নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখুন

পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখুন

পাহাড়ধসের মৌসুম চলে এসেছে। বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসের আশংকা আছে। তাই প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পাহাড় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ এবং পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিচ্ছে প্রশাসন। দৈনিক পূর্বকোণে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বুধবার থেকে নগরীর পাহাড় এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। অগ্রাধিকারভিত্তিতে মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, আমিন কলোনি, টাংকির পাহাড়, মিয়ার পাহাড়, এ কে খান পাহাড়ে এবং পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন প্রেরণের নির্দেশনা রয়েছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ, সন্দেহ নেই। তবে, বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতি বছরই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন তৎপরতা দেখা গেলেও ঝুঁকিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর আর্থিক অসচ্ছলতা, অসচেতনতা, অবৈধ দখলদার ঝুঁপড়ি মালিকদের চাপ, স্বার্থান্বেষী চক্রের অপতৎপরতা, প্রয়োজনীয় নজরদারীর অভাব এবং এ বিষয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা না থাকায় কাক্সিক্ষত সুফল আসছে না।
গত বছর একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী চক্র ঝুঁকিতে থাকা জনগণকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কাজে পরোক্ষে বিঘœ সৃষ্টি করেছিল। এবারও সে রকম হওয়ার আশংকা আছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ উপায়ে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নির্মাণ করে উন্মুল জনগোষ্ঠীর কাছে ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এবং নিচ্ছে মূলত তারাই এ কাজ ভ-ুলের অপচেষ্টা চালায়। তাদের কাছে অসহায় মানুষদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। টাকাই তাদের কাছে সব। তারা শুধু সন্ত্রাসী কায়দায় পাহাড় দখল করে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বানিয়ে ভাড়া দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, পাহাড়ের মাটিও বিক্রি করে দিচ্ছে ইটভাটাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির কাছে। পাহাড় কাটার কারণে পরিবেশ হুমকিতে পড়লেও তাদের কিছুই যায়Ñআসে না। টাকাই তাদের কাছে মুখ্য। আর প্রশাসনের নির্লিপ্ততা তাদের অবৈধ কাজে উৎসাহ যোগাচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেও পাহাড়ধসে অসহায় মানুষ আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনা এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ধসে মৃত্যুর ঘটনার পর ঘটিত বিভিন্ন তদন্ত রিপোর্ট বলছে, নির্বিচারে পাহাড়কাটার কারণেই মূলত একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। পাহাড়ধসে মর্মান্তিক মৃত্যুর মিছিল থামাতে বেশকিছু বিশেষজ্ঞ সুপারিশও এসেছে বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপারটি হচ্ছে, সেসব সুপারিশ কখনো বাস্তবায়ন করার জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর মূলে কাজ করেছে প্রশাসনিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক চাপ এবং প্রভাবশালী মহলের অবৈধ ও অনৈতিক প্রভাব।
পরিবেশ আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানও পাহাড়কেটে বিভিন্ন সময়ে নানা স্থাপনা তৈরি করেছে এবং করছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে নানা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু এসব অপতৎপরতা বন্ধে কখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে আইন অমান্য করে সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়েই চলছে পাহাড়নিধন। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিস্বার্থে পাহাড়ি মাটি পাচার কিংবা পাহাড়ে অপরিকল্পিতভাবে জনবসতি গড়ে তোলার প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিণামে পাহাড়ধসজনিত বিপর্যয়ও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ হয়েছে কয়েক বছর আগে। অননুমোদিতভাবে পাহাড় কাটলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদ-ের বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আইন কোথাও মানা হচ্ছে না প্রশাসনের নির্বিকার ভূমিকার কারণে। এক সময় সংবাদপত্রের পাতায় পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি বিজ্ঞাপন দেখা যেতো। বিজ্ঞাপনটির শিরোনাম ছিল ‘পাহাড় বা টিলা কাটা আইনত নিষিদ্ধ’। কিন্তু এখন এ ধরনের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে না। এ ধরনের বিজ্ঞাপন থেকে কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলেই হয়তো অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তর ভাবছে খামাখা বিজ্ঞাপন দিয়ে পয়সা খরচ করার মানে হয় না। এদেশে যা ঘটবার তাতো ঘটছেই।
আমাদের মতে, পাহাড় কাটা এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচারণা ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারণ পাহাড় কাটলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়, বনাঞ্চল উজাড় হয়, পাহাড়ি কীট-পতঙ্গ এবং জীবজন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পাহাড় ও পাহাড়ি বন ধ্বংসের কারণে মেইন সয়েল নষ্ট হয়ে শস্য উৎপাদন হ্রাস এবং ভূমিক্ষয় ত্বরান্বিত হয় সর্বোপরি পাহাড় ও টিলা কাটার পরিণতিতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। পাহাড় ধসে অসহায় মানুষের নির্মম মৃত্যু হয়। আমরা চাই, পাহাড় সুরক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতির বিরুদ্ধে সরকারের সময়োপযোগী কঠোর পদক্ষেপ। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াবার লক্ষ্যেও ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

Share