নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » স্যানিটেশন মডেল গ্রাম কার্যক্রমের গতিধারা

স্যানিটেশন মডেল গ্রাম কার্যক্রমের গতিধারা

স্বাস্থ্যসম্মত কোডেক স্যানিটেশন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কৌশলসমূহ (ঙঢ়বৎধঃরড়হধষ ঝঃৎধঃবমরবং): গ্রামের সীমানা নির্ধারণ: শাখা তার আওতাধীন গ্রামগুলোর মধ্য হতে ১০০% লক্ষ্য অর্জনে সম্ভব এমন একটি গ্রাম নির্বাচন করবে। গ্রাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে বিষয় বিবেচনা করতে হবে তা হলো, গ্রামের প্রত্যেকের নিজস্ব জায়গা ও লেট্রিন বসানোর জায়গা থাকতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে যে, উক্ত জায়গায় জোয়ার বা বন্যার পানি উঠে না। সমন্বয় পরিষদের অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে এই গ্রাম নির্বাচিত হবে। কর্মসূচী বাস্তবায়নে সুবিধার জন্য চিহ্নিত ও নির্বাচিত গ্রামটিকে ২/৩টি জোন বা ক্লাষ্টারে ভাগ করতে হবে এবং প্রতিটি জোন বা ক্লাষ্টারে ৫ হতে ৭টি পরিবার চিহ্নিত থাকবে। এ ক্ষেত্রে একটি ম্যাপ শাখা কার্যালয় ও সমন্বয় পরিষদ অফিসে থাকবে এবং ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়েও জমা দেয়া হবে। পরিবার চিহ্নিতকরণ ও লেট্রিনের অবস্থা নিরূপণ: শাখা থেকে ৩-৪ জনের একটি টীম সংযুক্ত বেইজ লাইন ফরমেট অনুযায়ী পরিবার চিহ্নিত করবে এবং লেট্রিনের প্রকৃত অবস্থা নিরূপন করবে। নির্বাচিত টীমের মধ্যে সমন্বয় পরিষদের একজন প্রতিনিধি থাকবে। সমন্বয় পরিষদের সাথে মতবিনিময়: মডেল গ্রামের বেইজ লাইন সার্ভে থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে সমন্বয় পরিষদের কার্যকরী কমিটির সাথে মতবিনিময় করা, যাতে কার্যক্রম সম্পর্কে তারা সার্বিক অবগত হয়। কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ পূর্বক সমন্বয় পরিষদ নেতৃবৃন্দকে এই কার্যক্রমের দায়-দায়িত্ব বন্টন করে দিতে হবে, যাতে সবার অংশগ্রহণ থাকে। যে সব শাখাধীন সমন্বয় পরিষদ নেই সেখানে গ্রাম-সংগঠনগুলো হতে উদ্যোগী নেতা/নেত্রী নির্বাচন করে একটি ‘স্যানিটেশন কমিটি’ গঠন করতে হবে এবং এই কার্যক্রম প্রক্রিয়ায় তাদের সক্রিয় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ইউনিয়ন পরিষদের সাথে মতবিনিময়ঃ ১০০% স্যানিটেশন কার্যক্রম নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদের সাথে মতবিনিময় সভা করার ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মহিলা ও পুরুষ মেম্বার, গ্রাম সরকার, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত ও গ্রাম সর্দার/মাতবর উপস্থিত থাকেন। এই মতবিনিময় সভার আয়োজনে থাকবে সমন্বয় পরিষদ বা যেখানে সমন্বয় পরিষদ নেই সেখানে স্যানিটেশন কমিটি। সভায় স্যানিটেশন মডেল গ্রামের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে হবে এবং সবার অংশগ্রহণে একটি ওয়াচ কমিটি গঠন করতে হবে। ওয়াচ কমিটি গঠনঃ এ প্রক্রিয়ায় স্যানিটেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার জন্য একটা ৭ সদস্য বিশিষ্ট ওয়াচ কমিটি গঠিত হবে। ওয়াচ কমিটিতে থাকবেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি, স্থানীয় মেম্বার পুরুষ/মহিলা, গ্রাম সরকার, শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত, সমন্বয় পরিষদ ও কোডেক প্রতিনিধি। তারা পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মনিটরিং করবে। এখানে নারী ও পুরুষের সম-অংশগ্রহণ থাকবে। কমিটির ভূমিকা হবে পরিকল্পনা করা, বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেয়া এবং ১০০% অর্জন নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা মনিটরিং করা। কমিটি নিয়মিত সভা করবে এবং সভার রেজুলেশন একটা খাতায় সংরক্ষণ করবে।
