নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » মেমো নিয়ে মাথার ব্যামো

মেমো নিয়ে মাথার ব্যামো

ডেমোক্র্যাটরা মারাত্মক একটা ভুল করলো। তারা বোকার মত ফাঁদে পা দিয়ে দিলো। মেমোটা নিয়ে লাফালাফি না করলেই হতো। চুপচাপ থেকে সামান্য প্রতিবাদ করে ছাড় দিয়ে দিলেই হতো। সকলে মনে করতো, এটা ওয়াশিংটনের একটা নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। কেউ কিছু খেয়ালই করতো না, আর জনসাধারণের সেটা নিয়ে মাথা ব্যথাই হতো না। কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী রিপাবলিকান ‘তিল’ দেখিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ‘তাল, তাল’ বলে চিৎকার দিলো; আর ডেমোক্র্যাটরাও কোন অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করে ‘ও মাগো! তাল, তাল’ বলে ভিরমী খেয়ে গেলো।
এর কি প্রভাব হতে পারে বা না পারে, সুপ্রভাব না কুপ্রভাব – তারা সেটা নিয়ে ভালো মত চিন্তাই করলো না। তার উপরে আবার মিডিয়া লাফিয়েছে দশগুণ বেশী। কিছু কিছু রিপাবলিকান নেতা এবং সেই সঙ্গে কিছু রক্ষণশীল ডানপন্থী মিডিয়া তো এমন ফলাও করে প্রচার করেছে যে, তারা এটাকে ওয়াটারগেইট কেলেঙ্কারির সমান বলে তুলনা করছে।
মোদ্দা কথা হলো, পানি ঘোলা করা। যত বেশী ঘোলা করা যায়, তত ভালো। হয়তো বা সুযোগ পাওয়া যাবে কোনমতে বব ম্যুলারের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশানটা বন্ধ করে দেওয়ার। ধূর্ত ট্রাম্পের এটাই হলো স্ট্র্যাটেজি। তার বিপক্ষে একটা কিছু হতে থাকলে, সে সকলের আকর্ষণ অন্যদিকে পরিবর্তন করে দেয়। প্রয়োজনে সে একটা নতুন ক্রাইসিস সৃষ্টি করে, যাতে করে প্রথম ক্রাইসিসের দিক থেকে সকলের দৃষ্টি সরে যায়। সে এইভাবেই সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। যারা তার গোঁড়া সাপোর্টার, তারা সেগুলোকে মেনে নিচ্ছে, তাদের কাছে কোনকিছুই অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। তাদের কাছে ট্রাম্পের সাত খুন মাফ। তারা মুখ্য করে দেখছে যে, ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারনার সময় যা কিছু প্রতিজ্ঞা করেছিলো, সেগুলো তো সে করার চেষ্টা করছে।
বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের জন্য সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে পারছে না। আর একদল আছে, যারা তার ¯েœহভাজন হওয়ার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করে। তারাও, ট্রাম্পের কোন দোষ দেখে না। ২০১৫-১৬ সালের দিকে ট্রাম্প যখন রিপাবলিকান হিসাবে দাঁড়াবে ঘোষণা দিলো, তখন অনেক রিপাবলিকানই তার বিরোধিতা করেছিলো। হাউজ স্পীকার পল রায়ান তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু এখন সে ডিগবাজী খেয়ে, একটা পা-চাটা চামচা হয়ে গেছে। যারা ট্রাম্পের এই দৌরাত্ম্য, অশালীনতা, একনায়কোচিত মনোভাব ইত্যাদি একদমই সহ্য করতে পারছে না, তারা কিন্তু একে একে বলে দিচ্ছে আগামী নির্বাচনে আর দাঁড়াবে না। এখন পর্যন্ত ৩৭ জন রিপাবলিকান সিনেটর ও রিপ্রেজেন্টেটিভ সরে দাঁড়িয়েছে আগামী নির্বাচন থেকে।
