নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » সূরা কাহফের ফজিলত পটভূমি ও ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার তাৎপর্য

সূরা কাহফের ফজিলত পটভূমি ও ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার তাৎপর্য

অত্যাচারী বাদশাহ কাইসার দাকইয়াসের (খৃঃ ২৪৯-২৫১) সময় যখন ঈসা নবীর (আঃ) অনুসারীগণ নিপীড়নের শিকার হন, তখন ৭ জন (মতান্তর জনিত) ধর্মপ্রাণ যুবক গুহায় আশ্রয় নেন। এরপর প্রায় তিনশত বছর পর্যন্ত তারা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকেন। ফলে, ৫০০ খৃষ্টাব্দে তাদের জাগ্রত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ৫৭০ খৃষ্টাব্দে আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তার ২০ বছর পূর্বে আসহাবে কাহাফ নিদ্রা থেকে জাগ্রত হন। পবিত্র সূরা কাহাফে মানবজাতির শিক্ষাপ্রদ উক্ত কাহিনীটি অপরূপ সুন্দর ভাষায় বর্নিত হয়েছে। ইসলামের আলোকধারার গত সংখ্যায় আমরা এ বিষয়ে আলোকপাত করেছি। আজ প্রসঙ্গক্রমে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সূরা আল কাহাফের তিলাওয়াত ও মর্মবাণী অনুধাবনের দৈনন্দিন অশেষ উপকারিতার কথা তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
হযরত আনাস (রাদি.) বর্ণিত রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ (স:) বলেন, সূরা কাহ্ফ সম্পূর্ণটুকু এক সময়ে নাযিল হয়েছে এবং সত্তুর হাজার ফেরেস্তা এর সঙ্গে আগমন করেছেন।’-এ বর্ণনাটির মধ্য দিয়ে সূরাটির মাহাতœ্য সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। মুসনাদে আহমদে হযরত সাহল ইবনে মু’আয়ের রেওয়ায়েতে আছে যে, আঁ-হযরত (স:) ইরশাদ করেন: যে ব্যক্তি সূরা কাহ্ফের প্রথম ও শেষ আয়াতগুলো পাঠ করে তার জন্য তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটি নূর হয়ে যায়। এবং যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ সূরা পাঠ করে তার জন্য যমীন থেকে আসমান পর্যন্ত নূর হয়ে যায়।
কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি জুমাবারে সূরা কাহফ তিলাওয়াত করে তার পা থেকে আকাশের উচ্চতা পর্যন্ত নূর হয়ে যায়- যা কিয়ামতের দিন আলো দেবে এবং বিগত জুমা থেকে এ জুমা পর্যন্ত তার সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। (ইবনে কাসীর)।
হাফেজ জিয়া মুকাদ্দাসী ‘মুখতারাহু’ গ্রন্থে হযরত আলীর (রাদিঃ) উদ্ধৃতিতে রাসুলুল্লাহর (সঃ) হাদীস বর্ণনা করেন যে, যে ব্যক্তি জুমার দিন এ সূরা পাঠ করবে সে আট দিন পর্যন্ত সর্বপ্রকার ফেৎনা থেকে মুক্ত থাকবে। যদি দাজ্জাল বের হয় তার ফেৎনা থেকেও।’ সূরা কাহ্ফ পবিত্র কুরআনুল করীমের ১৮তম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ১১০ এবং রুকু ১২টি। এটি সেসব সূরাসমুহের অন্তর্ভূক্ত যেগুলো হযরত রসূলুল্লাহর (সঃ) মক্কা জীবনের তৃতীয় অধ্যায়ে নাযিল হয়েছিল।
এ সময়ে কাফিরগণ ইসলাম ও তার নবীর (সঃ) উপর পরিহাস ও বিদ্রূপের মাত্রা দারুণভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল। মক্কী জীবনের এ তৃতীয় অধ্যায় প্রায় ৫ম নব্বী সনের প্রথম হতে ১০ম নব্বী সন পর্যন্ত চলে।
বিখ্যাত সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রাদিঃ) বর্ণনা করেন যখন মক্কায় আঁ-হযরতের (স.) নবুয়তের চর্চা শুরু হয় এবং কুরাইশরা তাতে বিব্রত বোধ করতে থাকে, তখন তারা নজর ইবনে হারেস ও ওক্বা ইবনে আবী মুয়ীতকে মদীনার ইহুদী পন্ডিতদের কাছে প্রেরণ করে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সম্বন্ধে তারা কি বলে, জানার জন্য।
ইহুদী পন্ডিতরা তাদেরকে বলে দেয় যে, তোমরা তাকে তিনটি প্রশ্ন কর। তিনি এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলে বুঝে নেবে যে, তিনি আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ। অন্যথায় বুঝবে, তিনি একজন বাগাড়ম্বরকারী ব্যক্তি, কোন প্রেরিত পুরুষ বা রাসূল নন।
তাকে ওইসব যুবকের অবস্থা জিজ্ঞাস কর—যারা প্রাচীনকালে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তাদের ঘটনা কি? কেননা এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর ঘটনা।
তাকে সে ব্যক্তির অবস্থা জিজ্ঞেস কর যে ব্যক্তি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম এবং সারাবিশ্ব সফর করেছিল। তার ঘটনা কি?
