নিজস্ব প্রতিবেদক

‘বাজেনি নাকড়া, নহবৎ ধ্বনি, সানাই অথবা শাঁখ/ তবু এসে গেছে নব পল্লবে, নব উৎসবে/ নব জীবনের নব অনুভবে, বৈশাখ’। ধরায় এসেছে বৈশাখ। এই শুধু কোনো ঋতু নয়, বাঙালির নাড়ির টান মিশে আছে এই বৈশাখে। হাজার বছরের আপন সংস্কৃতির গৌরব বুকে ধারণ করে ঐতিহ্যের অনুগামী হয়ে সারা দেশের মানুষ গত শনিবার (১৪ এপ্রিল) বরণ করে নিয়েছে নতুন বছরকে। পুরণো বছরের ব্যর্থতা ও গ্লানি মুছে, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় বাঙালি স্বাগত জানায় ১৪২৫-কে। মঙ্গল শোভাযাত্রা, নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক, লাঠিখেলা, পুতুলনাচ, বারোয়ারি মেলাসহ নানা আয়োজনে আর নতুনের আহবানে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন এই উৎসবে পুরো নগরী হয়ে ওঠে বাঙালির প্রাণকেন্দ্র।
নগরীতে জন¯্রােত শুরু হয়েছিল ভোরের আলো ফোটার আগেই। নগরীর ডিসি হিল, সিআরবি শিরিষতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় নানা বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে বাংলা নতুন বছরকে বরণের অনুষ্ঠান পরিণত হয় প্রাণের উৎসবে। ডিসি হিল ও শিরিষতলায় বর্ষবরণ উৎসবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে মানুষের উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়। গরম উপেক্ষা করে সকলেই মেতে ওঠেন উৎসবের আনন্দে।
তবে সন্ধ্যার পর থেকেই এই জনস্রোত কমতে শুরু করে। বিশেষ করে নিরাপত্তাজনিত কারণে বিকেল ৫টার মধ্যে অনুষ্ঠানে শেষের সিদ্ধান্ত এবং একইদিনে শবে-মেরাজ থাকায় এমন চিত্র দেখা গেছে বলে মনে করেন সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষরা।
ডিসি হিল : ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির উৎসব, সবার যোগে জয়যুক্ত হোক’ স্লোগানে নগরীর ডিসি হিলে সকালেই শুরু হয় সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের ৪০তম বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয় রক্তকরবীর পরিবেশনা দিয়ে। বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী শীলা মোমেনের নেতৃত্বে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানের মধ্য দিয়ে নববর্ষকে আবাহন জানান রক্তকরবীর শিল্পীরা। সেই সঙ্গে কণ্ঠ মেলান উপস্থিত সকল দর্শকরা। এরপর একে একে দলীয় পরিবেশনা নিয়ে আসে সংগীত ভবন, জয়ন্তী, ছন্দানন্দ সাংস্কৃতিক পরিষদ, গুরুকুল সংগীত একাডেমী, সুর-সাধনা সংগীতালয়, গীতধ্বনি, সৃজামি সাংস্কৃতিক অঙ্গন, ইমন কল্যাণ সংগীত বিদ্যাপীঠ, রাগেশ্রী, খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগর, বংশী শিল্পকলা একাডেমি, নটরাজ নৃত্যাঙ্গন একাডেমী, স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স, ওড়িশী অ্যান্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টার, গুরুকুল, নৃত্যম একাডেমী, ঘুঙুর নৃত্যকলা কেন্দ্র, সঞ্চারী নৃত্যকলা একাডেমী, নৃত্য নিকেতন, দি স্কুল অব ক্লাসিক এন্ড ফোক ডান্স, কৃত্তিকা নৃত্যালয়, বাধন আবৃত্তি পরিষদ, প্রমা আবৃত্তি সংগঠন, স্বরনন্দন প্রমিত বাংলা চর্চা কেন্দ্র ও উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ।
বর্ষবরণের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয় বিকেল ২টায়। এ আয়োজনে অংশগ্রহণ করে নগরীর সুন্দরম শিল্পী গোষ্ঠী, উপমা সাংস্কৃতিক অঙ্গন, ফতেয়াবাদ সংগীত নিকেতন, শহীদ মিলন সংগীত বিদ্যালয়, বাণী মঞ্জুরী ললিতকলা একাডেমী, সপ্তডিঙ্গা শিল্পাঙ্গন, নৃত্যনন্দন একাডেমী, নৃত্যরঙ একাডেমী, নৃত্যরূপ একাডেমী, ত্রিতরঙ্গ আবৃত্তি দল ও শব্দনোঙর আবৃত্তি সংগঠন। বৈশাখী উৎসবকে ঘিরে মোমিন রোড, নন্দনকানন, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সড়ক, চেরাগি পাহাড় এলাকায় বসে বৈশাখীমেলা।