যাক সেই মেমো-র কথায় ফিরে আসি। সেটা কি? কোত্থেকে এলো? কেন এর গুরুত্ব? সেটা প্রকাশে ক্ষতি কি? প্রথমত, এটা একটা শুধুমাত্র মেমো, মানে নিজস্ব পার্সোন্যাল নোট। এটা কোন ধরনের বিল নয়, কোন ধরনের মারাত্মক সিক্রেট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার রিপ্রেজেন্টেটিভ ডেভিন নুনেজের অধস্তন কর্মচারীরা এটা প্রস্তুত করেছিলো তার জন্য। উনি কিন্তু সিনেটর নন, হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভের সদস্য; এবং হাউজের ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান।
মেমোতে লিখা ছিলো, কীভাবে এফবিআই আর জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট ট্রাম্প ক্যাম্পেইনের সদস্যদের উপরে রাশিয়ার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করার সন্দেহে তাদের কথাবার্তা-ফোন সব রেকর্ড করতো। এখানে ঋওঝঅ বা ঋড়ৎবরমহ ওহঃবষষরমবহপব ঝঁৎাবরষষধহপব অপঃ ড়ভ ১৯৭৮ সম্পর্কে একটু বলি। এই অ্যাক্ট করা হয়েছিলো বিদেশী চর ও এজেন্টদের ধরার জন্য। কিন্তু চাইলেই হুট করে ঋওঝঅ-র দোহাই দিয়ে কারো উপরে সার্ভেইল্যান্স করা যাবে না। এর জন্য কয়েকজন স্পেশাল জজ নিয়ে কয়েকটা স্পেশাল ঋওঝঅ কোর্ট সৃষ্টি করা হয়েছিলো। যে কোন কারো উপরে সার্ভেইল্যান্স করতে হলে, বা ফোন-ট্যাপিং করতে হলে, এফবিআই, সিআইএ, জাস্টিস-ডিপার্টমেন্ট, সকলকেই আগে এসমস্ত কোর্টে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ দাখিল করতে হতো। জজ সবকিছু যাচাই করে, বিবেচনা করে অনুমতি দিলেই মাত্র তারা সেরকম সার্ভেইল্যান্স বা নজরদারী করতে পারতো।
প্রকৃত সত্য এই যে, ট্রাম্প-ক্যাম্পেইনের অনেকের সঙ্গেই রাশিয়ার দহরম-মহরম ছিলো। বন্ধুত্ব থাকা এক কথা, কিন্তু বন্ধুত্বের থেকে বেশী কিছু থাকা উচিৎ নয়। কিন্তু দেখা গেছে, দেশের স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে, অনেকেই ব্যক্তিগত ফায়দা বা রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের দিকেই বেশী মনোযোগ দিয়েছিলো। এগুলো হয়তো, আইনভঙ্গের কাছাকাছি গেলেও আইন ভাঙ্গে না, কিন্তু দেশের স্বার্থ তো আগে দেখতে হবে। এফবিআই-এর এজেন্টরা ঋওঝঅ ব্যবহার করে ট্রাম্প-ক্যাম্পেইনের এডভাইজার কার্টার পেইজের উপরে নজর রাখছিলো, কারণ তার সঙ্গে রাশিয়ান অনেকের প্রচুর যোগাযোগ রয়েছে।
এখানে এবার আর একটা নথিপত্রের উল্লেখ করতে হয়। সেটা হলো বৃটিশ স্পাই ক্রিস্টোফার স্টীল-এর ডোশিয়ার। সে হিলারী ক্লিন্টন নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের খরচে এই রিপোর্ট বা ডোশিয়ার তৈরী করেছিলো, যেটায় রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্প-ক্যাম্পেইনের সম্পর্ক উন্মোচন করে দিয়েছিলো। স্পেশাল কাউন্সেলার বা ইনভেস্টিগেটার বব ম্যুলার অন্যান্য হাজার হাজার ডকুমেন্টের সাথে, এই ডোশিয়ারও দেখেছেন এবং সমস্ত নথি-পত্র সবকিছুই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। ঋওঝঅ-র মাধ্যমে কার্টার পেইজের উপরে নজরদারীও করা হয়েছে এই স্টীল-ডোশিয়ারে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী।
