নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » বৃহত্তর বরিশালে শায়িত হযরত কায়েদ শাহ

বৃহত্তর বরিশালে শায়িত হযরত কায়েদ শাহ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বৃহত্তর বরিশালের ঝালকাঠি জেলা। জেলা সদর থেকে মাত্র ২/৩ কি.মিটারের মধ্যে ১১ একর এরিয়া নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিশাল ইসলামি কমপ্লেক্সের প্রাণ কেন্দ্রে এ মহান অলি হযরত কায়েদ শাহ (রহ.) চির নিদ্রায় শায়িত।
তাঁর মূল নাম হযরত শাহ মাওলানা আজিজুর রহমান নেছারাবাদী (রহ.)। তিনি ছারছীনা তরীক্বত ও মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা হযরত শাহ মাওলানা নেছার উদ্দীন (রহ.) ‘র’ অন্যতম খলিফা। হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুরের জীবন প্রবাহ অনেকটা ছারছীনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ ছারছীনা দরবারে অতিবাহিত করেন। ছারছীনা মাদ্রাসায় লেখাপড়ার পাশাপাশি তরীক্বত জীবনে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। এতে তিনি মহান হযরত নেছার উদ্দীন (রহ.)‘র’ ছুহবতে নিজেকে আধ্যাত্মিক জগতে এগিয়ে নিতে সক্ষম হন।
হযরত শাহ মাওলানা নেছার উদ্দীন (রহ.) ফুরফুরা হযরত আবু বক্কর ছিদ্দিক (রহ.) ‘র’ খলিফা হন। তিনি হলেন কলকাতায় মানিক তলায় শায়িত সূফি ছৈয়দ ফতেহ আলী (রহ.)‘র’ ৩৫ জন মহান খলিফাগণের মধ্যে অন্যতম।
ভারতের বিখ্যাত হুগলি মাদ্রাসার হেড মাওলানা ছিলেন হযরত শাহ সুফি গোলাম সালমানী (রহ.)। পরবর্তী তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার হেড মাওলানা হন। হযরত শাহ সুফি মাওলানা গোলাম সালমানী ও হযরত শাহ সুফি আবু বক্কর ছিদ্দিক (রহ) উভয়ে আপন মামাত ফুফাত ভাই। পশ্চিম বঙ্গের হুগলি জেলার ফুরফুরাতে উভয়ের মাজার মাত্র ১ কি.মি ব্যবধানে।
হযরত কায়েদ ছাহেব (রহ.) ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ঝালকাঠি জেলা সদর থেকে মাত্র ২/৩ কি.মি দূরত্বে বাসন্ডা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি তার মহান পীরের নামকরণে এলাকার নামকরণ করেন নেছারাবাদ। তাঁর পিতা ছিলেন মৌলভী মফিজুর রহমান। হযরত কায়েদ (রহ.) প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভোলা জেলা সদরের আলীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৩০-৩৫ খ্রিস্টাব্দে ভোলা আলীয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন শেষ করার পর ছারছীনা মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এ মাদ্রাসা হতে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ফাজিল কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় কলকাতা মাদ্রাসা বোর্ডে সম্মলিত মেধা তালিকায় ৩য় স্থান অধিকার করেন। ঐ সময় কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা বাদে অন্য কোন মাদ্রাসায় টাইটেল তথা কামিল পড়ার ব্যবস্থা না থাকায় তাঁকে তাঁর মহান পীরের অনুমতি সাপেক্ষে কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হবার সুযোগ হয়। ঐ সময় কলকাতা মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন অবিভক্ত বাংলার খ্যাতিমান আলেম মাওলানা সামশুল আলম (রহ.), মাওলানা ইয়াহিয়া শাহ সারামী(রহ.), শায়খুল ওলামা মাওলানা বেলায়েত হোসাইন বীর ভুমি (রহ.), সামশুল ওলামা মাওলানা মোল্লা সফিউল্ল্যাহ প্রকাশ মোল্লা সাহেব (রহ.), বাহরুল উলূম মাওলানা মুহাম্মদ হোসাইন সিলেটী (রহ.)। কামিল ডিগ্রী অর্জন করার পর তিনি ছারছীনায় পীরের খেদমতে আসে চলে আসেন। তাঁর মহান পীর থেকে চার তরিকায় কামিলিয়ত হাছীলের পাশাপাশি খেলাফত লাভ করেন।
তিনি ২০০১ খ্রিস্টাব্দে হজ্বের উদ্দেশ্য সৌদি আরব গমন করেন। ঐ সময় পবিত্র মক্কার রুসাইফা নামক আবাসিক এলাকায় হযরত শায়খ আল্লামা ছৈয়দ মুহাম্মদ ইব্নে আলভী মক্কী হাসানী মালেকীর দরবারে গমন করছিলেন। হযরত আলভী মক্কা শরীফে খুবই পরিচিত শায়েখ ছিলেন। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। এ মহান শায় খ ইন্তেকাল করলে কাবা শরীফে জানাযার পর বাদশাহ ফাহাদের আগ্রহে বিশেষ বিমানে রিয়াদ নিয়ে গিয়ে তাঁকে দাফন করা হয়।
হযরত কায়েদ ছাহেব (রহ.) ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর এক পুত্র, চার কন্যা। পুত্র হযরত শাহ মাওলানা খলিলুর রহমান নেছারাবাদী পিতার রেখে যাওয়া শরীয়ত ও তরিক্বতের খেদমতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
