দেশের কৃষকদের সিংহভাগই এখনো ক্ষুদ্র চাষী। ক্ষুদ্র এক জমিতে ফসল আবাদের মাধ্যমে নিজের পরিবারের ভরণপোষণ করে আসছেন তারা। তথ্য বলছে, এক হেক্টরেরও কম জমিতে আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি কৃষক। ক্ষুদ্রায়তন হওয়ার কারণেই এসব জমির উৎপাদনশীলতাও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম।
জনসংখ্যার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধিতে দেয়া হয়েছে অগ্রাধিকার। এর ধারাবাহিকতায় কৃষিজমির ওপর চাপ বেড়েছে ব্যাপক হারে। ফলে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে ফসল ফলানো সম্ভব হয়েছে আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। সফল হয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যও। রাসায়নিক সার কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে নিংড়ে নেয়া হয়েছে জমির সবটুকু রস।
জাতিসংঘের খাদ্য কৃষি সংস্থার (এফএও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, কনজারভেশন এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস বা সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থা হলো, ‘কৃষিতে সম্পদসাশ্রয়ী ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা, যা একই সঙ্গে উচ্চমাত্রার টেকসই উৎপাদন নিশ্চিতের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি পরিবেশের সুরক্ষাদানের ওপর জোর দেয়।বিষয়টি অনেকটা অর্গানিক কৃষি পদ্ধতির মতো মনে হলেও দুয়ের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। অর্গানিক কৃষি পদ্ধতিতে ভূমি কর্ষণ বা জমি চষার প্রয়োজন থাকলেও সুরক্ষা কৃষিতে শূন্য বা সর্বনিম্ন পর্যায়ে ভূমি কর্ষণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
সহজ কথায়, সুরক্ষা কৃষি একই সঙ্গে বাস্তুসংস্থানের সুরক্ষা, টেকসইভাবে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করা, মুনাফা বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদ পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর জোর দেয়। সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থাপনার তিনটি মূল নীতি নির্ধারণ করেছে এফএও। এগুলো হলোপ্রথমত, যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির স্বাভাবিকতা নষ্টের বিষয়টিকে সার্বক্ষণিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আটকে রাখা; দ্বিতীয়ত, মাটির উপরে স্থায়ী অর্গানিক আবরণ সৃষ্টি তৃতীয়ত, একই জমিতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ফসল আবাদ (ফসলের বহুমুখী আবর্তন) নিশ্চিত করা।
গবেষকরা বলছেন, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে যেমন জীবনজীবিকার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব, তেমনি সামাজিক ক্ষমতায়নের বিষয়টিও নিশ্চিত করা সম্ভব।
সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থা অনুসরণে কৃষকের শ্রম, সেচ জ্বালানিনির্ভর অন্যান্য ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জমির সুস্বাস্থ্য উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষা দেয়া সম্ভব। ফলে প্রথাগত কৃষি পদ্ধতির তুলনায় কৃষকের সার্বিক মুনাফাও হয় অনেক বেশি। এর পরও বিশ্বে এখনো খুব কমসংখ্যক কৃষকই কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করছেন।
আর্থিক দিক বিবেচনায় প্রথাগত কৃষি পদ্ধতির তুলনায় সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থায় সব দিক থেকেই কৃষকের লাভ বেশি। পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে ব্যয় কমে যায় কৃষকের। ফলে মুনাফাও বাড়তে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে কাভার ক্রপ (ভূমি ক্ষয়, জমির উর্বরাশক্তি, মাটির মান, পানি, আগাছা ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে বোনা ফসল) বোনার মাধ্যমে শ্রম, সার পরবর্তী ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির ব্যবস্থা করা সম্ভব। বীজকোষধারী ফসল ফলানোর মাধ্যমে জমিতে পরবর্তী ফসলের জন্য নাইট্রোজেন সারের প্রয়োজনীয় পরিমাণ কমানো সম্ভব। ফলে সারের পেছনে ব্যয়ও কমে যায় অনেকখানি। এছাড়া জমির উৎপাদনশীলতায় কাভার ক্রপের প্রভাবও হয় বেশ ইতিবাচক। কাভার ক্রপ বাইকালচারের (একসঙ্গে দুটি যৌথ ফসল ফলানো) মাধ্যমে জমির উৎপাদনশীলতাও বাড়ানো সম্ভব। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাভার ক্রপ হিসেবে শুধু ঘাস কলাই চাষের মাধ্যমেই জমির গড় উৎপাদনশীলতা ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া ক্রপ রোটেশন বা একই জমিতে একাধিক ফসল ফলানোর ক্ষেত্রেও ধরনের পদ্ধতিতে জমির উৎপাদনশীলতা ফলন প্রথাগত পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি থাকে। যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হলে ক্রপ রোটেশনের ফলে ফলন তো কমবেই না, বরং উৎপাদনশীলতার ওপর এর প্রভাব হবে ইতিবাচক।
