নিজস্ব প্রতিবেদক

গভীর রাতে নগরবাসী যখন ঘুমিয়ে যায় তখন জেগে উঠেন রিয়াজউদ্দিন বাজার তিনপুলের মাথার শ্রমিকরা। মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত শ্রমিকদের হাঁকডাকে সরগরম থাকে তিনপুলের মাথা। নগরীর বৃহত্তর পাইকারি কাঁচা বাজারের আড়ত রিয়াজউদ্দিন বাজার। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সবজি বহনকারী ট্রাকের ভিড় বাড়তে থাকে সেখানে।
বুধবার রাতে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, তিনপুলের মাথা থেকে জুবিলি রোডের এনায়েতবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকা আর চৈতন্যগলি ছাড়িয়ে গেছে শত শত ট্রাকের সারি। দেশের বিভিন্ন জেলা শহর থেকে আসা প্রতিটি ট্রাক ঘিরে আছে শ্রমিকের দল। কোনো ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছে বেগুন, মূলা, টমেটো, গাজর, লেবু আবার কোনোটি থেকে নামানো হচ্ছে আমলকি, আমড়া, শশা, চালকুমড়া, বরবটি, কচু, বাঁধাকপি, আলুসহ নানা জাতের সবজি। ট্রাক থেকে নামানো সবজি ঠেলাগাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রিয়াজউদ্দিন বাজার কাঁচাবাজার আড়তে।
পনেরো বছরের অধিকসময় ধরে সবজি বহনের কাজ করছেন আবদুল লতিফ। তিনি জানান, উত্তরাঞ্চল, তিন পার্বত্য জেলা ও চট্টগ্রামের আশপাশে উৎপাদিত সবজি আসে রিয়াজউদ্দিন বাজারে।

রাত দশটার পর থেকে ভোর পর্যন্ত ট্রাক থেকে সবজি নামানোর কাজ করে শ্রমিকরা। ঠেলাগাড়িতে সবজিগুলো নেয়া হয় কাঁচাবাজার আড়তে। মধ্যরাত থেকে আড়তে শুরু হয় বেচাকেনা। ভোর থেকে আড়তের সবজিসহ নানা পণ্যসামগ্রী ছড়িয়ে পড়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। লতিফ জানান, প্রতিদিন শত শত ট্রাকভর্তি সবজি আসে রিয়াজউদ্দিন বাজারে। আর সবজি নামানোকে ঘিরে শত শত শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহ হয়। রাতে শহরের লোকজন যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন আমরা জেগে উঠি। মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত কাজ করে লোকজন যখন জেগে উঠে আমরা তখন ঘুমাতে যাই।
আবর্জনার ভাগাড় কাঁচাবাজার : তিনপুলের মাথা থেকে ৫০ গজ ভিতরে সড়কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আবর্জনা। সড়কের দু’পাশে বসা সবজি বিক্রেতারা। সড়কে দুটি রিকশা অতিক্রম করার জায়গাও নেই। একটি ট্রাক আড়তে সবজি দিয়ে ফেরার পথে লেগে যায় যানজট। ডাস্টবিন উপচে রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আবর্জনা। বিশেষ করে সবজি আড়তের কাছে ডাস্টবিনে দিনে আবর্জনা পরিষ্কার করা যায় না।
কারণ আড়তের সামনের সড়কের উভয়পাশে খুচরা সবজি বিক্রেতারা বসে সবজি বিক্রি করেন। জানা গেছে, পাঁচ টন ওজনের একটি সবজির ট্রাক থেকে কয়েক মণ বর্জ্য সৃষ্টি হয়। এসব বর্জ্য সরাসরি সড়কের ওপর ফেলে দেয়া হয়। ফলে পুরো সড়ক আবর্জনায় সয়লাব হয়ে যায়। রাত ১২ টার পর থেকে লাইন ধরে সবজির ট্রাক প্রবেশ করে কাঁচাবাজারে। পণ্য খালাসের পর আবর্জনাগুলো ফেলা হয় সড়কে। জানা যায়, রিয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির অধীনে আরো নয়টি ব্যবসায়ী সমিতি রয়েছে। তা হচ্ছে, আড়তদার কল্যাণ সমিতি, খুচরা কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতি, গোমাংস ব্যবসায়ী সমিতি, মৎস্য আড়তদার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, গ্রোসারি ব্যবসায়ী সমিতি, সিগারেট ব্যবসায়ী সমিতি, আরএস বাজার লেন ব্যবসায়ী সমিতি ও ইলেক্ট্রিনিকস ব্যবসায়ী সমিতি।
ব্যবসায়ীরা জানান, রিয়াজউদ্দিন বাজার দুই ভাগে বিভক্ত। পূর্ব বাজার ও পশ্চিম বাজার। শাড়ি, লুঙ্গি, রেডিমেড গার্মেন্টস, থান কাপড়, জুতা ও কসমেটিকসের দোকান নিয়ে পূর্ব বাজার গঠিত। পশ্চিম বাজারে রয়েছে মাছ, মাংস, মুরগী, সবজির আড়ত ও সবজির দোকান। সবজির আড়তের সংখ্যা ১৩৩টি। মাছ বাজার তিনটি। মধ্যম মাছ বাজার, ও পোড়াভিটা মাঠ মাছ বাজার।
পাইকারি সবজি বিক্রেতারা জানান, রিয়াজউদ্দিন বাজারে দৈনিক বর্জ্য জমা হয় একশ টনের উপরে। তন্মধ্যে সবজির আড়তের বর্জ্যরে পরিমাণ দৈনিক প্রায় অর্ধশত টন।
বাজরের আবর্জনা অপসারণ পদ্ধতি সেই পুরনো আমলের ন্যায়। পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের হলেও সময়মতো অপসারণ হয় না। বণিক সমিতির পক্ষ থেকে তিনজন পরিচ্ছন্ন কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা সকাল বিকেল দুই বার বাজার পরিষ্কার করে থাকে। কিন্তু এতেও কাজ হচ্ছে না।
আড়তদাররা জানান, গ্রীস্মকালে দৈনিক দুইশ ট্রাক পণ্য আসে বিভিন্ন আড়তে। শীতকালে আসে তিনশ ট্রাক। সড়কের ওপর পণ্য খালাস ও আবর্জনা ফেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পণ্য খালাসের পর আমাদের নিজস্ব লোক দিয়ে এসব বর্জ্য অপসারণ করা হয়ে থাকে। এরপরও কিছু বর্জ্য সড়কে থেকে যায় বলে। সময়মতো বর্জ্য অপসারণের ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশনের সাথে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। আশা করি একটা সমাধান পাওয়া যাবে।
১৯০৭ সালে উকিল রিয়াজউদ্দিন আসাম বেঙ্গল রেজিস্টার অফিসে বাজারের জায়াগা ওয়াকফ মূলে দান করে যান। তারও আগে উকিল বাড়ির পাশে পুকুর ধারে ছোট আকারে বাজার বসতো। সেই থেকে রিয়াজউদ্দিন উকিলের নামেএ বাজারের নামকরণ করা হয়।

Share
  • 107
    Shares