দক্ষিণের বাষ্পিত বিজনী হাওয়া আর তমসাচ্ছন্ন মেঘের আনাগোনা দেখেই বুঝা যায় বৈশাখের আর দেরী নেই। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বাকী মাসগুলোর আগমনী বার্তা কিছুটা পাঁচমিশালী হলেও বৈশাখের উপস্থিতি একদম নিখাদ। বাংলা মাসের নতূন দিনকে আলিঙ্গন করার জন্য বৈশাখের অভ্যাগমনের আগেই সকল বাঙালি যেন পুরনো জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলে নবরূপে নিজেকে সাজিয়ে তোলেন। যেন সর্পের পুরনো খোলস ছেড়ে নতূন অঙ্গাবরণের মতো। আশেপাশের সবকিছুই পুরাতন সাজে রঞ্জিত থাকলেও মনে মনে সকল বাঙালি আজ দারুণ রঙে উজ্জীবিত প্রাণবন্ত।
আজ ১৪২৫ সনের বর্ষবরণের প্রথম দিনটি ঘুরে ফিরে বাঙালিদের দুয়ারে দুয়ারে কড়া নাড়ছে। প্রকৃত অর্থেই আজকের দিনটি মহা আনন্দের। দিনটি কোনভাবে নির্দিষ্ট কোন জনগোষ্টীর বর্গীয় কোন দিবস নয়, বরং সকল জাতিসত্তা একত্রিত হয়ে মিলে মিশে উৎসব করার এক মহেন্দ্রক্ষণ পরব।
বৈশাখের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারো মাস অনেক আগে থেকেই গণনা করা হতো। কিন্তু মোঘল আমলে বিশেষতঃ সম্রাট আকবরের সময় থেকে বাংলা সনের আনুষ্ঠানিক হিসেব নিকেশ গণনা প্রবর্তন করেন। মোঘল আমলে হিজরী সনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করা হতো। কিন্তু হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি ফলনের সাথে তা প্রায়ই ব্যত্যয় হয়। ব্যত্যয় দূর করার জন্য সম্রাট আকবর প্রাচীনকালের বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার প্রয়োজন মনে করেন।
সম্রাট আকবরের নির্দেশ পেয়ে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী আরবী সন সৌর সনের উপর ভিত্তি করে নুতন বাংলা সনের নিয়ম পুনঃনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খৃষ্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে ৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬ ইং সালে সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয়। প্রথমে দিকে এই সনের নাম ছিলফসলি সনকিন্তু পরে এই ফসলি সনবঙ্গাব্দবা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পায়। আকবরের সময় থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। ঐসময়ে প্রত্যেককে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে খাজনাসহ যাবতীয় মাশুল পরিশোধের জন্য বাধ্য করা হতো। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির আধিকারিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের মাশুল পরিশোধকারী ব্যক্তিবর্গসহ সকল অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করাতেন। উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করতো।
কালের পরিক্রমায় অনুষ্ঠানটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়ে বর্তমানে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। বাংলাসনের আরো একটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো হালখাতা খোলা। শহরে বর্তমানে এই হালখাতা খোলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও হালখাতার প্রচলন গ্রামেগঞ্জে এবং বিশেষতঃ স্বর্ণের দোকানে এখনো দৃশ্যমান। হালখাতা খোলার দিন ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসেব নিকেশের বিবরণীর ইতি টেনে নুতন খাতা খোলার দিনে ক্রেতা সাধারণকে মিষ্টিমুখ করান। ব্যবসায়ী সমাজে রেওয়াজ এখনো ব্যাপক ভাবে পরিলক্ষিত হয়।
উপরের ইতিহাস থেকে বুঝা যায় বৈশাখী পার্বণের ইতিহাস অনেক পুরনো। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতিসত্তার নিজস্ব কিছু কৃষ্টিকালচার থাকে। আমাদের বাংলা সনের পহেলা বৈশাখও সেরকম একটি পার্বণ। বাংলা ভাষাভাষীদের পুলকিত হওয়ার এক মহা উপলক্ষ। দিনের পর দিন ধারা সমগ্র বাঙালিদের মনে আপন হৃদয়তলে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। বাঙালিরা আজ নিজেদের মতো করে উৎসবে মেতেছে। কেউ বৈশাখের জমকালো অনুষ্ঠান মাতিয়ে আর কেউ অনুষ্ঠান শ্রবণে বৈশাখীর ঝড়ে স্নানপাত্র হচ্ছেন।