রিপাবলিকানরা স্বাভাবিকভাবেই সেটা পছন্দ করছে না। ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান দলের টার্গেট হলো কীভাবে বব ম্যুলারের এই ইনভেস্টিগেশানকে বানচাল করে দেওয়া যায়। কীভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা যায় যে, এই তদন্ত ত্রুটিযুক্ত তারা সেটা করতেই বদ্ধপরিকর। এখানেই পানি ঘোলা করার ফন্দি। বর্তমানকালের রিপাবলিকানদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো দেশের আগে নিজেদের পার্টির স্বার্থ দেখা। তার জন্য যা কিছু করার দরকার, তাই করবে। নিজেদের আত্মসম্মান বিসর্জন দিবে, বিবেক-বর্জিত কাজ করবে, নোংরা কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি করবে।
এই মানসিকতা নিয়েই ডেভিন নুনেজের স্টাফরা তার নির্দেশেই মেমোটা তৈরী করেছে, যেখানে তারা ভ্রান্ত মতবাদ দিয়েছে যে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এবং এফবিআই সকলে মিলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কাজ করছে। মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে যে, বব ম্যুলার ডেমোক্র্যাটদের খরচে তৈরী ডোশিয়ার ব্যবহার করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো সবই বিভ্রান্তিমূলক। জনগণকে (এখানে পড়ুন – ট্রাম্পের গোঁড়া, অন্ধ সাপোর্টারদেরকে) উস্কে দেওয়ার জন্যই এগুলো প্রচার করা হচ্ছে। অথচ, জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের প্রধান – এটর্নী জেনারেল (জেফ সেশান) এবং ডেপুটি এটর্নী জেনারেল (রড রোজেনস্টেইন), দুজনই ট্রাম্পের মনোনীত।
এফবিআই থেকে জিম কমি-কে সরিয়ে ট্রাম্প-ই নিজের পছন্দের ক্রিস্টোফার রে-কে বসিয়েছে। এখন নিজেই নিজের মানুষদের বিরুদ্ধে, অ্যামেরিকার গণতান্ত্রিক ইন্সটিটিউশানের বিরুদ্ধে যা খুশী তাই বলে যাচ্ছে। রিপাবলিকানরা সেগুলো মেনেও নিচ্ছে। তাদের মাঝে কি একজনও বোধশক্তিসম্পন্ন ভালো মানুষ নাই?
তবে আমার মনে হয়, ডেমোক্র্যাটরা এটাকে পাত্তা না দিলেই সবচেয়ে ভালো হতো। মেমোর ব্যাপারটা তাহলে এত্ত বড় হয়ে উঠতোই না। তার উপরে তারা আর একটা ভুল করেছে, নিজেদের একটা নতুন মেমো বানিয়েছে এবং দাবী জানিয়েছে যে, সেটাকে প্রচার করতে হবে। সেটা করতে হলে, প্রথমে কংগ্রেস থেকে পাশ করিয়ে, তারপরে প্রেসিডেন্ট থেকে ক্লিয়ারেন্স নিতে হবে।
তারা এত বোকার মত কাজ করলো কেন? ট্রাম্পের মত চরিত্রের মানুষ কি সহজে সেটা ছাড় দিবে? তাদেরকে নাস্তানাবুদ করে তারপরেই না দিবে। আমার আফ্সোস, ডেমোক্র্যাটদের লীডারশিপে একটা বড়সড় ভ্যাকুয়াম চলছে এই মুহূর্তে। সেটা পূরণ না হলে, রিপাবলিকানরা সুযোগের ফায়দা লুটতেই থাকবে। ছোট মেমোকে মাথার ব্যামো করে তুলবে অহরহ।

লেখক পরিচিতি : আমেরিকার টলিডো, ওহাইও-তে বসবাসরত। ইঞ্জিনিয়ার, ইন্ডিপেন্ডেট-কনসালটেন্ট, ভ্রমণপিয়াসী।