বৈশাখ (১৪ই এপ্রিল) বাঙালির নববর্ষ। প্রতিবছর নতুন সালকে বরণ করে নেয় বাঙালি। এবার বরণ করে নিবে ১৪২৫ সালকে। বাঙালি উৎসব প্রিয়। তারা সুযোগ পেলেই যে কোন উৎসবে মেতে উঠে। যেমন ধর্মীয় উৎসব, রাষ্ট্রীয় উৎসব, সামাজিক উৎসব। একমাত্র নববর্ষই আমাদের সামাজিক উৎসব। যা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি এবং কৃষি ব্যবস্থার সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। নববর্ষের মাঝে বিভাজন আছে। আমাদের নাগরিক সমাজের বিরাট অংশ আবার ইংরেজী নববর্ষ (হ্যাপি নিউ ইয়ার) পালন করে। এই প্রশ্নে আমাদের নাগরিক সমাজ বিভক্ত। আমাদের গ্রামীণ সমাজ ভিন্নভাবে নববর্ষ পালন করে। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের ধর্মীয় নেতারা হিজরী নববর্ষ ব্যাপক আয়োজনে পালন করেন না। তাহলে হয়তো নববর্ষ নিয়ে আমরা আরো জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতাম। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে আমাদের নাগরিক সমাজের নববর্ষ কোনটি? বৈশাখ না জানুয়ারী? কারণ শহরের বাঙালির একাংশ দুটোই পালন করে ঘটা করে। একটি পালন করে তার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য; ক্ষণিকের জন্য হলেও ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যাবার ইচ্ছায়; লোক সম্মুখে বাঙালিত্ব প্রমাণ করার জন্য। আরেকটি পালন করে বিশ^^ায়নের সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য।
হ্যাপি নিউ ইয়ারে থাকে নিছক আনন্দ, আমোদ ফুর্তি, যৌবনের উচ্ছ্বাস, যা দেশ ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করে এক ধরণের বিদ্রোহ; এই বিদ্রোহ দেশ জাতির জন্য কতটুক কল্যাণকর সেই বিতর্কে নাইবা গেলাম। এই আনন্দ পারিবারিকভাবে পালিত হয় না। পালিত হয় সমবয়সীদের সাথে। সেখানেহার্ড ড্রিঙ্কসহয়ে উঠে অনিবার্য সঙ্গী। এই আনন্দউল্লাসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বাহিরে অনেকের উপর অযাচিত হামলার সম্ভাবনা থাকে। এই জন্য প্রশাসনকে নিতে হয় কড়া নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা। তবু আনন্দ ফুর্তির কমতি থাকে না। কমতি নাই অর্থেরও। তাঁরা নিজেরা বা তাঁদের পিতামাতা অঢেল পয়সার মালিক। এদের অধিকাংশই লেখাপড়া ইংরেজী মাধ্যম। সুতরাং ইংরেজী কালচার তাঁদের খুবই প্রিয়। দেশ জাতির চেয়ে ইংল্যান্ডআমেরিকা অনেক বেশী প্রিয়। সিংগাপুরব্যাংকক ইউরোপ আমেরিকা প্রতিবেশী বাড়ীর মত। ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়ে ককটেল পার্টিতে যোগদান; দেশ জাতির জন্য একটু চির্য়াস করা।
আরেকটিতে থাকে দেশ জাতির জন্য এক ধরণের টান (আসলেকী?) এই টান মা মাটির প্রতি। বাঙালি যেন আরো বাঙালি হয়ে উঠার প্রচেষ্টা। বিশেষ করে ঢাকাচট্টগ্রামে রমনা পার্কেডিসি হিলে এক হয়ে সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শোনা। পুরুষেরা পায়জামা পাঞ্জাবী, মহিলারা বাসন্তি শাড়ী পড়ে এক ধরণের আত্মতৃপ্তি নিয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে।। রবীন্দ্র সংগীত লালনগীতি তাঁদের খুব প্রিয়। পান্তা ভাত শুটকী ইলিশ মাছ খেয়ে একদিনের বাঙালি হওয়ার তৃপ্তি পায়। তাঁরা মধ্যবিত্ত। তাঁদের লেখাপড়া বাংলা মাধ্যম। অঢেল টাকাপয়সা তাঁদের নাই। তবে তাঁরা সচ্ছল। খাওয়া পড়ার সমস্যা নেই। এদের অনেকে বেড়াতে বা বিয়ের বাজার করতে কলকাতাও যায়। বাঙালির এই নববর্ষ পালন শহরে সীমাবদ্ধ।
