স্বপ্নের দেশ জাপান – ছোটবেলা থেকে জাপানের কথা অনেক শুনেছিলাম। মনে মনে আশা ছিল, আহ্ যদি জাপান সফরে যেতে পারতাম। পরক্ষণে যেন স্বপ্নের মোহভঙ্গ হল। সুদূর জাপান সফরে যাওয়া- এত সহজ কথা নয়, মনে হয় যেন স্বপ্নের শহরে ঘুরপাক খাচ্ছি। বাস্তবে হয়তো কোনদিন জাপান দেখা হবে না। এটা ছিল শৈশবকালের কথা।
পেশাগত জীবনে এসেই জাপান দেশটির কথা লোকমুখে অনেক শুনেছি। জাপানিদের কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের কথা। আমরা বই পুস্তকে পড়েছি- জাপানি মানুষেরা কঠোর পরিশ্রম করে থাকেন। এক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে নারীরা অনেকদূর এগিয়ে। বিশ্ববিখ্যাত গাড়ির ব্র্যান্ড টয়োটা কোম্পানীর জন্মস্থান জাপানেই। আমাদের দেশে টয়োটা গাড়ীর চাহিদা অনেক অনেক বেশি। অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল কোন প্রোগ্রামের অজুহাতে হলেও জাপান সফরে যাব। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হল ২০১৭ সালের শেষের দিকে।
জাপানের পর্যটন নগরী ওকিনাওয়াতে দ্বিতীয় এশিয়া-প্যাসিফিক সোসাইটি অব থাইরয়েড সার্জারি সম্মেলন উদযাপন কমিটির আমন্ত্রণপত্র পেলাম ১২ জুলাই ২০১৭-এ। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা: মিকিউ সুজুকি যিনি ওকিনাওয়া টহরাবৎংরঃু ঙভ ঃযব জুঁশুঁং এর হেড এন্ড নেক সার্জারি বিভাগের প্রফেসর। তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত আমন্ত্রণ পত্রটি পেয়েই যোগাযোগ করলাম কংগ্রেসের এদেশীয় টুর অপারেটর এমাজিং ট্রাভেল এজেন্সির সাথে। নভেম্বরের ১-৩ তারিখ অনুষ্ঠেয় উক্ত কংগ্রেসে যোগদানের জন্য যাবতীয় প্রসেসিং সম্পন্ন করি। ২৯ অক্টোবর রবিবার নভো এয়ার-এর একটি ছোট ফ্লাইটে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ত্যাগ করি স্বপ্নের দেশ জাপানের উদ্দেশ্যে।
ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছি রাত ৮টায়। আমি চট্টগ্রাম থেকে একাই যোগদান করছি উক্ত সম্মেলনে। আন্তর্জাতিক লাউন্সে পরিচিত কাউকে দেখলাম না। হঠাৎ চোখে পড়ল বিশিষ্ট নাক, কান , গলা বিশেষজ্ঞ সার্জন আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই ডা: দেওয়ান মাহমুদ হাসানকে, সাথে দেখা হয়ে যায় ডা: সোবহান, সিনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ সিরাজুল ইসলাম এর সাথে। আমি মনে শক্তি পেলাম আপনজনদের দেখে। আমরা বাংলাদেশ থেকে ২৯ জন নাক, কান ,গলা বিশেষজ্ঞ ও সার্জন যোগদান করছি উক্ত সম্মেলনে। ঢাকা ইএনটি ইনষ্টিটিউট এর পরিচালক প্রফেসর ডা: মাহমুদুল হাসান, হলিফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নাক, কান, গলা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা: খোরশেদ আলম মজুমদার, শহীদ সোহরাওয়ার্দি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নাক , কান, গলা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা: খবির উদ্দিন আহমদ, ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নাক কান গলা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা: জিল্লুর রহমান, পিজি হাসপাতালের প্রফেসর ডা: মঞ্জুরুল আলম, পিজি হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা: মো. মুসলেহ্উদ্দিন, প্রফেসর ডা: মাসুক উদ্দিন, ডা: আবদুর রহমান, সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা: মুজিবুল হক, সহযোগী অধ্যাপক ডা: দেবেষ চন্দ্র তালুকদার, সহকারী অধ্যাপক ডা: আসাদুজ্জামানসহ ঢাকার খ্যাতনামা ইএনটি বিশেষজ্ঞবৃন্দ উক্ত সম্মেলনে যোগদান করছেন।