এর আগে ইকুয়েডরে খামার পর্যায়ে সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থাপনার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে এক গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু কাভার ক্রপ আবাদ, ক্রপ রোটেশন মাটির ক্ষয়ে রোধ এবং এতে অর্গানিক উপাদানের মাত্রা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে জমি কর্ষণের মাত্রা কমানোর মাধ্যমে খানাপর্যায়ে কৃষকের আয় বেড়েছে ব্যাপক পরিমাণে। সম্প্রতি ভারতের ওড়িশায় কেন্দুঝাড় জেলায় অর্থনৈতিক লিঙ্গভিত্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আরেক গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে দেখানো হয়েছে, সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থাপনা অনুসরণের ক্ষেত্রে প্রথাগত চাষ পদ্ধতির তুলনায় সর্বনিম্ন মাত্রার কর্ষণ বেশি লাভজনক। আবার সর্বনিম্ন মাত্রার কর্ষণের তুলনায় কোনো ধরনের কর্ষণ ছাড়া আবাদ আরো বেশি লাভজনক। এখানে কাভার ক্রপ হিসেবে কলাই আবাদ হয়েছিল।
জিম্বাবুয়েতে পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থাপনার আওতায় ভুট্টা আবাদ করে ফলন পাওয়া গেছে প্রথাগত আবাদ পদ্ধতির তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি।
ভারতের পাঞ্জাবের কয়েকটি জেলায় পরিচালিত আরেক গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে, গম আবাদে কর্ষণমুক্ত পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমেছে। এতে একদিকে যেমন যন্ত্র, শ্রম, রাসায়নিক বাবদ কৃষকের খরচ কমেছে, অন্যদিকে বেড়েছে উৎপাদনশীলতাও। ফলে পদ্ধতি অনুসরণকারী কৃষকের মুনাফাও হয়েছে প্রথাগত পদ্ধতি অনুসরণকারীদের তুলনায় অনেক বেশি।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের পাঁচ ভিন্ন ভিন্ন ফসল আবাদকারী কৃষকদের ওপর গবেষণা চালানো হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের তিন বিশেষজ্ঞ গবেষণা পরিচালনা করেন। ময়মনসিংহ, বগুড়া, টাঙ্গাইল, শেরপুর জামালপুর অঞ্চলের ৬০ কৃষকের ওপর গবেষণাটি চালানো হয়। এতে দেখা যায়, সম্পদসাশ্রয়ী কৃষি পদ্ধতি হিসেবে গবেষণার আওতাভুক্ত কৃষকদের কাছে এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে সুরক্ষা কৃষি পদ্ধতি। পদ্ধতিতে ১০ শতাংশ জমিতে আবাদের জন্য কৃষকদের খুবই স্বল্প পরিমাণে সহায়তা দেয়া হয়েছিল। সামান্য সহায়তা কাজে লাগিয়ে কৃষি উৎপাদনে ব্যয় অনেকাংশেই কমিয়ে আনতে পেরেছেন কৃষক। অন্যদিকে এর বিপরীতে ফসলের ফলন পেয়েছেন আগের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া সুরক্ষা কৃষি পদ্ধতিতে প্রথাগত পদ্ধতির তুলনায় চাষাবাদ যে অনেক বেশি লাভজনক, সেটি গবেষণায় আবারো প্রমাণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথম মৌসুমে মুনাফার পরিমাণ কিছুটা কম হলেও পরের দুতিন মৌসুমে তা বহুলাংশে বেড়ে যায়।
গবেষণায় আরো দেখা যায়, সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থাপনা অনুসরণের মাধ্যমে এর আওতাধীন এলাকায় ফসলের উৎপাদনশীলতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ওই অঞ্চলের গড় উৎপাদনশীলতার তুলনায় অনেক বেশিতে।
প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে গবেষণাটিতে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থাপনা কৃষিতে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হলে কৃষকদের মধ্যে যথাযথ উপকরণসহায়তা, প্রণোদনা সরকারি সম্প্রসারণ সুবিধা প্রয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে সুরক্ষা কৃষি ব্যবস্থাপনাকে জনপ্রিয় করে তোলা গেলে তাদের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উপসংহার টানা হয়। [সূত্র : পত্রপত্রিকা]

মরিয়ম আকতার ব্যাংকার

Share
  • 2
    Shares