সেকান্দর আলম বাবর বোয়ালখালী

শারীরিকভাবে অনেকটা অক্ষম সে। হাঁটতে গেলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেলেদুলে হাঁটতে হয়। হাতপা স্বাভাবিক লোকের মতো সচল নয়। স্পষ্ট কথাও বলতে পারে না। এতকিছুর পর জাতীয় মানুষগুলো যেখানে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেয়, সেখানে উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামের গিয়াসু বেছে নিয়েছে কঠিন কাজ রিকশা চালনা। সে কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করবেএমনই পণ। ভিক্ষাবৃত্তি তার কাছে লজ্জার। সে মনে করে, ভিক্ষার পথ বেছে নিলে কেউ ভিক্ষুককে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে না।
উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামের হাজীপাড়ার মো. ফয়েজ (ফোরক) আহমদের তিনপুত্র পাঁচ কন্যা সন্তানের একজন গিয়াসু। জন্মগতভাবেই সে প্রতিবন্ধী। পারিবারিক আর সামাজিক নানা অবহেলার শিকার মানুষটির গড়ে উঠা সুখকর নয়। শৈশব থেকে বঞ্চনার করাল গ্রাসে আক্রান্ত গিয়াসু বাবামার অসচেনতা আর সমাজের অবহেলায় স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি। তবে সে পরিবেশ থেকে শিখতে চেষ্টা করেছে। শারীরিকভাবে অক্ষম হলেও সে সব বুঝতে পারে। বুঝার জন্যই তার কাছে ভিক্ষা করা লজ্জার। সে কাজ করতে চায়।
শেষ পর্যন্ত ঠিক করেছে রিকশা চালিয়ে আয়রোজগার করবে। বছর দশেক আগে কাজ শুরু করে, এখনও পথেই আছে। এরই মধ্যে সে বিয়েও করেছে। আছে উর্মি আকতার আর সালমা আকতার নামে দুই কন্যা। উর্মি স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পরে। শাবানার এখনও স্কুলের ভর্তির সময় হয়নি। স্ত্রী খুকিকে নিয়ে তার অহংকারের শেষ নেই। কথা হয় তার সাথেআধাভাঙ্গা কন্ঠে বলে, আমি বেশ সুখি। কাজ করে ভাত খাই। অনেকে রিকশায় চড়ে খুশি হয়ে টাকা বেশি দেয়, অনেকে আবার ন্যায্য দামও দিতে চায় না। আমি প্রতিদিন সব টাকা নিয়ে স্ত্রী খুকির হাতে দিই। সে সংসারের খরচ চালায়। আমাকে নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। সে বলে, ইদানিং আমি কিছু টাকা যেন হাতে রেখে দিই। কারণ আমি ঘরে গেলেই মেয়ে দুটি আচার, চকলেট, চিপস্্, কেক চায়, না নিলে আমার সাথে কথা বলে না। তাই টাকা বাঁচিয়ে তাদের জন্য এসব কিনি। সে আরো বলে, আমি যে রিকশাটি চালাইসেটি যথাসময়ে মেরামত করতে পারি না। দৈনিক আয় হয় ২শ থেকে ৩শ টাকা। তারপরও চলে যায়। কিছুদিন মোটর রিকশাভাড়া করে চালিয়েছিলাম, গত কিছুদিন আগে মালিক তা আমার থেকে নিয়ে ফেলে। রিকশা চালাতে আমার বেশ কষ্ট হয়, তারপরও মেনে নিয়েছি। হাফ পেডেল মেরে রিকশা চালানো খুবই কঠিন। আমাকে তা করতে হয়। অনেকে আবার আমার রিকশায় উঠতে চায় না। কারণ তারা আমার চালানো রিক্সি মনে করে। সে গর্ব করে বলে, আল্লাহর রহমতে আমার রিকশায় পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা হয়নি। আল্লাহই আমার সহায়। তার স্বপ্ন কি জানতে চাইলে বলে, স্বপ্ন বেশি না। একটি মোটরচালিত রিকশা কিনতে পারলেই খুশি হবো। অনেক চেষ্টা করেছি, টাকা জমাতে পারছি না। খরচ হয়ে যায়।
এসময় সে বলে, সাংবাদিক ভাই এসব পেপারে লিখলে কী কেউ আমাকে একটি মোটর রিকশা দিবে ? এছাড়া মেয়ে দুটোকে লেখাপড়া করার স্বপ্নও আছে তার। সরকারিভাবে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাকে প্রতিবন্ধী ভাতা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেয়া হয় বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় চেয়ারম্যান এস এম জসিম উদ্দিন। ভবিষ্যতে তাকে ঘরও বেধে দেয়ার কথা বলেন তিনি