বর্ষবরণ উৎসবকে ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। মূল ফটকের আগে দুইটি আর্চওয়ে, ভেতরে ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়। পোশাক পরা নারী ও পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
ডিসি হিলে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের আয়োজনে বর্ষবরণের উৎসবের সূচনা হয় সাংস্কৃতিক সংগঠন রক্তকরবীর রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে।
সিআরবি শিরীষতলা : সকাল ৮টায় ভায়োলিনিস্ট চিটাগাংয়ের শিল্পীদের ভায়োলিন পরিবেশনায় ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটির মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণের ১০তম আয়োজন। প্রিয়তোষ বড়ুয়ার পরিচালনায় ভায়োলিনিস্টের শিল্পীদের ভায়োলিনে বেজে ওঠে ‘আলোকের ঝরণাধারা’, ‘ও পলাশ ও শিমুল’ গান দু’টি। সেই সঙ্গে খাম্বাজ রাগে নববর্ষকে আবাহন জানান তারা। পরবর্তীতে দলীয় পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করে সংগীত ভবন, সংগীত তীর্থ, বাংলাদেশ রেলওয়ে সাংস্কৃতিক ফোরাম, বোধন, চারুতা নৃত্যকলা, আনন্দধ্বনি, সুন্দরম, নৃত্যনিকেতন, ছন্দআনন্দ, উচ্চারক, উদীচী, সৃজামি, প্রমা, আওয়ামী শিল্পী গোষ্ঠী, স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স, স্বরিৎ ললিতকলা, শব্দনোঙর, নৃত্যম একাডেমি, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, সুরঙ্গন, নৃত্যনন্দন, অভ্যুদয়, ঘুঙুর, মায়াবি ডান্স, সমগীত (ঢাকা)। এছাড়া একক সঙ্গীত পরিবেশন করেননাফিজা শামীম প্রাপ্তি, পাপড়ি ভট্টাচার্য, ইকবাল হায়দার, বিমল বাউল, সঞ্জিত আচার্য ও আবদুর রহিম। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সিআরবির বর্ষবরণের আয়োজন। এখানেই শেষ নয়। প্রতিবছরের মতোই সাহাবউদ্দিনের বলীখেলাও অনুষ্ঠিত হয় এখানে।
বর্ষবরণকে ঘিরে যথারীতি বসেছে বৈশাখীমেলা। বাঁশ-বেত-তালপাতার তৈরি হাতপাখাসহ বাহারি খেলনার সমাহার ছিল মেলাজুড়ে। উদযাপন পরিষদের সচিব স্বপন মজুমদার জানান, সিআরবিতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ছাড়াও ২০০ স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেছেন।
চারুকলা ইনস্টিটিউট : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ফিরে এসেছে চিরায়ত বাংলার মেলবন্ধন। ঢাক-ঢোলের তালে তালে নেচে গেয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় হাজারো নারী পুরুষ। বাদ পড়েনি শিশুরা। বরং বড়দের মতোই তালে তাল মিলিয়েছে তারাও। বরাবরের মতো নানা ধরণের মুখোশ আর বিভিন্ন প্রাণীর ডামির প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে মঙ্গলশোভায়। এবারের শোভাযাত্রায় বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে মোরগ ও পেঁচাসহ নানা মুখোশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ও চারুকলা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক প্রণব চৌধুরী বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন আর বাঙালির উৎসব নয়। এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এই বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্বে বাংলার সংস্কৃতিকে নতুনভাবে পরিচয় করে দিয়েছে।

Share