হযরত কায়েদ ছাহেব কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ডিগ্রী নেওয়ার পর ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে থেকে ছারছীনা মাদ্রাসায় শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে এই মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ছারছীনায় শরীয়ত ও তরিকত্বের খেদমতের পাশাপাশি নিজ জন্ম ভূমিতে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পর্যায়ক্রমে তিনি মাদ্রাসাটির ব্যাপকতা লাভ করাতে সক্ষম হন। মাদ্রাসার নামকরণ করেন ঝাল কাঠি এন. এস কামিল মাদ্রাসা। ১১ একর এরিয়ার উপর বহুতল বিশিষ্ট বিশাল বিশাল ১০/১২টি দালানাদির সমন্বয়ে এই মাদ্রাসা। এতে রয়েছে ৩‘শ’ জন শিক্ষক-কর্মচারী, ছাত্রসংখ্যা ৫ হাজার। তৎমধ্যে ৩ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী হোস্টেলে থাকে। ঝালকাঠি জেলা সদরের সরকারী পরীক্ষা সমূহের কেন্দ্র এ মাদ্রাসায়। ফলে বাৎসরিক ৭/৮টি পরীক্ষা চলাকালীন মাদ্রাসায় যাতে নিয়মিত লেখাপড়ায় বিঘিœত না ঘটে সে লক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ কয়েক ‘শ’ মিটার দূরত্বে পৃথকভাবে সরকারী পরীক্ষা চালানোর জন্য ঘর নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। যা দেশে একটি শিক্ষণীয় বিষয়। যেহেতু মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় ৫ম থেকে কামিল পর্যন্ত বাৎসরিক ৭/৮ টি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
তাঁর মতাদর্শ নিয়ে জানতে পারা যায়, ছারছীনার একজন খলিফা হিসেবে সুফিজমে, তরিক্বতে, সুন্নীয়তে বিশ্বাসী। তবে তিনি শরীয়ত অনুসারী সর্ব মহল নিয়ে ঐক্যের পক্ষে। সে মতে তাঁর একটি শ্লোক হল “আল এত্তেহাদ-মাল এখতেলাফ” অর্থাৎ মতানৈক্য সহ ঐক্য।
এ মহান অলি ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের ২৮ এপ্রিল সোমবার সকালে ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলায়হে রাজিউন)। তাঁর লাশ ঝালকাঠিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পর দিন যোহরের নামাজের পর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ঝালকাঠি মাদ্রাসা ময়দানে নামাজে জানাযার পর মাদ্রাসা এরিয়ায় তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আরব ইউরোপসহ বিশ্বের বহু দেশ থেকে তাঁর ভক্ত মুরিদরা প্রায় ৩০ ঘণ্টা মত সময় পাওয়ায় তাঁর জানাযায় শরীক হতে ছুটে আসেন। প্রায় ১৫ কি.মি এরিয়াব্যাপী তাঁর জানাযায় ৫ লাখের অধিক লোকের সমাগম হয়লে জানতে পারা যায়।
গত ৫ ফেব্রুয়ারী আবু মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম, এডভোকেট মুহাম্মদ ইলিয়াস,আলহাজ্ব মুহাম্মদ শরীফ, নিজাম উদ্দীন, আকাশ রহমানকে সাথে নিয়ে ৫ দিনের বরিশাল ভোলা সফরের প্রোগ্রামে এই মাদ্রাসায় গমনের সুযোগ হয়। ঢাকা সদরঘাট থেকে সকাল ৮ টার শিপে বরিশাল গমন। এখানে আমাদের স্বাগত জানায় এই প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি মাওলানা মুহাম্মদ সুলায়মান। বরিশাল ঘাট থেকে মাত্র ৩০/৩৫ মিনিটের মধ্যে ঝালকাঠি মাদ্রাসায় পৌঁছতে সক্ষম হই। এখানে রাত্রি যাপন করি। তাদের আতিথিয়তা স্মরণীয়। বাংলাদেশের মাটিতে তরীক্বতের পাশাপাশি মাদ্রাসার অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার দিক দিয়ে ছানছীনার পর সারা দেশে কয়েকটি মাদ্রাসার মধ্যে এটি একটি হবে।
বস্তুতঃ ঝালকাঠি একটি ছোট জেলা মাত্র। বরিশাল থেকে মাত্র ২৫ কি.মি দূরত্বে ঝালকাঠি সদর, নলসিটি, রাজাপুর, কাঠারিয়া মাত্র ৪টি উপজেলা নিয়ে এ ঝালকাঠি জেলা। এখানে সংসদীয় আসন দুইটি।
এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, ছারছীনা ও ঝালকাঠির সাথে চরমোনাইসহ বরিশাল বিভাগ ও খুলনা বিভাগে কঠোর শরীয়তের ভিতর তরীক্বত জগতকে এখানে বুকে ধারণ করে রাখা হয়েছে। যদিও বা ছারছীনা ঝালকাঠির সাথে চরমোনাই শরীয়তে মতাদর্শ এক হলেও তরীক্বত তথা সুফিজমে পার্থক্য রয়েছে। তারপরেও ধর্মেও বৃহত্তর স্বার্থে এখানে দূরত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। পর দিন সকালে বিদায়কালে পুন: এ মহান অলি হযরত শাহ্ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুর রহমান নেছারাবাদীর যেয়ারত করি।
মহান আল্লাহ পাক তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুক। আমিন।।

Share