নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » ফিলিস্তিনে ইসরাইলী আগ্রাসন রুখতে চাই আন্তর্জাতিক চাপ

ফিলিস্তিনে ইসরাইলী আগ্রাসন রুখতে চাই আন্তর্জাতিক চাপ

দশকের পর দশক একটি স্বাধীন মাতৃভূমির স্বপ্ন দেখতে দেখতে ফিলিস্তিনিরা আজও যুদ্ধের ময়দানে লড়াইরত। তাদের সে স্বপ্ন কবে পূরণ হবে তা বলা বেশ কঠিন। কারণ দখলদার বাহিনী ইসরাইল যেভাবে তাদের ওপর চেপে বসে আছে তাদের থেকে ফিলিস্তিনিদের আশু মুক্তি বেশ কষ্টসাধ্য হবে মনে হয়।
প্রকৃতপক্ষে ১৮৮০ সালের দিকে ফিলিস্তিনে বসবাস করছিলো ৫ লাখ আরব ফিলিস্তিনি এবং ২৫ হাজার ইহুদী। এরপর এসব ইহুদীদের অর্ধেক অন্য দেশে চলে যায়। গণহত্যাকারী বর্ণবাদী ইহুদীরা ধারাবাহিকভাবে ব্যাপকহারে ফিলিস্তিনিদের বহিষ্কারের জন্য দায়ী ছিলো।
১৯৪৮ সালে বহিষ্কার করা হয় ৮ লাখ এবং ১৯৬৭ সালে হত্যা করা হয় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনিকে। ওই শতাব্দীতে ইসরাইলীরা ফিলিস্তিনের ৯০ শতাংশে ভূখ-ে চালায় জাতিগত নিধন এবং ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ আগ্রাসনের পরবর্তী সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৩ লাখ ফিলিস্তিনির। আর আরোপিত সন্ত্রাসের কারণে মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ফিলিস্তিনির।
আর, সেসময় যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে ২২লাখ ফিলিস্তিনির। প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিনিদের গণহত্যার সূচনা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশবাহিনী ও অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড আর্মি কোরের ফিলিস্তিন দখলের পর সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে ১ লাখ ফিলিস্তিনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। আজকের দিনে ফিলিস্তিনি শরণার্থীর সংখ্যা ৮০ লাখ। আর ফিলিস্তিনির সংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ। ফিলিস্তিনিদের প্রায় ৫০ শতাংশকেই অর্থাৎ ৭০ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের নিজ আবাস ভূমে ফিরতে দেয়নি। মাত্র ১৮ লাখ ফিলিস্তিনি ইসরাইলে বসবাসের সুযোগ পায়। ৫০ লাখ ফিলিস্তিনির রয়েছে শূন্য মানবাধিকার। কারণ এরা বসবাস করছে পশ্চিম তীরের বাল্টুস্থানগুলোতে। অর্থোডক্স জুডাইজম আর জায়নবাদ এক নয়। কারণ জায়নবাদ হচ্ছে জেনোসাইডার রেসিজম। তাছাড়া প্রচলিত অর্থোডক্স ইহুদিদের দুই হাজার বছরের অবস্থান হচ্ছে শুধু ইহুদীরাই জায়নে (জেরুজালেম) ফিরতে পারবে, যখন মিসাইয়া পৌঁছবে প্রভু লর্ডের পুরো বিশ্ব বিজয় উন্মোচন করতে। অর্থোডক্স জুডাইজম দেয় কিংডস, অব মাইন্ডের ধারণা। এই ধারণাই পরবর্তিতে আন্তর্জাতিক ধর্মনিরপেক্ষ বিজ্ঞানী, প-িতজন, সঙ্গীতজ্ঞ, শিল্পী ও লেখকদের কাছে গৃহীত হয়। তা সত্ত্বেও সেকুলার ইহুদী ও ধর্মীয়ভাবে ইহুদীদের বিরুদ্ধে রুশদের জাতিগত বৈষম্যের প্রতিবাদে জায়নবাদীরা অভিমত দেয় একটি ইহুদী রাষ্ট্রের পক্ষে। ঘধঃযধহ ইরৎহনধঁস সর্বপ্রথম জায়োনিজম শব্দ ব্যবহার করেন। তিনি পরবর্তীতে এই দুষ্ট জায়নবাদী আদর্শ প্রত্যাখ্যান করে ফিরে আসেন অর্থোডক্স জুডাইজমের মানবতায়।
বর্ণবাদী জায়নবাদ উল্লেখযোগ্য ভাবে সূচিত হয় বর্ণবাদী সাইকোপ্যাথ থিওডোর হার্জলের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন একজন হাঙ্গেরীয় ইহুদী লেখক ও সক্রিয়বাদী। তিনি তার বই ‘উবৎ লঁফবহংঃধধঃ’ (ঞযব ঔবরিংয ঝঃধঃব) এ ১৮৯৬ সালে ঘোষণা দেয় “ঝযধষষ বি পযড়ড়ংব ঢ়ধষবংঃরহব ড়ৎ ধৎমবহঃরহব? ডব ংযধষষ ঃধশব যিধঃ রং মরাবহ ঁং….. বি ংযধষষ ংবৎাব ধং ঃযব ঠধহমড়ৎফ ড়ভ পঁষঃঁৎব ধমধরহংঃ নধৎনধৎরংস.
