নীড়পাতা » প্রথম পাতা » নগরীর যানজট ৮০% কমবে মাত্র ৪ কোটি টাকা খরচেই

নগরীর যানজট ৮০% কমবে মাত্র ৪ কোটি টাকা খরচেই

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাত্র চার কোটি টাকা খরচ করে নগরীর যানজট ৮০ শতাংশ কমানো সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন জংশন ডিজাইন সংস্কার করা, প্রতিষ্ঠান প্রধানদের মানসিকতার পরিবর্তন এবং উদ্যোগ। সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে শহরের বিদ্যমান সড়কেই যানজট সহনীয় পর্যায়ে আসবে। বিশ্বব্যাংক পরিচালিত সমীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞরা এই অভিমত প্রকাশ করেছেন।
অথচ যানজটের কারণে প্রতিদিন ১৬ লাখ ৭৫ হাজার শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। প্রতিটি শ্রমঘণ্টার জন্য সর্বনি¤œ ৬০ টাকা ধরা হলে দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে ১০ কোটি লাখ টাকা অর্থাৎ এই শহরে শুধুমাত্র শ্রমঘণ্টার জন্য বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে দুই হাজার ৪৬২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
বিশিষ্ট পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়য়া পূর্বকোণকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এই শহরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি গবেষণা হচ্ছে। এই কাজে তিনি নিজেও সম্পৃক্ত উল্লেখ করে বলেন, নগরীর প্রধান ১৩টি জংশনের ডিজাইন সংস্কারের মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার একটি প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তাতে তিনি দেখিয়েছেন মাত্র চার কোটি টাকা খরচ করলে নগরীর ৮০ শতাংশ যানজট নিরসন করা সম্ভব। এই কাজের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০ মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ট্রাফিক বিভাগ থেকেও এই লোকবল নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। বাইরে থেকেও লোকবল দেয়া যেতে পারে। এভাবে একটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম শহরে পর্যাপ্ত টার্মিনাল নেই। এখানে টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে। শৃঙ্খলা অনুযায়ী গাড়ি চালানো হলে, যত্রতত্র পার্কিং না করলে যানজট আর থাকবে না। তিনি জানান, চট্টগ্রাম শহরের একেকটি মোড়ের যানবাহন চলাচলের প্রকৃতি একেক রকম। বন্দরের দিকে ভারী যানবাহন চলাচল বেশি হয়।
সুভাষ বড়য়া বলেন, ২০১৭ সাল থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিআরটিএতে ২৮৫৭টি প্রাইভেট কার নিবন্ধন হয়েছে। তাতে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫শ কোটি টাকা। এসব গাড়ির জন্য পার্কিং স্পেস লাগবে প্রায় সাড়ে ১৪ একর। যেখানে টার্মিনাল করার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে এসব প্রাইভেট কার পার্কিংয়ের জায়গা কোথায় পাবে। আবার এসব প্রাইভেট গাড়ি আবার সারাদিন চলে না। অফিস কিংবা বাসায় বসে থাকে। এসব কার দিয়ে সারাদিনে প্রায় ৩৪০০ যাত্রী পরিবহন করা হয়। অথচ এই পরিমাণ যাত্রী পরিবহনের জন্য ১০৪টি বাস যথেষ্ট। বাস নামানো হলে সেইগুলি যাত্রী নামিয়ে দেয়ার পর অফিসের সামনে অলস বসে থাকবে না। যানজট সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে যারা প্রাইভেট কারে চলাচল করেন তারাও বাসে চলাচল করবেন। কারণ তখন যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংক পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই শহরে যেসব যানবাহন চলাচল করে তার মধ্যে একেকটি রিকশা সর্বোচ্চ দুইজন এবং গড়ে এক দশমিক জন যাত্রী পরিবহন করে। শহরের মোট যানবাহনের মধ্যে রিকসার পরিমাণ ৪৩ শতাংশ। সিএনজি ট্যাক্সির পরিমাণ ৩৯ শতাংশ, বাস এবং মিনিবাসের পরিমাণ মাত্র আট শতাংশ এবং প্রাইভেট কারের পরিমাণ ১০ শতাংশ। আরেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৩৩ জন যাত্রী পরিবহনের জন্য একটি বাস যথেষ্ট। একটি বাস সড়কের ৩৩ ফুট জায়গা দখল করে। এই পরিমাণ যাত্রী পরিবহন করতে তিন দশমিক দুইটি টেম্পো প্রয়োজন। তাতে জায়গা লাগে ৬৬ ফুট। সিএনজি ট্যাক্সি লাগে ১৫টি এবং জায়গা লাগে ৯৯ ফুট। রিকশা লাগে ২১ টি এবং জায়গা লাগে ১৩২ ফুট। ৩৩ জন যাত্রী পরিবহনে প্রাইভেট কার লাগে ২৭ দশমিক ৫টি। তাতে জায়গা প্রয়োজন হয় ৪৬২ ফুট।