নীড়পাতা » প্রথম পাতা » মামলা আতঙ্কে বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীরা

মামলা আতঙ্কে বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীরা

নাজিম মুহাম্মদ

মামলা আতংকে ঝিমিয়ে পড়েছে নগর বিএনপি জামায়াতের মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন। একশ’র বেশি মামলায় চার বছর ধরে আদালতে হাজিরা দিতে দিতে অনেকটা ক্লান্ত দুই দলের হাজারো নেতাকর্র্মী। ১২৭ মামলার মধ্যে দ্রুত বিচার আইনে দায়ের করা ১৯টি মামলা রয়েছে। যার কারণে দুর্নীতির মামলায় দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে গেলেও মাঠে নামতে আগ্রহী হননি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা, বোমা বিস্ফোরণ, গাড়ি পোড়ানো, পুলিশের ওপর হামলা ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের অভিযোগ এনে নগরীর ষোল থানায় ১২৫টি মামলা দায়ের করে পুলিশ। এর মধ্যে ২০১০ থেকে ২০১১ সালে পাঁচটি, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০টি, নভেম্বর মাসে পাঁচটি, ডিসেম্বর মাসে ১১টি মামলা দায়ের করা হয় নগরীর ষোল থানায়। পরবর্তীতে সহিংসতা বাড়লে বেড়ে যায় মামলার সংখ্যা। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে তিনটি, ফেব্রুয়ারিতে ১৭টি, মার্চ মাসে ১৮টি, এপ্রিল মাসে নয়টি, মে মাসে ছয়টি, জুলাইয়ে ১১টি, আগস্ট মাসে সাতটি, সেপ্টেম্বরে একটি, অক্টোবরে ১৪টি, নভেম্বরে ২৬টি, ডিসেম্বরে ৪২টি, ২০১৪ সালে জানুয়ারিতে ১১টি মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের হয়েছে ১৯টি। দুর্নীতির অপরাধে বিএনপি চেয়ারসপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার দিন (গত ৮ ফ্রেব্রুয়ারি) দায়ের করা দুটিসহ চার বছরে নগরীর ষোল থানায় দায়ের করা মামলা ১২৭টি। এরমধ্যে জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৮০টি, বাকী ৪৯টি মামলার আসামি নগর বিএনপির নেতাকর্মীরা। দায়ের করা অধিকাংশ মামলায় নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, নগর বিএনপির বর্তমান সভাপতি ডা. মো. শাহাদাত হোসেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য গোলাম আকবর খোন্দকার, নগর বিএনপির সেক্রেটারি আবুর হাশেম বক্বর, উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি আসলাম চৌধুরী, জামায়াত নেতা শামসুল ইসলাম, জামায়াতের সাবেক সাংসদ শাহজাহান চৌধুরীসহ ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা আসামি রয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা অধিকাংশ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। কয়েকটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে পাঠানো হয়েছে ১৬টি চাঞ্চল্যকর মামলা। জামায়াত বিএনপির সহিংসতার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো চাঞ্চল্যকর মামলার মধ্যে রয়েছে স্কুলছাত্রী অন্তু বড়–য়ার ওপর ককটেল হামলা চালিয়ে চোখে গুরুতর আঘাত করা, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ককটেল বিস্ফোরণ, ডবলমুরিং থানায় সংঘর্ষের তিনজন নিহত হওয়া ও খুলশী থানায় মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীর বাসভবন থেকে এসিড উদ্ধারে দায়ের করা মামলা।
তিন বছরেও মেলেনি ৪ শ আসামির ঠিকানা :
নগর বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার চার শতাধিক আসামির সঠিক নাম ঠিকানা তিন বছরেও মেলাতে পারেনি পুলিশ। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি নগরীর কাজীর দেউড়িতে ২০ দলীয় জোটের সমাবেশে পুলিশের সাথে বিএনপি জামায়াত নেতাকর্মীদের সংর্ঘষের ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা এ মামলায় ঘটনাস্থল থেকে ৩০১ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। অধিকাংশ আসামির ঠিকানা দেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় সঠিক ঠিকানা মেলাতে পারেনি পুলিশ।
২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি নগর বিএনপি কার্যালয়ের নাসিমন ভবনের সামনে নুর আহমদ সড়কে ২০ দলীয় জোটের সমাবেশ চলছিল। সমাবেশের ৪০০ গজ দূরে কাজীর দেউড়ি এলাকায় গণতন্ত্রের প্রতীকী কফিন বানিয়ে শিবিরের কর্মীরা মিছিল করছিলেন। সেখানে পুলিশের ওপর একটি ককটেল নিক্ষেপ করেন শিবিরের কর্মীরা। এরপর পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে উত্তর জেলা বিএনপির আহবায়ক আসলাম চৌধুরী, এনামুলক হকসহ ৩০১ জনকে গ্রেপ্তার করে।
এ ঘটনায় ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি রাতে কোতোয়ালী থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) একরাম উল্লাহ বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী ও বিস্ফোরক আইনে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি হিসাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ, নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন, উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি আসলাম চৌধুরী, জামায়াতের সাবেক সাংসদ শাহজাহান চৌধুরী, নগর বিএনপি নেতা আবু সুফিয়ান, সামশুল আলম, সাবেক সাংসদ জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, নগর শিবিরের সাবেক সভাপতি আ স ম মাসরুর হোসাইন যেমন রয়েছেন তেমনি নীলফামারি জেলার সৈয়দপুর থানার প্রত্যন্ত শহীদপুর গ্রামের সাজু কিংবা পটুয়াখালির সাদ্দাম নামে আসামিও রয়েছেন। এজাহারভুক্ত ৩৮৯ ছাড়াও আরো অনেকে এ ঘটনায় জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে।
কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (ওসি) মো. জসিম উদ্দিন জানান, মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন ৩৮৯ জন। এদের মধ্যে ৩০১ জনকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনেকে পলাতক ছিলেন। পরবর্তীতে আরো বেশ কিছু আসামি গ্রেপ্তার করা হয়। আসামির সংখ্যা বেশি এবং তাদের ঠিকানা দেশের বিভিন্নস্থানে হওয়ায় সঠিক নাম ঠিকানা মেলাতে সময় লাগছে। তবে মামলাটির তদন্তকাজ অনেকটা গুছিয়ে আনা হয়েছে। শীঘ্রই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।
জানা যায়, মামলার এজাহাভুক্ত ৩৮৯ আসামির মধ্যে হাতেগোণা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ আসামির বাড়ি দেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত উপজেলায়। এদের মধ্যে কারো বাড়ি ময়মনসিংহ, বাঁশখালী, আবার কারো বাড়ি নোয়াখালি আর ঝালকাঠির নলছিটিতে। মামলাটি দায়েরের পর তিন বছরে তিনজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন কোতোয়ালী থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) শামসুল ইসলাম।