তাকে ‘রুহ’ সম্পর্কে প্রশ্ন কর যে, এটি কি? (তাবারী)।
উভয় কুরাইশ প্রতিনিধি মক্কায় ফিরে এসে ভ্রাতৃসমাজকে বলেন, আমরা একটি চূড়ান্ত ফায়সালার পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ফিরে এসেছি। অতঃপর তারা তাদেরকে ইহুদী আলিমগণের সাথে সাক্ষাতের কাহিনী ও তাদের পক্ষ থেকে পাওয়া পরামর্শ শুনিয়ে দিল। কুরাইশরা রাসূলের (সঃ) কাছে এ প্রশ্নগুলো নিয়ে হাজির হল।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) তাদের বক্তব্য ও জিজ্ঞাসা শুনে বললেন, আগামীকাল উত্তর দেব। কিন্তু তখন তিনি অসাবধানতাবশত ইনশাআল্লাহ বা আল্লাহ তাওফীক দিলে আগামীকাল বলব এভাবে বলেননি। কুরাইশরা ফিরে গেল। হযরত রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওহীর আলোকে জবাবদানের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী আসার অপেক্ষায় রইলেন। কিন্তু কুরাইশদের সাথে ওয়াদাকৃত সময়সীমার মধ্যে কোন প্রকারের ওহীই আসল না; বরং পনের দিন এ অবস্থাতে কেটে গেল। ফলে, মহানবী খুবই চিন্তিত ও দুঃখিত হলেন। পনের দিন পর জিব্রাঈল (সাঃ) সূরা কাহ্ফ নিয়ে অবতরণ করলেন। এতে ওহী বা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশ বিলম্বের কারণও বলে দেয়া হল যে, ভবিষ্যতে কোন কাজ করার ওয়াদা করা হলে ইনশাআল্লাহ বলা উচিৎ। এ ঘটনায় এরূপ না হওয়ার কারণে হুশিয়ার করার জন্য বিলম্বে ওহী নাযিল করা হয়েছে। এ সূরায় যুবকদের ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে যাদের বলা হয় ‘আসহাবে কাহ্ফ’। পূর্ব ও পশ্চিমে ভ্রমণকারী যুলকারনাইনের ঘটনাও এসেছে এখানে, বর্ণিত হয়েছে ‘রুহ’ সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরও — (কুরতুবী,মাজহারী)।
উল্লেখ্য, এ সূরার নামকরণ করা হয়েছে এর প্রথম রুকুর ৯ম আয়াতে বর্ণিত ‘কাহ্ফ’ শব্দটি হতে।
এ সম্পর্কে এ সূরার ২৩ নং আয়াতে বর্ণনা এসেছে।
এ সূরার ২৩ ও ২৪ নং আয়াতের মাধ্যমে জানা যায় যে, ভবিষ্যত কোন করণীয় সম্পর্কে ‘ইনশাল্লাহ’ (বা যদি আল্লাহ চাহে তো) বলা মুস্তাহাব। দ্বিতীয়ত; যদি ভুলক্রমে বাক্যটি না বলা হয়, তখন যখনই স্মরণ হয়, তখনই তা বলা দরকার। আয়াতে বর্ণিত বিশেষ ক্ষেত্রের জন্য এ বিধান। অর্থাৎ শুধু বরকত লাভ ও দাসত্বের স্বীকারোক্তির জন্য এ বাক্য বলা উদ্দেশ্য, কোন শর্ত লাগানো উদ্দেশ্য নয়। (মা, আরিফুল কুরআন, অখন্ড ৮০৬)।
একইভাবে শো’আবুল ঈমানে সাহাবী হযরত আনাসের (রা.) রেওয়াতক্রমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, কোন পছন্দনীয় বস্তু দেখার পর যদি ‘মাশা আল্লাহ লা হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা-বিল্লাহ’ বলে দেয়া হয় তবে কোন বস্তু তার ক্ষতি করতে পারবে না। অর্থাৎ পছন্দনীয় বস্তুটি নিরাপদ থাকবে।
কোন কোন বর্ণনায় আছে, প্রিয় ও পছন্দনীয় বস্তুটি নিরাপদ আছে, প্রিয় ও পছন্দনীয় বস্তু দেখে এই কালেমা পাঠ করলে তা ‘চোখ লাগা’ বা বদনজর থেকে নিরাপদ থাকে।’
বস্তুত মানুষের মুখ লাগা বা কুদৃষ্টি পড়ার ধারণা কোন কুসংস্কারমূলক চিন্তা নয়। এটি বাস্তবিক। অন্যান্য ধর্ম দর্শনেও এ বিষয়গুলো বিবেচনায় এনেছে। কোন ব্যক্তি বা বস্তুর উপর ভাল মানুষের ভাল ধারণা নিপতিত হলে ব্যক্তি বা বস্তুটি কল্যাণকর ধারায় আবর্তিত হয়। আবার কোন খারাপ লোকের বদনজরে পড়লে ব্যক্তি বা বস্তুর নানা সমস্যা দেখা দেয়। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। আমাদের প্রিয় নবীজীর (স.) অনেকগুলো ভাল আচরণ ও দোয়ার বদৌলতে অসংখ্য অগণিত ভক্ত সাহাবাদের তড়িৎ উপকারের কথা সহীহ হাদীসগুলোর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। পিতামাতা, ওস্তাদ সৎ মুরুব্বীদের নেক নজর ও দুআ অধস্তন সন্তানদের দুনিয়া আখিরাতের অগুণতি উন্নতির চাবিকাঠি বলে প্রমাণিত। অবশ্য কোন মানুষের উচিত নয় অন্য কোন বস্তু বা মানুষের প্রতি অকল্যাণ বা খারাপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। এটি একটি নৈতিক পাপও বটে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র সূরা নাস ও ফালাকে একজন বিশ্বাসী মানুষকে সর্বদা কতিপয় সৃষ্টি বস্তু ও ব্যক্তির কুমন্ত্রণা/কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে পরওয়ারদিগারের সাহায্য কামনার তালিম দেওয়া হয়েছে।

লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব