আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

মুর্শিদকুলি খান, যাঁর নামে মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদকুলি খান দিল্লীর স¤্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে বাংলাসহ ভারতের পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে আনেন। তিনি এ অঞ্চলে সুন্দর ও গোছানো শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা তা অনুকরণ, অনুসরণ করে। পাকিস্তান এবং পরবর্তী স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আমলেও মুর্শিদকুলি খান প্রবর্তিত এই শাসন ব্যবস্থার নিয়ম নীতি একদম উঠে গেছে বলা যাবে না। তাকে নবাবী আমলের স্থপতি বলা হয়ে থাকে।
মূলতঃ মুর্শিদকুলি খান ছিলেন একজন ব্রাক্ষণ পরিবারের সন্তান। পারস্যবাসী হাজী শফি ইস্পাহানী তাকে ক্রয় করে নিজ পুত্রের মত লালন পালন করেন। তার নাম দেন মুহাম্মদ হাদী। বাদশা আওরঙ্গজেব তার শাসন ব্যবস্থায় অভিভূত হয়ে তাকে মুর্শিদকুলি খান উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর উপাধি অনুসারে মাখসুসাবাদের (মুর্শিদাবাদের পূর্ব নাম) মুর্শিদাবাদ রাখতেও অনুমতি দেন স¤্রাট।
হাজী শফি ইস্পাহানী ছিলেন শিয়া। তিনি মোঘলদের অধীনে চাকুরী করতেন। কিন্তু ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে হাজী শফি ইস্পাহনী মোঘলদের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে পারস্যে চলে যান। মুহাম্মদ হাদীও ও তাঁর সাথে পারস্যে গিয়েছিলেন। সেখানে অবস্থান কালে পারস্য জাতির বুদ্ধিমত্তা, জীবন ব্যবস্থা ও নানাবিধ আচরণ এবং রুচির সাথে পরিচিত হন। এতে মুর্শিদকুলি খান শিয়া আকিদার বিশ্বাসের দিকে কিছুটা ধাবিত হয়েছিলেন। হাজী শফীর মৃত্যুর পরে, মুহাম্মদ হাদী তথা মুর্শিদকুলি খান ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষে ফিরে আসেন। তিনি দাক্ষিণাত্যে গমন করে মোঘল দেওয়ান হাজী আবদুল্লাহ খুরাসানির অধীনে চাকুরী লাভ করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে মুহাম্মদ হাদীর অসাধারণ কর্মদক্ষতার কথা ছড়িয়ে পড়ে। মুহাম্মদ হাদীর বড় সৌভাগ্য যে, তাঁর অসাধারণ যোগ্যতার কথা বাদশাহ আওরঙ্গজেবের নজরে আসে। ফলে সম্্রাট তাঁকে নিজের অধীনে রাজস্ব বিভাগে চাকুরী প্রদান করেন।

মুহাম্মদ হাদী প্রথমে দেওয়ান এবং পরে ইয়েল কোন্দলের ফৌজদার নিযুক্ত হন। এই পদে থাকাকালীন তাঁর যোগ্যতার কারনে তাঁর প্রতি স¤্রাটের নেক নজর আরও বেড়ে যায়। ঐতিহাসিক গণের মতে মুহাম্মদ হাদী যে একজন বিজ্ঞ, সৎ ও আনুগত্যশীল কর্মচারী তা স¤্রাটের দক্ষিণাত্যের যুদ্ধ বিগ্রহের সময় স্পষ্ট হয়ে উঠে।

এদিকে ভারতবর্ষের পূর্বাংশে বাংলার দিওয়ানীতে নিযুক্তির জন্য একজন দক্ষ কর্মচারীর প্রয়োজন দেখা দিলে স্বভাবতই মুহাম্মদ হাদী এ পদে মনোনয়ন লাভ করেন। ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে এ পদটি ছিল খুবই স্পর্শকাতর। যেহেতু এ পদাধিকারের দায়িত্ব হল ভূমির রাজস্ব আদায়। আয় ব্যয়ের হিসাব রক্ষণ, প্রসাসনিক কর্মচারীদের বেতন প্রদান, জায়গীর তথা হস্তান্তিরত ভূমি সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিষয়াদি পরিচালনা,ধর্মীয় উদ্দেশ্যে প্রদত্ত সম্পত্তি বা অর্থের তত্ত্বাবধান, বিভিন্ন বিভাগে অর্থ বণ্টন, অধীনস্থ কর্মচারীদের কার্যকলাপের প্রতিবেদন পেশ, কৃষির উন্নতিকল্পে উৎসাহ প্রদান, রাষ্ট্রীয় তহবিলের প্রতি কড়া নজর রাখা, যথাযথ অনুমতি ছাড়া তহবিল থেকে কোন বণ্টন না দেওয়া এবং কৃষকদের নিকট হতে অবৈধ অর্থ আদায় বন্ধ করা। অর্থাৎ প্রদেশের সরকারী রাজস্ব সংক্রান্ত সকল বিষয়ের উপরে প্রাদেশিক দিওয়ানের কর্তব্য বিস্তৃত ছিল।