আমাদের ফ্লাইট রাত ১১.৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স যোগে। এরি মধ্যে সব প্রতিনিধি এসে পৌঁছে গেছেন। বোর্ডিং শুরু, ইমিগ্রেশনের কাজটাও প্রায় শেষ। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স এর একটা ফ্লাইট যোগে যাওয়ার জন্য সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়ালাম। হঠাৎ পিজি হাসপাতালে ট্রেনিং করার সময়কার আমার সিনিয়র সহকর্মী ডা: মাহমুদুল হক ভাইয়ের সাথে দেখা। ওনার বাড়ি জামালপুর। খুব ভাল লাগল ওনাকে পেয়ে। পুরানো অনেক দিনের স্মৃতি ভেসে আসল আমাদের স্মৃতিপটে। আমরা সবাই যার যার সিটে বসে পড়লাম।
জাপানের রাজধানী বিশ্বের সবচে’ জনবহুল নগরী টোকিওর উদ্দেশ্যে আমাদের উড়াল যাত্রা। দুরু দুরু বুকে সময় গুণছি- সিঙ্গাপুর এর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় সিঙ্গাপুর চাংগি বিমানবন্দরে অবতরণ করল উড়োজাহাজটি। এই বিমান বন্দরে ৩ঘন্টা ২০মিনিট ট্রানজিট শেষ হওয়ার পর আবারো সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের আরেকটি ফ্লাইটে আমাদেরকে উঠানো হল। সত্যি কি আমরা জাপান যাচ্ছি? জাপানের অতি পরিশ্রমী মানুষদের সাথে দেখা মিলবে কি যাদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে সাজিয়ে তুলেছে শৈল্পিক দেশ জাপানকে। বৈশ্বিক শহরে যে দেশের নাগরিকদের মর্যাদা অনেক সমুন্নত। জাপানের প্রতিটি ভবনের ইট- সুড়কির গায়ে লেপ্টে আছে অতি পরিশ্রমী জাপানিদের ঘর্মাক্ত ছোঁয়া।
এসব কথা আওড়াতে আওড়াতে যেন চোখের সামনে স্বপ্নবিলাস ছুঁয়ে যায়। কখন যে টোকিও নারিতা এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছলাম টেরই পেলাম না। উড়োজাহাজটি বিমানবন্দর স্পর্শ হওয়া মাত্রই যেন স্বপ্নভঙ্গ হল আমাদের। চারিদিকে যেন চোখে সর্ষেফুল দেখতে পাচ্ছি। উন্নত অথচ আধুনিক একটি শহরে এসে নিজেকে বড়োই গৌরবাণি¦ত মনে হল। আমাদের গাইড একজন জাপানিজ মহিলা, মধ্যবয়সী, বেশ চটপটে, স্মার্ট, ইংরেজী বলতে পারেন ভালো। ফাঁকে আমি ৩০০ ইউএস ডলার ভেঙ্গে জাপানি মুদ্রায় ক্যাশ করলাম। এর আগে ইমিগ্রেশনসহ যাবতীয় প্রসেসিং শেষ করি।
নারিতা এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি টোকিও-র কেন্দ্রস্থল আকাসাকা নামক স্থানে অবস্থিত মতি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে সবাই ডিনারটা সারি। মতি রেস্টুরেন্ট থেকে সরাসরি আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেল ধশধংধশধ বীপবষ ঞড়শুড় যড়ঃবষ-এ পৌঁছি। আমাদের রুম নং ৪২৯। রুমমেট ডা. মুজিবুল হক। আমাদের সিনিয়র ভাই, অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি- নোয়াখালির নামকরা ইএনটি সার্জন।
রাত হয়ে যাওয়াতে কেউ আর বেরুইনি। সবাই ঘুমের রাজ্যে অন্য রকম এক আনন্দ বিভোর নিয়ে মিশে যায় বর্ণময় স্বপ্নের দেশে। পরের দিন ৩১ অক্টোবর শিডিউল অনুযায়ী রাজধানী টোকিওর বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থানে যাওয়ার প্রোগ্রাম রয়েছে । আগামী পর্বে টোকিওর ঐতিহাসিক স্থানসমূহ নিয়ে আলোচনার আশা রাখি।

লেখক : সভাপতি, রাউজান ক্লাব জুনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি), জেনারেল হাসপাতাল, রাঙামাটি ফৎড়সধৎভধৎড়ড়শ@মসধরষ.পড়স