পরিবার প্রধানদের নিয়ে সভাঃ ওয়াচ কমিটি কমিউনিটিকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রতি পরিবার থেকে পরিবার প্রধানদের নিয়ে মাসিক সভা করবে। সভায় তাদের উপলব্ধিতে আনার জন্য বেইজ লাইন সার্ভে থেকে প্রাপ্ত তথ্য তাদের অবহিত করা হবে। খোলা পায়খানার কুফলগুলো এবং স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তাদের সামনে তুলে ধরবে। যে সব পরিবারে স্বাস্থ্যসম্মত জলাবদ্ধ পায়খানা নেই, তারা নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পায়খানা নির্মান ও ব্যবহার করবে – এই সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি আদায় করবে এবং নথিবদ্ধ করবে। এছাড়াও স্বল্প ব্যয়ে কিভাবে জলাবদ্ধ পায়খানা নির্মাণ করা যায় এবং প্রযুক্তিগত তথ্য কোথায় পাওয়া যেতে পারে, তাও পরিবারগুলোকে অবগত করবে ওয়াচ কমিটি।
শিশু ও কিশোর-কিশোরী দলঃ শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রচারণার দায়িত্ব পালন করবে। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে ২০ জনের একটা দল গঠন করা হবে, যারা পুরো গ্রামে স্যানিটেশন বিষয়ক প্রচারের কাজটা করবে। এরা গ্রামে প্রতি মাসে পোষ্টার ও ফেষ্টুন নিয়ে স্লোগান বা কোরাস গান গেয়ে র‌্যালী করবে।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযানঃ গ্রাম সংগঠনের সদস্য/সদস্যা, শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে সংশ্লিষ্ট গ্রামে মাসে একবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হবে। এই অভিযান পরিচালনার সময় স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা বিষয়ক বিভিন্ন শ্লোগান ও ম্যাসেজ সম্বলিত ব্যানার ও প্লেকার্ড বহন করা হবে এবং প্রদর্শিত হবে। সংশ্লিষ্ট গ্রামের সবচেয়ে বয়োজেষ্ঠ্য ব্যক্তিকে দিয়ে প্রথম অভিযানটি উদ্বোধন করা যেতে পারে। অভিযান পরিচালনার সময় ওয়াচ কমিটি গ্রামে এ কাজের তদারকী করবে। এছাড়াও প্রতিটি পরিবার প্রতিদিন নিজেদের বাড়ীর আঙ্গিনা পরিষ্কার রাখবে এবং বাড়ীর এক পাশে একটি নির্দ্দিষ্ট স্থানে ঘরের ময়লা আবর্জনা ফেলবে। চায়ের দোকানে আলোচনাঃ নির্বাচিত গ্রামের চা’য়ের দোকানগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এ সব চা’য়ের দোকানে লোকজনের দিনের কোন কোন সময়ে সমাগমে বেশী হয়, তা চিহ্নিত করে এ সব সমাগম বা আড্ডায় স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা সম্পর্কিত লিফলেট, ছবি ও ফ্লিট চার্ট প্রদর্শন করতে হবে এবং আলোচনা করতে হবে বিশেষ করে খোলা জায়গায় পায়খানা করলে কি কি রোগ ছড়াতে পারে এবং পরিবেশগত কি কি সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে তার উপর আলোচনায় গুরুত্ব দিতে হবে। খোলা জায়গায় পায়খানা করা সামাজিক ভাবে যে একটি মর্যাদাহানিকর কাজ তাও এখানে সবাইকে উপলব্ধি করাতে হবে।
