নিজস্ব প্রতিবেদক

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধানতম কারণ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞগণের যে মত, তা হলোবেপরোয়া গতির গাড়ি, অদক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক। আবার এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই, রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার না করে রাস্তার যেকোন অংশ দিয়ে পারাপার। এমনকি অমনযোগী হয়ে মোবাইলে কথা বলতে বলতে এবং দৌড়ে রাস্তা পার হওয়াও সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ।
গত ২৯ জুলাই ঢাকার শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর দেশব্যাপী নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সড়ক আইন সংশোধনের দাবির পাশাপাশি জনগণের মধ্যে এক ধরণের সচেতনতাবোধ তৈরি হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রতিনিয়ত যে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা ঘটছে তা থেকে কিভাবে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়, নিয়ে এখনও চলছে আলোচনাপর্যালোচনা। নিরাপদ সড়কের জন্য চালকদের বিবেচনাবোধের পাশাপাশি শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষেরও যে ভূমিকা আছে, এটি অনেকেই উপলব্ধি করছেন।
এতো দুর্ঘটনার পরও আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই রাস্তা পারাপারে শিক্ষার্থীদের কোনো দিকনির্দেশনা বা শিক্ষা দেওয়া হয় না। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা বা গাইডলাইন দেওয়া হয়। রাস্তায় কিভাবে হাঁটতে হবে কিংবা কিভাবে রাস্তা পারাপার হতে হবে এসব নিয়মকানুন যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিখানো হতো, তাহলে অনেক সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। বহু নিষ্পাপ প্রাণ রক্ষা পেতোএমনটিই মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।
সম্প্রতি জাপান ঘুরে আসা চট্টগ্রামের এক ব্যক্তি সেখানকার ছাত্রদের চলাফেরায় যে শৃঙ্খলা তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। বলেন, জাপানে একবার রাস্তায় ঘুরতে বের হলাম। দেখলাম, শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে রাস্তায় হাঁটছে। জানতে চাইলে জাপানের প্রধান কাঁচ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান (আশাহি) এর এক কর্মকর্তা বলেন, জাপানের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের এভাবে রাস্তায় হাঁটানো হয় এবং রাস্তা পারাপারের বিভিন্ন নিয়মকানুন অনেকটা হাতেকলমে শিখানো হয়।
তিনি আরো বলেন, রাস্তায় হাঁটার সময় কোন্ পাশ দিয়ে হাঁটবে এবং কিভাবে জেব্রা ক্রসিং পারাপার করতে হবে জাপানের স্কুলগুলোতে এগুলো সেই শিশুকালেই শেখানো হয়। পাঠের অংশ হিসেবেই শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে প্রতিদিন শিক্ষকরা রাস্তায় বের হন।
জাপান সফরে যাওয়া চট্টগ্রামের ওই পর্যটকের কথার সাথে মিল পাওয়া গেলো নগরীর পূর্ব নাসিরাবাদের একটি স্কুলে। এই স্কুলের নাম অরবিট রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা স্কুলে ঢুকে সারিবদ্ধভাবে। বেরও হয় সারিবদ্ধ হয়ে। লম্বা সারিতে একজনের পিছনে হাঁটে অন্যজন। সবার পরনে একই রকমের পোশাক। কেউ কারো আগে যাচ্ছে না, আর কেউ সারি থেকে বের হওয়ার চেষ্টাও করছে না।
পথচলায় ব্যতিক্রম এই দৃশ্য দেখে পথচারীরা অনেকে থমকে দাঁড়ায়। কৌতূহলী হয়ে জানতে চান এরা কারা। অরবিট রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের নিয়মিত এই দৃশ্য চলছে প্রায় বছর ধরে। রাস্তায় হাঁটা পারাপারের বিভিন্ন নিয়মকানুন দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের শিখিয়ে আসছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুল ছুটি হলে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ২০৩০ মিনিট বাইরে থেকে সারিবদ্ধভাবে হাঁটিয়ে আনা হয়। স্কুলের অধ্যক্ষ শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে গাইডলাইন দিয়ে থাকেন। ফলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় হাঁটা পারাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে। এজন্য শিক্ষার্থীরা যেমন বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাচ্ছে আশা করা যায় এতে তাদের মধ্যে আইন মানারও প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।
অরবিট রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, আমি স্কুলে যোগ দেয়ার পর ২০০৯ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিদিন রাস্তায় বের হই। তাদের নিয়ে ২০৩০ মিনিট হেঁটে আসি এবং কিভাবে রাস্তায় হাঁটবে রাস্তা পারাপার হবে সেটি তাদের শিখিয়ে দিই। সবাই এক সারিতে যায় এবং এক সারিতেই আসে। তাদের শিখানো হয় রাস্তায় হাঁটার সময় হাতের কোন্ পাশ দিয়ে যাবে। এর ফলে তারা সড়ক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি সড়কে চলাচলের আইনকানুনও জানতে পারবে।
স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাফায়েত হোসেন সামির বলেন, আমরা কখনো স্কুল থেকে বের হওয়ার সময় একজন অন্যজনের আগে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করি না। কারণ এতে দুর্ঘটনা হতে পারে। স্কুল ছুটি হলে আমরা সবাই সারিবদ্ধ হয়ে একে একে স্কুল থেকে বের হই। আমাদের টিচারগণ শিখিয়েছেন স্কুল ছুটি হলে কিভাবে বের হতে হয়। আর রাস্তা পারাপার হওয়ার সময়ও আমরা তাড়াহুড়ো করি না। ভালোভাবে রাস্তা এবং গাড়ি দেখেই রাস্তা পার হই। রাস্তা পারাপারের সময় কারো সাথে কথা না বলারও নির্দেশনা আমরা পেয়েছি।
নবম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জরিনা বেগম বলেন, এই স্কুলের সবচেয়ে যে বিষয়টি ভালো লাগে, সেটি হচ্ছে তাদের নিয়মশৃঙ্খলা। ছুটি হলে তারা যখন স্কুল থেকে বের হয়, দৃশ্যটি দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। একটি সারিতে সবাই একে একে লাইন ধরে বের হয়। কেউ কারো আগে যাওয়ার জন্য তাড়া নেই। রাস্তা পারাপারেও তাদের বেশ সতর্কতার সাথে রাস্তা পার হতে দেখা যায়।
তিনি আরো বলেন, পড়াশুনার পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি যেটি প্রয়োজন সেটা হচ্ছে নৈতিক শিক্ষা। অরবিট স্কুলে পড়াশুনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা এবং নিয়মশৃঙ্খলা শিখানো হয়। আগে বললেও আমার ছেলে কাউকে সালাম দিত না, আর এখন সালাম দেওয়ার জন্য বলতে হয় না।
রাস্তা পারাপারের গাইডলাইন স্কুলের বিভিন্ন শৃঙ্খলা কেমন লাগে জানতে চাইলে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফাইয়াজ চৌধুরী জয় মুচকি হেসে মাথা নেড়ে উত্তর দেয়, ভালো লাগে। সে আরো জানায়, স্কুল ছুটি হলে তার সব বন্ধুও সারিবদ্ধ হয়ে স্কুল থেকে বের হয়

Share
  • 195
    Shares