বৈশাখী মেলায় বাচ্চাবয়োবৃদ্ধ মিশে একাকার। নুতন দিনের বাঁশী, তাল পাতার পাখা, বাহারী মিষ্টান্ন, খাজা, গজা ইত্যাদির পসরা সাজিয়ে ব্যবসায়ীরা নুতন আনন্দে মেতেছেন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প, হস্ত শিল্প আর মৃৎ শিল্পগুলোও মেলাতে নিজেদের মতো করে মেলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। ঐরূপ শিল্প সংশ্লিষ্ট লোকজন সারাবছর অধীর আগ্রহে দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকেন।
বৈশাখী মেলায় এছাড়াও থাকে নাগরদোলা, পুতুল নাচ, তালপাতার বাঁশী, ঘুড়ি উড়ানো, মোটরসাইকেল খেলা বা মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো রংবেরং এর নানান উৎসব পর্ব বৈশাখের উৎসব গুলোও হয় সাধারণত গ্রামবাংলার বিভিন্ন মাঠঘাটে বিশেষ করে গাছগাছালীর ছায়ায় আর তরু লতাপাতার পরশে। আমাদের চট্টগ্রাম শহরের বৈশাখী মেলার প্রধানতম স্থানটি হয়ে উঠেছে নজরুল স্কোয়ার বা ডিসি হিল। নববর্ষের প্রথম প্রহর থেকেই হাজার হাজার লোক ডিসি হিলের দিকে ধাবিত হয়। সুবিশাল কড়ই গাছের ছায়ায় বসে বৈশাখের মহামিলন মেলা। সকলের অংশগ্রহণে ডিসি হিলের বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানটি আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠেছে একটি সার্বজনীন অনুষ্ঠান। কী থাকে না ডিসি হিলে? বৈশাখী বাঁশীর সুর আর দোতারার ধ্বনিতে উম্মাতাল থাকে ডিসি হিল। সাথে থাকে নববর্ষের নৃত্য গান। মেলায় পুরো ডিসি হিল জুড়ে বসে গজা, দইয়ের বড়া, তিলের টফি, পাঁপর, বাতাসা, তালপাতার বাঁশী, পুতুল নাচ, নাগরদোলাসহ যাবতীয় পিঠাপুলির মহাসমারোহ। বৃক্ষের হৃদয়ে উঁকি মারা সূর্য্যরে প্রখর খরতাপকে উপেক্ষা করে নববর্ষউদযাপনে ব্যস্ত থাকে পরিবারের সর্ব পর্যায়ের লোকজন। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি প্রকৃতির অপার দানের সাথে মিলে মিশে উৎসব করতে বাঙালিরা ধাতস্থ। মিষ্টি, মোলা, চিড়া, খৈ, নারু, মুড়ি, দুধ, কলা, পিঠাপুলিতে আজ সাজ সাজ রব প্রতিটি বাঙালির ঘর। এসব বিতরণেও কারো কমতি নেই।
সকল অশুভ শক্তি বিতাড়িত করার আজ যেন নির্দিষ্ট দিন। বৈশাখ পুরাতন জঞ্জালআবর্জনা দূরীভূত করে নুতন দিনকে স্বাগতম জানায়। বৈশাখের আগমন যেমন দরকার তেমনি ভাবে তার ধ্বংস লীলা ক্ষমতাও অনাকাক্সিক্ষত নয়। সেজন্য কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখকে স্বাগত জানিয়ে লিখেনএসো হে বৈশাখ! এসো এসো, তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষু রে দাও উড়ায়ে, ঊৎসবের আবর্জনা দূর হয়ে যাক, যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি, অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক”… … …
আক্ষরিক অর্থে বৈশাখ আমাদের কবিগুরু মিশে একাকার। বৈশাখে কবিগুরু থাকবেন না তা অচিন্ত্যনীয়। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইসলামের ভাবনায়ও ছিল বৈশাখ। কবিতায় বৈশাখকে উপস্থাপন করেছেন এক পরাক্রমশালী শক্তি রূপে। ঝাঁঝালো হস্তে তিনি লেখেন– “তোরা সব জয়ধবনি কর। নুতনের কেতন উড়ে, কালবৈশাখীর ঝড়।তোরা সব জয়ধবনি কর বাংলা সাহিত্যে কবি নজরুলের আর্বিভাবটাই হয়েছিল হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় আর ধূমকেতুর মতো। মনোমুগ্ধকর ছড়া লিখিয়ে কবি সুকুমার রায় বৈশেখকে কল্পনা করেন কাঙ্খিত এক মাস হিসেবে। তিনি লেখেনআম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুনে। কাঁচা ইট পাকা হয় পোড়ালে তা আগুনে বৈশাখকে স্বাগত জানিয়ে কবি জীবনানান্দ দাশ লেখেনএসো এসো ওগো নবীন, চলে গেছে জীর্ণ মলিনআজকে তুমি মৃত্যুবিহীন, মুক্ত সীমারেখা। তিনি বৈশাখকে অংকন করেছেন কিশোর, ছটফটেও অনিয়ন্ত্রিত কিশোররূপে। আসলে বাংলা ভাষাভাষী কবিদের মধ্যে এমন কবির নাম পাওয়া দুস্কর, যিনি বৈশেখকে নিয়ে কিছু লেখেননি। বৈশাখ সবার মন দোলায়িত করার এক প্রভাবশালী মাস। বাঙলাবাঙালি আর বৈশাখ এক এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি ছাড়া আরেকটি কল্পনা করা কঠিন। বৈশাখ আসলে আমরা যেভাবে পুলকিত হই, সে আমুদে স্বভাবটি যেন ধরে রাখতে পারি পুরো বছর অবধি। এটাই হউক করুণাময়ের কাছে আমাদের আকুল নিবেদন। অতীতের সকল গ্লানী, ব্যর্থতা, সন্ত্রাস, জঙ্গী, দুর্নীতি, দূষণ, নৈতিক অধঃপতন, অবক্ষয়, বিচ্যুতি, পাপাচারকে পিছনে ফেলে নববর্ষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাক আমাদেরআগামীর দিনগুলি। সকলকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। শুভ নববর্ষ

লেখক প্রাবন্ধিক রসৎঁষথয়ঁধুবং@ুধযড়ড়.পড়স

Share