গ্রামের সাধারণ জনগণ ঘটা করে নববর্ষ পালন করে না। তাঁদের পূর্বসুরীদের ঐতিহ্যকে স্মরণ করার জন্য এই দিন তাঁরা নিরামিষ খায়। বিভিন্ন ডাউলচাউলের ভাজির মিশ্রন খায়। কাঁচা কাঠালের তরকারি খায়। তাঁরা বাংলা বছরের হিসেব রাখে কৃষির সুবিধার্থে। ফসল বপন তোলার সুধিার্থে। গ্রামের সাধারণ ব্যবসায়ীরা বছরের শেষ দিন হালখাতা করে সারা বছরের বকেয়া আদায় করার জন্য। উপলক্ষ্যে মিষ্টিমুখ করায়। গ্রামে মেলা বসে। মেলায় সারা বছরের তৈরী গৃহস্থালী জিনিষপত্র কেনাবেচা হয়। সাধারণ জনগণ তাঁদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ মেলা থেকে ক্রয় করে থাকে। যারা বিক্রেতা সারাবছর অপেক্ষা করে থাকে সেরা জিনিষটি মেলায় উপস্থাপন করার জন্য। আর্থিক লেন দেন হয়ে থাকে সকল মেলায়। কোথাও কুস্তি বা বলি খেলা হয়। এদিক থেকে চট্টগাম এগিয়ে বলি খেলা আয়োজনে, সেই সাথে কৃষিজাত এবং নিত্য ব্যবহার্য পণ্য বিক্রয়ের জন্য মেলা অনুষ্ঠানে। চট্টগ্রামের জব্বারের বলি খেলা এখন বাংলাদেশের প্রধান বলি খেলার উৎসবে রূপান্তরিত। এই উপলক্ষে যে মেলা বসে তাও বাংলাদেশের মধ্যে সেরা গ্রামীণ মেলা।
কোথাও সংগীত অনুষ্ঠান করে। কোথাও গম্ভীরা গান, কোথাও কবি গান, কোথাও পালাগান, কোথাও জারিগান, কোথাও যাত্রা, বাউল, মারফতি, মুর্শেদী ভাটিয়ালী ভাওয়াইয়া গান, মুন্সীগঞ্জে ষাঁড়ের লড়াই এবং ঢাকায় ঘুড়ি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংখ্যলঘু জাতিসমূহ (চাকমা, মারমা ত্রিপুরা মিলে) সম্মিলিতভাবে ঘটা করে পালন করে বৈসাবী (বৈসুক+ সাংগ্রাই+ বিজু)
বাংলার কৃষকেরা কৃষির স্বার্থে বাংলা বছরের হিসাব রাখে। আবহমানকাল থেকে এই ধারা চলে আসছে। তাই গ্রামের লোক একদিনের জন্য বাংলাবর্ষকে স্মরণ করে না। তারা সারাবছর বাংলাবর্ষকে লালন করে। তাই গ্রামের লোকজনের কাছে নববর্ষ হয়ে উঠে বাঙালির নববর্ষ।
কিন্তু শহরের লোকজন একদিনের জন্য নববর্ষ পালন করে। তাই বাঙালি নববর্ষ শহরে ভিন্নভাবে উদযাপিত হয়। নববর্ষে তারা নতুন করে বাঙালি সাজে। তাঁরা নববর্ষের বাঙালি।
অথচ ্রকম হওয়ার কথা ছিল না। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বাঙালির সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ, বিশেষ করে বাঙালি আধুনিক সংস্কৃতির রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান বন্ধের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে, ছায়ানট ১৯৬৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার রমণার সবুজ চত্বরে ভোর বেলায়এসো হে বৈশাখ গান দিয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেয়ার যে ধারা চালু করেছিল, তা এখন আরো বিস্তৃতি কলেবরে পালিত হলেও, বাংলার গ্রামের মানুষের প্রাণের অনুষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি। তার কারণ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা ব্যাপারে পৃষ্ঠপোষকতা করে নি। বৃটিশ পাকিস্তানের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা বাঙালির হয়ে উঠতে পারেনি। তাই একদিনের জন্য রাষ্ট্র বাঙালির রাষ্ট্র হয়ে যায়। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা। তাই তারা গ্রামের মানুষের ইচ্ছাঅনিচ্ছাকে গুরুত্ব দেয় না। রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার কর্ণধাররা নগরে বাস করে। নগরের বাসিন্দাদের মতই তাঁদের চিন্তাধারা। বাংলাবর্ষের হিসাব তাঁরা রাখে না। বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক গ্রামে বাস করে। অথচ গ্রামবাসীদের প্রতি তাঁদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। আছে একধরণের করুণা। তেমনি করুণা করে বাংলাবর্ষকে।
তাইতো বাংলাবর্ষ পিছনে পড়ে থাকে। প্রাধান্য থাকে খ্রিস্টাব্দ সালের প্রতি। যাকে আমরা সহজ করে ইংরেজী সাল বলি। ইংরেজী সালের ভিত্তিতে আমরা বেতন নিয়ে থাকি। জন্ম সাল হিসেব করি খ্রিস্টাব্দ সালের ভিত্তি করে। তারই ভিত্তিতে জন্মসাল পালন করি।
আমরা এর অবসান চাই। চাই বাঙালির রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা। বাংলাবর্ষের রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা। বাংলাবর্ষের ভিত্তিতে বেতন। তাহলে সারাবছর বাঙালি বাংলাবর্ষের হিসেব রাখবে। বাংলা বর্ষ আপন হয়ে উঠবে। বাঙালি মিশে যাবে বাঙলা বর্ষের সাথে

লেখক পরিচিতি : রাজনীতি বিশ্লেষক কলামিস্ট

Share