নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » সেতার ওস্তাদের একুশে পদক লাভ চট্টগ্রামের জন্য গৌরব

কানাডার চিঠি

সেতার ওস্তাদের একুশে পদক লাভ চট্টগ্রামের জন্য গৌরব

এ বছর উচ্চাঙ্গ যন্ত্রসংগীতে সেতার ওস্তাদ মতিউল হক খানের একুশে পদক লাভ ওস্তাদজীকে গৌরবাণি¦ত করার পাশাপাশি চট্টগ্রামকেও গৌরবাণি¦ত করেছে। তার ছোঁয়া এসে লেগেছে সুদূর কানাডার টরন্টো মহানগরীতেও। ওস্তাদ মতিউল হক খানের জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হলেও তাঁর সঙ্গীত জীবনের প্রায় সমগ্র কর্মকাল কেটেছে চট্টগ্রামে। ষাটের দশকের শুরুর দিক হতে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের গড়ে ওঠার এক অবিচ্ছেদ্য সাক্ষী তিনি। সেই সময়কালে চট্টগ্রামে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও উচ্চাঙ্গ যন্ত্রসঙ্গীতের এক অভূতপূর্ব প্রবাহ সৃষ্টি হয় তাঁর অবদানের কারণে।
শুরুতে চট্টগ্রাম বেতারের সকল স্টুডিও-কাজ তার কালুরঘাটস্থ ব্রডকাস্টিং কেন্দ্রে হতো। সেইসময় হতেই মতিউল হক খান বেতারের স্টাফ সেতার যন্ত্রীপদে কাজ করছিলেন। ১৯৬১র শুরুর দিকে আগ্রাবাদে নবনির্মিত বেতার ভবন চালু হলে স্টুডিও এবং প্রশাসনিক দপ্তর কালুরঘাট হতে সেখানে চলে আসে। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক পদে আশরাফুজ্জামান খান আসীন হওয়ার পর চট্টগ্রামে নাট্যচর্চা, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, উচ্চাঙ্গ যন্ত্রসঙ্গীত চর্চার প্রতি চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র উৎসাহ প্রদান করতে থাকে।
সংস্কৃতি চর্চার অনুকূল আবহাওয়ায় সেই সময় নাট্যচর্চায় ডাক্তার শামসুল আযম-এর অগ্রণী ভূমিকায় নাট্যাঙ্গনে আজকের প্রখ্যাত অভিনেত্রী দিলারা জামান, মাহবুব হাসান, দিলারা আলো প্রমুখ অনেক নবীন নাট্যকর্মী নাট্যাঙ্গনে চলে আসেন।
সেতার ওস্তাদ মতিউল হক খান চট্টগ্রাম বেতারে অগ্রণী যন্ত্রশিল্পীরূপে কাজ করতে থাকেন। তাঁর পিতা সেতার ওস্তাদ ইরশাদ আলি খান এবং উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুরবাহার ওস্তাদ আয়াৎ আলি খান, ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান প্রমুখ বিখ্যাত ওস্তাদরা এসে চট্টগ্রাম বেতারে অনুষ্ঠান করলে চট্টগ্রামের শ্রোতাদের মধ্যে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহের সৃষ্টি হতে থাকে।
১৯৬৩-এ ওস্তাদ মতিউল হক খান সেতার শিখানোর জন্য তাঁর প্রথম শিষ্য গ্রহণ করলেন। তিনি হলেন, চট্টগ্রামের আলম পরিবারের কন্যা নার্গিসুল আলম। ওস্তাদ মতিউল হক খানের কাছ হতে আলাউদ্দিন ঘরাণার বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় কায়দায় সেতার বাদন নার্গিসুল আলম সোৎসাহে শিখতে থাকেন। অচিরেই তিনি সেতার বাদনে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। একবছর পরেই তিনি চট্টগ্রাম বেতারে সেতার প্রোগ্রাম করার জন্য আমন্ত্রিত হলেন।
নার্গিসুল আলমই চট্টগ্রাম বেতারে প্রথম নারী সেতারশিল্পী, যিনি কালক্রমে ঢাকা বেতার কেন্দ্রেও প্রথম “এ” ক্যাটাগরীতে (প্রথম শ্রেণীতে) অন্তর্ভুক্ত নারী সেতারশিল্পী হলেন। নব্বুইএর দশকে বেতারে একটি ১৫ মিনিট সেতার বাদন অনুষ্ঠান করার জন্য নার্গিসুর আলমকে তিন শত চল্লিশ টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো! তখনকার দিনে এটা কম টাকা নয়। নব্বুই দশকের মাঝামাঝিতে নার্গিসুল আলম সপরিবারে ইমিগ্রেশন নিয়ে কানাডায় চলে আসেন। ৭৫ বছর বয়সেও তিনি সঙ্গীত চর্চা করেন এবং টরন্টোতে বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে সেতার পরিবেশ করেন।
ওস্তাদ মতিউল হক খানের প্রেরণায় এবং নার্গিসুল আলমের আগ্রহে ষাটের দশকে আমি এবং আমার কতিপয় সংগীতাগ্রহী বন্ধু প্রতি মাসের মাঝামাঝিতে রাতে একটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসর বসানোর কর্মসূচী নিলাম। একরাতের আসরে একজন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী আসরের প্রধান শিল্পীরূপে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের যন্ত্রীরা বিনা পারিশ্রমিকে এই আসরগুলোতে তবলা ও যন্ত্র সঙ্গত করতেন। এঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিলেন তবলায় রফিক ফুলওয়ারি এবং পরবর্তীতে বিজন চৌধুরী। এই কর্মসূচীর মাধ্যমে প্রকাশ পেলেন বাঁশিতে ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম, উচ্চাঙ্গ কন্ঠ সংগীতে বেলা ইসলাম, সেতারে নার্গিসুল ইসলাম তো আছেনই, এবং আরও কয়েকজন।
এই ভাবে চট্টগ্রামে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চার এক চলমান ধারা সৃষ্টি হলো, যা ছিল অভূতপূর্ব। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বেতারে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠানগুলো সমৃদ্ধ হতে থাকলো আঞ্চলিক পরিচালক আশরাফুজ্জমান খানের সক্রিয় সহযোগিতায়। চট্টগ্রামে ষাটের দশকের এই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চার অভূতপূর্ব জাগরণের নেপথ্যে ছিল ওস্তাদ মতিউল হক খানের একনিষ্ঠ অনুপ্রেরণা। তাই, ওস্তাদ মতিউল হক খানের একুশে পদক লাভে ওস্তাদের পাশাপাশি চট্টগ্রামও কম গৌরবাণি¦ত নয়। চট্টগ্রাম ওস্তাদকে দিয়েছে, ওস্তাদও চট্টগ্রামকে দিয়েছেন।
লেখক : চট্টগ্রামের প্রবীণতম সাংবাদিক, প্রবাসী ।

Share