নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » অবিভক্ত বাংলার আদর্শবান নেতা আমিরুল হজ্ব খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী

অবিভক্ত বাংলার আদর্শবান নেতা আমিরুল হজ্ব খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

উপায় না দেখে চট্টগ্রামের শত ভাগ খাঁটি মাটির মানুষ আমিরুল হজ্ব খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী সেই বছর অর্থাৎ ১৯৪৪ সালের ৫ জুন পার্লামেন্টে উপস্থাপন করেন এক জরুরী মোশান। এদিন সময়ের অভাবে মোশান বাতিল হয়। ৭ জুন তিনি বিষয়টি পুনঃস্থাপন করলেন। এবং উক্ত মোশান না মঞ্জুর করা হলে তখনকার এ.কে.ফজলুল হক, শ্রীমতী নেলী সেনগুপ্তা, বাবু ধীরেন্দ্রলাল দত্তসহ বাঘা বাঘা পালার্মেন্ট সদস্যগণ ১০মিনিটের জন্য হলেও চট্টগ্রামের দুরবস্থার কথা বলার সুযোগ দেয়ার সুপারিশ করেন। তাও যখন ব্যর্থ হয় তখন নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে কারও আদেশ নির্দেশ তোয়াক্কা না করে বহু বাঘা বাঘা তেজস্বী বাগ্মী ও বিদ্ধান নেতৃবর্গের উপস্থিতিতে ব্রিটিশ দোর্দন্ড প্রতাপকে উপক্ষো করে অবিভক্ত বাংলার কলকতা পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে চাটগাঁর বদি আহমদ চৌধুরী অনাহারজানিত মৃত্যু কাহিনী ও চট্টগ্রামের দুর্দুশা সম্পর্কিত বক্তব্য শুরু করেন।
অনেক চেষ্টা করে তাকে নিবৃত্ত করতে না পেরে স্পিকার তাকে ২৪ ঘন্টা এসম্বেলী হলের বাইরে থাকার নির্দেশ দিলে ক্ষিপ্ত বাঘের মত গর্জন করে বলে উঠেন “আমি চট্টগ্রামের লোক আমার দেশের লোক অনাহারে মরে যাবে অথচ মেম্বারী গদী রক্ষার জন্য এই অন্যায় আদেশ রক্ষা করে (এসেম্বলী হলের) বের হব তা আমার পক্ষে কখনো সম্ভব হবে না। “আমার তিন কথা (১) হয় চট্টগ্রাম বিভাগে চাল দিতে হবে অথবা (২) আমাকে এখানে মেরে ফেলতে হবে, অথবা (৩) আমি এখন কাউকে কোন কাজ করতে দেব না। আমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত, শেষ রক্তবিন্দু শরীরে থাকা পর্যন্ত, আমি বের হব না। আমার দেশের দুঃখ কষ্টের কথা আমি বলবই বলব।
তার মরণপণ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার বাধ্য হয়ে পরবর্তী ১৫ই জুন অধিবেশনে চালের আলোচনার জন্য তার মোশান মঞ্জুর করেন। তখন চট্টগ্রামের ঝানু পার্লামেন্টেরিয়ান তার দীর্ঘ বক্তৃতার সরকারী গেজেট ও অন্যান্য প্রমাণপত্র উপস্থাপন করে প্রমাণ করেন চট্টগ্রাম ও অবিভক্ত বাংলার অন্যান্য অঞ্চল সমূহের চালের দামের এক বিরাট ব্যবধানের কথা। উল্লেখ্য, তখন কলকতায় চালের দাম ছিল টাকায় আড়াই সের আর চট্টগ্রামে টাকায় তিন পোয়া। তার এ যুক্তিনির্ভর ও অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত দাবী সহযোগী সদস্যগণের অকুন্ঠ সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার দুখানি বিশেষ ট্রেন ও দুখানি বিশেষ স্টিমার যোগে চট্টগ্রামে ৭ লক্ষ টন চাল প্রেরণ করে। ফলে, বহু লোক মারা যাওয়ার পর খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরীর জীবনমরণ সংগ্রামে চট্টগ্রামবাসী পর্যাপ্ত চাউল প্রাপ্তিতে চাউলের দাম নি¤œগামী হয়। আর দুর্ভিক্ষ থেমে গিয়ে চট্টগ্রামবাসী বাকি মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান।
তখনকার জেলা ম্যজিস্ট্রেট মি.এস.এম সুটুয়ার্ট সেই চাল পেয়ে অধীনস্ত সকল অফিসারদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্য স্থানে চট্টগ্রামের লড়াকু পার্লামেন্টেরিয়ান খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “আপনি আজ চট্টগ্রামবাসীকেও বিভাগীয় লোকদেরকে বাঁচালেন।
খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী সমাজে আরও দশ জনের মত বিশাল সমাজসেবাসহ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। ফলে তিনি একাদারে খান বাহাদুর ও আমিরুলহজ্ব উপাধী প্রাপ্তসহ ১২/১৪টি বিশাল প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সদস্য ছিলেন।
চট্টগ্রামের বাঘা বাঘা ব্যক্তিগণ যেমনি শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প, সমাজসেবায় অবদান রেখে খ্যাতিমান হয়ে আছেন তেমনি খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে সমাজসেবায় দেশসেবায় বিশাল অবদান রেখে গেছেন। সবকিছুর উপর তার বিশেষ যে অবদান রয়েছে তা হলে চট্টগ্রামবাসীকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টএ থাকার সুবাধে ২য় বিশ্বযুদ্ধকালীন দুর্ভিক্ষের কবলে পড়া নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে অবিভক্ত বাংলার ক্যালকাটা পার্লামেন্টে জীবন মরণ সংগ্রামের মাধ্যমে ৭ লাখ টন চাউল প্রাপ্তি। এ চাল প্রাপ্তির ফলে চট্টগ্রাম বিভাগের অসংখ্য মানুষ নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাগকালে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শান্তি শৃংখলা বজায় রাখার বলিষ্ট ভূমিকা আজও বয়স্ক জনের কাছে স্মরণীয়।
বিশেষ করে ঐ সময় সংখ্যালঘু হিসেবে হিন্দু ,বৌদ্ধদের উপর অমানবিক অত্যাচার যাতে না হয় সে লক্ষে তার সাহসী ভূমিকা আজও বয়স্কজনেরা স্মরণ করে। অর্থাৎ তিনি সারা জীবন ন্যায় নীতি ইনসাফের পক্ষে থাকতেন। (সমাপ্ত)

লেখক : প্রভাষক, ফিন্যান্স, বাঁশখালী গালর্স ডিগ্রী কলেজ, চট্টগ্রাম।

Share