দিলশাদ ঝুমুর

কাগজে কলমে দাশ প্রথার অবসান ঘটেছে তা ঠিক। কিন্তু আসলেই কি দাশ প্রথা শেষ হয়েছে? প্রশ্নটির উত্তর খুব সহজেই বুঝা যায় চট্টগ্রামের সীতাকু- উপজেলার শুকলালহাটস্থ ধান খলার ছোট্ট পাড়াটিতে এলে। ধান খোলার এ পাড়াটিতে প্রায় ৪০-৫০টি পরিবারের বসবাস। এখানকার মানুষগুলো সবাই ধান খোলায় কাজ করে। ধান খোলায় যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করে তাদেরকে বলা হয় দাশ। বাজার থেকে মহাজনরা কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে এখানে নিয়ে আসে। এখানে আনার পর ধানগুলোকে পানিতে গাঁজানো, সিদ্ধ করা, রোদে শুকানো, মেশিনে চুরানো, চাল ও কুড়াগুলো বস্তায় ভরাসহ সব কাজই করা হয়। মোটামুটি ধান থেকে চালে পরিণত করে পাইকারের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত যত কাজ আছে তার সবই করে এখানে বসবাসরত শ্রমিকরা।
মূলত নদী ভাঙনের কারণে সন্দ্বীপ ও দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে ঘর-ভিটেহীন অসহায় মানুষগুলো এখানে এসে ঠাঁই নেয় দু-মুঠো অন্নের আশায়। কোনমতে যিনি একবার এসে এখানে ঠাঁই নেন, তার পক্ষে এ জীবনের বাইরে অন্য কোন জীবনে প্রবেশ করা সম্ভব হয় না। এখানে বসবাসরত মানুষগুলোর কর্মসংগ্রাম শুরু হয় রাত ৩টা থেকে। সূর্যের রোদ উঠার আগেই তাদেরকে পানিতে গাঁজানো ধানগুলো সিদ্ধ করে ফেলতে হয়। তারপর সারাদিনের রোদে সেগুলো পায়ে ঘেঁটে ঘেঁটে শুকাতে হয়। সূর্য ডোবার সাথে সাথে সেগুলো আবার বস্তায় ভরে নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণ করে রাখতে হয়। বিশেষ করে বর্ষাপূর্ব-বর্ষাকালীন-বর্ষাপরবর্তীকালীন সময়গুলোতে তাদেরকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের মত ২৪ ঘণ্টাই সতর্ক থাকতে হয়। কখন জানি বৃষ্টি এসে যায়?
এভাবেই প্রতিদিন রাত ৩টা থেকে রাত ৮/৯টা পর্যন্ত এ পাড়ার মানুষদেরকে কাজে লেগে থাকতে হয়। উৎসব-পার্বন, বিনোদন, উন্নত জীবন এসব নিয়ে ভাবার টাইম নাই এদের। কর্মসংগ্রামে যিনি জয়ী হতে পারেন না তাকে পার করতে হয় অমানবিক জীবন। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য এসব ব্যাপারে তেমন দেখভালও করতে পারেন না ধান খোলার শ্রমিকরা। শিক্ষার অভাবে বংশানুক্রমে ছেলে মেয়েরাও ধান খোলার শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে।

নারী-পুরুষের মজুরী বৈষম্য:
পুরুষরা যা কাজ করেন নারীরাও ঠিক ততটাই কাজ করেন। বরং নারীদেরকে একটু বেশিই কাজ করতে হয়। রোদে পুড়ে পায়ে ঘেঁটে ঘেঁটে ধানগুলো শুকানোর কঠিন কাজটা মূলত নারী শ্রমিকদেরকেই করতে হয়। কিন্তু তারপরও মজুরীর বেলায় পুরুষরা পান ২৫০টাকা আর নারীরা পান ১৭০ টাকা। ধান খোলার একজন নারী শ্রমিক বললেন, “আমরা যা কাজ করি, পুরুষরাও তাই করে, কিন্তু তারপরও মজুরীর বেলায় কেন যে তারা বেশি পায় তা বুঝি না। এ ব্যাপারে মহাজনকে কিছু বললে তিনি বলেন না পোষাইলে কাম না করতে, কিন্তু কাম না করে যামু কই? খামু কি? তাই করি…”.
কাজ না করে যাবে কোথায়, খাবে কি? ঠিক এ কারণেই বছরের পর বছর এভাবে অমানবেতরভাবে খাটুনি খেটে যাচ্ছে ধানখলার এ শ্রমিকরা।
ধান খোলার আরেকজন শ্রমিক জানালেন, “রাত ৩ টা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা ৭টা-৮টা এমনকি কখনো কখনো ৯টা-১০টা পর্যন্তও আমাদেরকে কাজ করতে হয়। অতিরিক্ত কাজ করে অতিরিক্ত কোন মাইনেও পাই না। আর যা বেতন পাই তা দিয়ে ঘর ভাড়া, ছেলেমেয়েদের অসুখ বিসুখ, খাওয়া দাওয়া সব মিলে সংসারটা চালিয়ে নিতে অনেক কষ্ট হয়।”
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী ও মজুরী প্রদানে নারী পুরুষের বৈষম্যের ব্যাপারে এ পাড়ার একজন মহাজনের কাছ থেকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মহিলারা দুর্বল, তারা ভারী কাজ করতে পারে না, ভারী কাজ করতে পুরুষ মানুষ লাগে। তাই কাজ অনুযায়ী বেতন দিই। আর তাছাড়া তাদের যদি না পোষায় তারা কাজ ছেড়ে দিক, কেউ তো তাদের আটকে রাখেনি।
সংকটটা আসলে সেই এক জায়গায়, কর্মসংস্থানের চরম অভাব আর অন্যত্র গিয়ে তারা মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও যে পাবে না তা মালিক-শ্রমিক সবাই বুঝে।
এব্যাপারে রেডিও সাগরগিরির স্টেশন ম্যানেজার শাহ সুলতান শামীম বলেন, ধান খোলার এসব শ্রমিকদের জন্য বিকল্পকর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে না পারলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।