বাংলার দিওয়ান নিযুক্ত হওয়ার পর মুহাম্মদ হাদী (যিনি পরবর্তীতে কারতালার খান উপাধি লাভ করেছিলেন) তৎকালীন বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীর নগরে (বর্তমানে ঢাকা) পৌঁছান। এই সময় প্রাদেশিক সুবেদার ছিলেন শাহজাদা মুহাম্মদ আজিম উদ্দীন । মুহাম্মদ হাদী শাহজাদার সাথে স্বাক্ষাত করে দিওয়ানি সংক্রান্ত বিষয়ে ওয়াকিবহাল হন। রাজস্ব বিভাগীয় সকল কর্মচারীদেরকে প্রত্যক্ষভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শাহজাদার হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা ছিল মুহাম্মদ হাদীর গৃহীত প্রথম পদক্ষেপ। তিনি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির জন্য দুই রকম নীতি গ্রহণ করেন। প্রথমত বাংলায় রাজস্বের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগত হতে প্রতিটি পরগনায় কর্মচারী প্রেরণ করে যাবতীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করেন। দ্বিতীয়ত সরকারী বিষয়গুলোতে ব্যয় সংকোচন-এর প্রতি নজর দেন।
স¤্রাট আওরঙ্গজেবের অনুমতি নিয়ে রাজকীয় কর্মচারীদের বদলীকরে নানাভাবে বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে শুরু করেন। তিনি একচেটিয়া কারবার বন্ধ করে দেন। মুহাম্মদ হাদীর সংস্কারের ফলে প্রদেশের রাজস্বখাতে আয় ধারণাতীত ভাবে বেড়ে যায়। এতে প্রথম বছর মুহাম্মদ হাদী এক কোটি টাকা দিল্লীর রাজস্ব তহবিলে পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই বিপুল অর্থ প্রেরণে স¤্রাট আওরঙ্গজেব খুশি হন, কিন্তু বাংলার অনেকেই তাঁর শত্রুতে পরিণত হয়। তন্মধ্যে তাঁর প্রধান শত্রুতে পরিণত হন বাংলার সুবেদার স্বয়ং শাহজাদা মুহাম্মদ আজিম উদ্দীন। শাহজাদা আজিম উদ্দীন বাংলার সুবাদারের পদ গ্রহণ করে প্রদেশের শাসনকার্যের ব্যাপারে তাঁর অবাধ কর্তৃত্ব বিস্তার করেছিলেন। কিন্তু মুহাম্মদ হাদীর কারণে শাহজাদার কর্তৃত্ব হ্রাস পেতে থাকে। ফলে, মুহাম্মদ হাদীর সাথে শাহজাদার বিরোধ শুরু হয় এবং তা আস্তে আস্তে মারাত্মক আকার ধারণ করে। ঐতিহাসিকগণের মতে শাহজাদা কর্তৃক প্ররোচিত মুহাম্মদ হাদীর প্রাণনাশের প্রচেষ্টার কথাও রয়েছে।

উল্লেখ্য, রাজস্বের উপর হতে শাহজাদার কর্তৃত্ব চলে যাওয়ায়, দেওয়ান মুহাম্মদ হাদীর প্রতি রাজকীয় অনুগ্রহ বৃদ্ধির সাথে তার শত্রুর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। স¤্রাটের ভয়ে শাহজাদা হাদীর প্রাণনাশ না করে তাকে দমন করার জন্য ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেন। এতে অশ্বারোহী বাহিনীর অধ্যক্ষ আবদুল ওয়াহিদকে সৈন্যদের বকেয়া বেতন আদায় করার জন্য দিওয়ানের কাছে পাঠিয়ে তাকে ঘেরাও করার উষ্কানী দেন। উদ্দেশ্য, প্রাদেশিক রাজধানীতে বিশৃংখলার পরিবেশ তথা দাঙ্গার সুযোগে দেওয়ানকে হত্যা করা। আবদুল ওয়াহিদ এবং তার বাহিনী দেওয়ান মুহাম্মদ হাদীকে ঘেরাও করে এবং বেতনের দাবীতে নানা রকম অরাজকতা শুরু করে।

ঐতিহাসিকগণের মতে ঢাকার রাজপথে সংঘঠিত ঘটনাটি ছিল একটি নাটকীয় দৃশ্য। এই দৃশ্যই বাংলার মুসলমানদের রাজধানী হিসাবে ঢাকাকে শেষবারের মত পরিত্যাগ করতে বাধ্য করে। ষড়যন্ত্রে ব্যর্থ হলে শাহজাদা ঘাবড়িয়ে গেলেন। এ ঘটনার পর দিওয়ান মুহাম্মদ হাদি স¤্রাটের নিকট লিখিত প্রতিবেদন পাঠান। নিজের নিরাপত্তার জন্য সুবেদার শাহজাদা আজিম উদ্দিনের নিকট থেকে দূরে থাকা সমীচীন মনে করেন। স¤্রাট বাংলার জমিদার ও কানুনগোদের সাথে বিশদ আলোচনা সাপেক্ষে ঢাকা হতে দিওয়ানের কার্যালয় মাখসুসাবাদে (মুর্শিদাবাদে) স্থানান্তর করার অনুমতি দেন। এ স্থানটি প্রকৃতপক্ষে সমস্ত বাংলার যোগাযোগ রক্ষায় উপযোগী ছিল। উপরন্তু মুহাম্মদ হাদীকে মুর্শিদাবাদেও ফৌজদারের দায়িত্ব দেওয়ার পর তিনি ঢাকা অপেক্ষা এখানে নিজেকে অধিকতর শক্তিশালী ও নিরাপদ মনে করেন।
অপরদিকে, মুহাম্মদ হাদীর প্রতি অবিচারের আশ্রয় নেওয়ায় বাদশাহ আওরঙ্গজেব শাহজাদা আজিম উদ্দীনের প্রতি হুশিয়ারী দিয়ে কড়া ভাষায় চিঠি দেন এবং শাহজাদাকে বাংলা থেকে বিহারে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে শাহজাদা তার পুত্র ফারখ সিয়ারকে ঢাকায় রেখে নিজ পরিবারসহ বিহারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং পাটনাকে বসবাসের উপযোগী করে সেখানে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেন। তিঁনি এখানে একটি শক্তিশালী দুর্গও নির্মাণ করেন।
(আগামীবারে সমাপ্ত)