিত লেভেলক্রসিং। এসব লেভেলক্রসিং যেন একেকটি ‘মৃত্যুফাঁদ’ হয়ে আছে। প্রায় প্রতিদিনই এসব লেভেলক্রসিংয়ে ছোট-বড় কোন না কোন দুর্ঘটনা ঘটছে। ফলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপারটি হচ্ছে, অবৈধ ও অরক্ষিত লেভেলক্রসিংগুলোতে প্রায়ই মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটলেও এ বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষের প্রতিবিধান তৎপরতা দৃশ্যমান নয়।
গত শুক্রবার দৈনিক পূর্বকোণে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, চট্টগ্রাম থেকে তিনটি রেলরুটের দুই শতাধিক লেভেলক্রসিংয়ের ৯০ ভাগ অবৈধ। রুটগুলো হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইনের মিরসরাই পর্যন্ত, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট ও চট্টগ্রাম-দোহাজারী। তিন রুটে হাতেগোনা কয়েকটি ক্রসিংয়ে গেটম্যান থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে কাজে গাফিলতির অভিযোগ। এসব ক্রসিং-এ একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও নেয়া হচ্ছে না কার্যকর পদক্ষেপ। অপর এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ‘দেখুন শুনুন চলুন’ ‘সামনে দুটি রেলপথ’ ‘নিজ দায়িত্বে পার হোন’- সীতাকু-ে গেটম্যানবিহীন অরক্ষিত অর্ধশতাধিক রেলক্রসিংয়ে সাইনবোর্ডে এ ধরনের সতর্কবার্তা লিখেই কর্তব্য শেষ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ! কিন্তু দ্রুতগতিতে আসা যানবাহনের চালকের অধিকাংশই এসব সাইনবোর্ডের দিকে না তাকিয়ে খোলা গেট পেয়ে দ্রুত গন্তব্যে যেতে চেষ্টা করেন। ফলে ঘটে দুর্ঘটনা। আবার সীতাকু- উপজেলার বড়দারোগারহাট থেকে সলিমপুর পর্যন্ত রেললাইনের পূর্ব-পশ্চিম উভয় পাশে রয়েছে বেশ কিছু বসতবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, সরকারি ইকোপার্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ফলে সাধারণ মানুষসহ অসংখ্য যানবাহন রেললাইনে উভয় পাশে আসা-যাওয়া করতে গিয়ে অনেক ক্রসিংয়ের সৃষ্টি হয়েছে। সারাদেশেই এমন চিত্র বিদ্যমান। বস্তুত অবৈধ ও অরক্ষিত লেভেলক্রসিং এবং ক্রসিংয়ে নিয়মিত গেটম্যানের অনুপস্থিতির কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে। রেলওয়েতে কর্মরত অনেক চালক, গেটম্যান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার আশানুরূপ প্রসারও ঘটছে না।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, সারাদেশে মোট ২ হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার রেলপথে মোট ২ হাজার ৫৪১টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। যার মধ্যে অনুমোদিত ক্রসিংয়ের সংখ্যা মাত্র ৭৮০টি। বাকি ১ হাজার ৭৬১টিই অনুমোদনহীন। আবার ৭৮০টি অনুমোদিত ক্রসিংয়ের মধ্যে রক্ষী আছে মাত্র ২৪২টিতে। ৫৩৮টি অনুমোদিত ক্রসিংয়েই কোনো রক্ষী নেই। অর্থাৎ গেটরক্ষী ছাড়াই অরক্ষিত আছে মোট ২ হাজার ২৯৯টি লেভেলক্রসিং। নেই যাননিয়ন্ত্রণের কোনো কর্মীও। নেই সংকেতবাতি। ফলে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল দিন দিন বড় হচ্ছে। প্রাণহানির পাশাপাশি ক্ষতি হচ্ছে দেশের সম্পদ। রেলক্রসিংয়ে এখন যে হারে মানুষ মারা যাচ্ছে, রেলপথের ধারণার সঙ্গে তা বেমানান। অবৈধ ও অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ের পাশাপাশি রেললাইন ঘেঁষে গড়েউঠা অবৈধ দোকানপাট ও বস্তিও আরেকটি সমস্যা। রেলের জায়গায় দোকানপাট-বাজার চালু করার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। লেভেলক্রসিং পারাপারে সাধারণ মানুষ এবং যানবাহনও অনেক ক্ষেত্রে বেপরোয়া আচরণ করে থাকে। প্রায়ই ক্ষেত্রে ক্রসিংয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিপজ্জনক উপায়ে পারাপারের চেষ্টা করা হয়। অনেকক্ষেত্রে রেললাইনের উপর উঠার পর যাত্রীবাহী গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। যাত্রীরা কোনো রকমে পড়িমরি করে প্রাণ রক্ষা করলেও, বিকল যানটি লেভেলক্রসিংয়ে পড়ে থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ধরনের দুর্ঘটনার কারণে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় ঘটে। এ কারণে যাত্রী ভোগান্তি ও রেলওয়েকে লোকসান গুনতে হয়।
সারাদেশের লেভেলক্রসিংগুলো বছরের পর বছর মৃত্যুফাঁদ হিসেবে থাকবে এবং নাগরিকেরা অসহায়ভাবে প্রাণ হারাবে তা কোনো অর্থেই কাক্সিক্ষত নয়। সব লেভেলক্রসিংয়ে অন্তত একজন সার্বক্ষণিক গেটম্যান রাখার পদক্ষেপ নেয়া দরকার। ব্যস্ত এলাকাগুলোতে রেলপথে ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস নির্মাণ করাও জরুরি। বাস্তবতার নিরিখে অবৈধ লেভেলক্রসিংগুলো উচ্ছেদ করা সম্ভব না হলে সেখানে দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেয়া উচিত। দুর্ঘটনা এড়াতে লেভেলক্রসিংয়ে গেটম্যানের সার্বক্ষণিক উপস্থিতির পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের কর্মতৎপরতাও নিশ্চিত করতে হবে। রেলকর্তৃপক্ষ যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করে এবং পথচারী ও যানচালকেরা সচেতন হয়, তাহলে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। আমরা আশা করব, এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

Share