স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নির্মান ও ব্যবহার বিষয়ে এই সময় কেউ কিছু জানতে চাইলে, তাকে দ্রুত তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোচনা : কোডেক শিশু শিক্ষা কেন্দ্রসহ স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল ও মাদ্রাসা) সমূহে স্বাস্থ্য সম্মত লেট্রিন ব্যবহার সম্পর্কে এবং পায়খানা ব্যবহারের পূর্বে ও পরে আচরণ বিধি প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে আলোচনা করা এবং শিশুদের উদ্বুদ্ধ করা। এ সব প্রতিষ্ঠানের শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা যে, কোন বাড়ী বা পরিবারে খোলা পায়খানা এখনো রয়েছে বা পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা পালন করা হচ্ছে না। এছাড়াও খোলা জায়গায় পায়খানা না করার জন্য উদ্বুদ্ধমূলক র‌্যালী, গ্রাম প্রদক্ষিণ ও প্রচারণা কাজে এই শিশু কিশোর দল সক্রিয় থাকবে। মসজিদ ও মন্দিরে আলোচনা: সংশ্লিষ্ট গ্রাম ও আশে-পাশের গ্রামসমূহের মসজিদের ঈমামগণ জুম্মার দিন খুৎবা পাঠের সময় স্বা¯হ্যবিধি সম্পর্কীয় কোরান ও হাদিসের বিষয়গুলো যাতে নামাজে আগতদের মাঝে প্রচার করেন, সেই সম্পর্কে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের এ সর্ম্পকীয় বিভিন্ন তথ্য ও বার্তা সরবরাহ করা হবে। একই ভাবে মন্দিরের পুরোহিতগণদের একই ভাবে উদ্বুদ্ধ করা হবে, যাতে মন্দিরে পূজা ও প্রার্থনার সময় আগতদের মাঝে নিয়মিত এ সম্পর্কীয় তথ্যসমূহ প্রচার করেন।
স্যানিটেশন ইঞ্জিনিয়ারিং দলঃ গ্রামের সদস্যদের মধ্য হতে ০৫ জনকে নিয়ে একটি স্যানিটেশন ইঞ্জিনিয়ারিং দল গঠন করতে হবে। এই দল বিভিন্ন লেট্রিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বা কেন্দ্রে গিয়ে লেট্রিনের বিভিন্ন মডেল ও খরচের ধারণা নিবে এবং তা গ্রামের পরিবারসমূহে সরবরাহ করবে। যদি কোন কারিগরী সহায়তা চায় তাও দেয়ার ব্যবস্থা করবে। শ্লোগান ও বার্তা সাইন বোর্ড ঃ গ্রামের প্রধান রাস্তাসমূহে বা স্পটে কার্যক্রম শ্লোগান ও স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন বার্তাসমেত সাইন বোর্ড লাগানো থাকবে। ০র্১ – ০র্১ মাপের ছোট এই সাইন বোর্ড তৈরীর খরচ গ্রাম ওয়াচ কমিটি বহন করবে। সাইন বোর্ড লাগানোর ¯হান চিহ্নিত করা ও লাগানোর খরচও বহন করবে ওয়াচ কমিটির সদস্যরা।
“মসজিদে শুক্রবার খুতবা পাঠের সময় খোলা পায়খানার কুফল সম্পর্কে ইমাম সাহেব ও আমি আলোচনা করি। খোলা জায়াগায় পায়খানা যে পুকুরের পানিতে গড়িয়ে পড়ে, সেই পুকুরের পানিতে অজু করে মুসল্লীরা মসজিদে নামাজে আসেন। এতে অজু হয় কি না, তা আলোচনা করা হয়। ফলে উপস্থিত সবাই সতর্ক হয়ে উঠেন।- সোহরাব (কোডেক শাখা কর্মী), চাটখিল শাখা, লক্ষ্মীপুর। “যাদের বাড়ীতে খোলা পায়খানা থাকবে, তাদের বাড়ীতে বা পরিবারের কোন শালিসে আসা হবে না।” – স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার, চর জব্বার, লক্ষ্মীপুর।
কোডেক স্যানিটেশন মডেল গ্রাম কার্যক্রম বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে বিপুল সাড়া পড়ে যায়। এই কার্যক্রমটিতে সামগ্রীকভাবে সব শ্রেণী ও পেশার মানুষের এবং সমগ্র নারী পুরুষ কিশোর কিশোরীদের নিবিড় ও সক্রিয় অংশগ্রহণে এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ¯হানীয় সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বয় ও একাত্মতায় কোডেক কর্ম এলাকার মোট ১৯টি গ্রাম শতভাগ স্যানিটেশন গ্রাম হিসেবে সরকারী স্বীকৃতি লাভ করে।

লেখক পরিচিতিঃ উন্নয়ন কর্মী
সধহরশপড়ফবপ@মসধরষ.পড়স

Share