তখন ২০টিরও বেশি কলোনির প্রস্তাব করা হয়েছিল একটি ইহুদী কলোনী সৃষ্টির জন্য। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার কথাও ছিল। ১৯১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের সিনাই ও ফিলিস্তিন অভিযান শুরু হয় ফিলিস্তিন থেকে তুরস্কের সিনাই অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে। ব্রিটিশ ও ফ্রান্স সাবেক ওসমানীয় সা¤্রাজ্য শাসিত মধ্যপ্রাচ্য ১৯১৬ সালে ভাগ করে নেয়। অস্ট্রেলীয় ও নিউজিল্যা-ের সৈন্যরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিলিস্তিন ও সিরিয়া দখল করে নেয়ার সাথে জড়িত ছিল।
১৯১৮ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ব্রিটিশদের অনুমোদনে ফিলিস্তিনিতে বিপুল অভিবাসীর আগমন ঘটে। এর ফলে ব্যাপকহারে ফিলিস্তিনিরা তাদের কর্ম হারায়। ফিলিস্তিনিরা একইভাবে হারায় জমির ওপরে মালিকানা। এতে ফিলিস্তিনিরা বাধা দিলে সশস্ত্র দ্বন্দ্ব বাধে বর্ণবাদী ইহুদী অভিবাসীদের সাথে।
১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ধরে নেয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোটি কোটি মুসলমানদের অনুসমর্থন দরকার। তাই ব্রিটিশ সরকার একটি শ্বেতপত্র একাংশের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে আরো ইহুদী আগমণের ওপর বিধি নিষেধ আরোপ করে। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদী বসতি থামিয়ে দেয়া হয়। অবশ্য সাবেক ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম লোকক্ষয় হয় অবৈধ ইহুদী অভিবাসীরা।
এরা মূলত জোর করে ফিলিস্তিন ভূখ-ে ঢুকতে চেষ্টা করেছিল। ১৯৪৫-১৯৪৭ সালের দিকে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্যাপকভাবে দুবর্ল হয়ে পড়া ব্রিটিশদের তাদের বিশাল সা¤্রাজ্য আর ধরে রাখতে পারেনি। তাই তারা ১৯৪৪ সালে ফিলিস্তিন থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। মূলত একটি বিভাজনের মাধ্যমে তারা ফিলিস্তিন ত্যাগ করে। ১৯৪৭ সালে এই পার্টিশানকে জাতিসংঘ অনুমোদন দেয়। ১৯৪৮ সালে যে দিনটিতে জেনোমাইডাল ব্যাসিস্ট বেন গুরিয়ন ইসরাইলের স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
এর পরদিন ব্রিটেন সর্বশেষ ফিলিস্তিন ছাড়ে এবং জাতিসংঘ ইসরাইল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। আর এরপর থেকেই ইসরাইলীরা ফিলিস্তিনিদের উপর বর্বর নির্যাতন চালাতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, ফিলিস্তিনিরা যুগ যুগ ধরে যে স্বাধীন ফিলিস্তিনের জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে, তা বিশ্বের সকল মানুষের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর বৃহৎশক্তি যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অবস্থান করায় স্বাধীনতা তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য বৃহৎ শক্তিগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তেমন জোড়ালো ভূমিকা রাখছে না।
বিশেষ করে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কোনো প্রস্তাব ওঠলেই যুক্তরাষ্ট্র তাতে ভেটো দিচ্ছে। ফলে তাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। আমরা যুগ যুগ ধরে নিজ দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে থাকা ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি চাই।
প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে পৃথিবীর সব দেশ এক হয়ে আন্তর্জাতিক বৃহৎ শক্তি সমূহকে চাপ দিয়ে রাজী করাতে হবে। এভাবে দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিরা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে জীবন কাটাতে পারে না। আমরা প্রত্যাশা করবো বৃহৎ শক্তিগুলো এক হয়ে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার জন্য সফল পদক্ষেপ নেবে।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, মানবাধিকারকর্মী।

Share