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, শহরের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট (বাস) মাত্র ১৭ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে ৭৫ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করে। প্রাইভেট কার ২৯ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহন করে পাঁচ শতাংশ। রিকসা এবং সিএনজি ট্যাক্সি ২৭ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করলেও যাত্রী পরিবহন করে মাত্র ছয় শতাংশ। টেম্পো এবং হিউম্যান হলার ১৩ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে ১৪ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করে।
সমস্যা :
বিশেষজ্ঞরা এই শহরে যানজটের বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। কারণসমূহ হলো : একই সড়কে যান্ত্রিক এবং অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। কোন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেই। যানবাহন চাহিদা ব্যবস্থাপনা নেই। পরিকল্পিত গণপরিবহণ ব্যবস্থা নেই। যথার্থ ফুটপাত নেই। ট্রাফিক সিগন্যাল নেই। কোনো নিয়মশৃঙ্খলা নেই। পার্কিংএর কোন ব্যবস্থা নেই। ট্রাফিক আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। জনগণেরও ট্রাফিক আইন মেনে চলার ইচ্ছে নেই।
সংকট উত্তরনের উপায় :
প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন। পরিকল্পনা বিভাগ নগরায়ন, সড়ক যানবাহন, পানিনিষ্কাশন, অন্যান্য) প্রতিষ্ঠা করা। জরুরি ভিত্তিতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করে সড়কের কার্যকারিতা বাড়ানো যায়। গণপরিবহনকে প্রাধান্য দিয়ে বাসের জন্য আলাদা লেন করা এবং গণপরিবহনের (বাস) সংখ্যা বাড়ানো। গণপরিবহনের জন্য ব্যবস্থাপনা করা। গণপরিবহন চালানোর জন্য কোম্পানি সৃষ্টি করা। ফুটপাত দখলমুক্ত করা। প্রশস্ত ফুটপাত নির্মাণ করা। সড়কের ওপর যত্রতত্র পার্কিং নিষিদ্ধ করা। ছোট যানবাহন চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা। ট্রাফিক আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ট্রাফিক সিগন্যাল সংস্কার করা। জংশন ডিজাইন সংস্কার করা। রিক্শা সাইকেলের জন্য আলাদা লেন করা। চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। জনসাধারণকে আইন মেনে চলার জন্য সচেতন করা। নগরের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা
প্রকৌশলী সুভাষ বড়য়া গণপরিবহন চাহিদা ব্যবস্থাপনার উপকার প্রসঙ্গে বলেন, তাতে সড়কে যানজট কমে যাবে। কারণ সড়কে সর্বমোট যানবাহন সংখ্যা কমে যাবে। সড়কব্যয়ও কমে যাবে। যেহেতু যানবাহন কমে যাবে তাই অতিরিক্ত সড়ক কিংবা ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে হবে না। তাতে সড়ক সংস্কারের প্রয়োজনও কম হবে। যাত্রীদের আর্থিক সাশ্রয় হবে। গাড়ির গতি বেড়ে যাবে। সময় বাঁচবে। পার্কিংএর জায়গা কম লাগবে। যানবাহনের সংখ্যা কমবে। ফলে পার্কিং এর জায়গা কম লাগবে এবং পার্কিং নির্মাণ ব্যয়ও কমে যাবে। নিরাপদ সড়ক হবে। যানবাহনের সংখ্যা কমলে দুর্ঘটনার সংখ্যাও কমে যাবে। বাঁচবে জ্বালানি খরচও। যানবাহনের সংখ্যা কমলে জনপ্রতি জ্বালানি ব্যবহার কমে যাবে। দক্ষতার সাথে কমিউনিটি পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে। যানবাহন কমলে জনপ্রতি গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণও কমে যাবে।
তিনি বিভিন্ন দেশের চৌরাস্তার জংশন ডিজাইনের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই কাজের জন্য বিশালাকারের ফ্লাইওভারের প্রয়োজন নেই। মোড়সমূহে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে সিম্পল বক্স কালভার্ট করে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে। অর্থাৎ একদিকের গাড়ি ওপর দিয়ে মোড় পার করে দিলেই আরেক পাশের গাড়ি নিচ দিয়ে নির্বিঘেœ চলে যাবে। তিনি বলেন, আমরা অনেক দিক দিয়ে উন্নতি করেছি। কিন্তু যানবাহন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে আছি

Share