নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » স্মরণ : স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা এম এ আজিজ

স্মরণ : স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা এম এ আজিজ

আজ ১১ জানুয়ারী। স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, চট্টল শার্দুল এম এ আজিজের ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এ দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা, বীরপ্রসবিনী চট্টলার এ বীর পুরুষকে আমরা চট্টলবাসী চিরতরে হারিয়ে ছিলাম।
“চট্টগ্রাম” নামের সাথে যে কয়জন ক্ষণজন্মা মানুষের নামের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত তন্মধ্যে একজন এমএ আজিজ। তাইতো, কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-শিক্ষাবিদ-রাজনীতিবিদ-লেখকরা তাঁদের বিভিন্ন কবিতা, প্রবন্ধ, লেখা ও বক্তৃতায় চট্টগ্রামের পরিচিতি তুলে ধরার সময় উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন, “এই চট্টগ্রাম মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর চট্টগ্রাম, বিপ্লবী সূর্য সেনের চট্টগ্রাম, এমএ আজিজের চট্টগ্রাম ইত্যাদি। রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ এম এ আজিজ ১৯২১ সালে চট্টগ্রামের হালিশহরে এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মহব্বত আলী সরকার এবং মাতার নাম রহিমা খাতুন। তিনি ১৯৪০ সালে পাহাড়তলী রেলওয়ে হাই স্কুল থেকে প্রথম শ্রেণীতে ম্যাট্রিক ও ১৯৪২ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আই এ পাস করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই এম এ আজিজের মধ্যে নেতৃত্বসুলভ গুণাগুণ পরিলক্ষিত হয়। স্বাধীন, দৃঢ়চেতা ও মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন ছাত্র নেতা হিসেবে তিনি তৎকালীন জাতীয় নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। ১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানী, শামসুল হক (টাঙ্গাইল) ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে তিনি ঐ দলে যোগদান করেন এবং দলের চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৫২ সালে তিনি চট্টগ্রাম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি’ পরবর্তী সময়ে তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন জারী হলে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ ৪ বছর পর বন্দী থাকার পর ১৯৬২ সালে কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৬দফা’ ঘোষণা করলে তাঁকে সমর্থন করে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রথম যে ৬ জন নেতার বিবৃতি প্রকাশিত হয় তন্মধ্যে চট্টগ্রামের এমএ আজিজ ও আব্দুল্লাহ আল হারুন চৌধুরী অন্যতম। উল্লেখ্য, বিবৃতির ড্রাফট রচয়িতাও ছিলেন চট্টগ্রামের আবদুল্লাহ আল হারুন চৌধুরী। ১৯৬৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি লালদীঘি ময়দানে ৬ দফার পক্ষে প্রথম জনসভার মুখ্য সংগঠক ছিলেন এম এ আজিজ। ঐ বছর ৮ মে তিনি বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দিন আহমদ, জহুর আহমদ চৌধুরী প্রমুখের সাথে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। ১৯৬৭ সালে এমএ আজিজ সর্বপ্রথম প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার দাবি করে বিবৃতি দেন। ১৯৬৮ সালে আগরতলা মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হলে তাঁর পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্যে এম এ আজিজ ‘মুজিব ফান্ড’ গঠন করেন। ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বানে মুজিব দিবস ও হরতাল পালিত হয়। এদিন লালদীঘি ময়দানে লাখো লোকের জনসভায় সভাপতির ভাষণে এম.এ আজিজ লালদীঘি ময়দানের নাম পরিবর্তন করে ‘মুজিব পার্ক’ ঘোষণা করেন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে স্বৈরাচার বিরোধী যে কোন আন্দোলনে বীর চট্টগ্রাম ছিল সবসময় অগ্রভাগে। এইজন্যই, চট্টগ্রামকে আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার বলা হয়। আর এম এ আজিজের মত নেতাদের জন্মের কারণে এই সূতিকাগার হয়েছে ধন্য। ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রামে স্বৈরাচারী আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে তিনি সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের ১৮ জুলাই কুখ্যাত সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন। ১৯৭০ সালে তাঁর গ্রেফতারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে সমগ্র প্রদেশ এবং ২৭ জুলাই পালিত হয় ‘আজিজ দিবস’। ১৫ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। রাজনৈতিক জীবনে এমএ আজিজ অনেক জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। তবুও, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। নীতি ও আদর্শ থেকে এক চুলও নড়েন নি। সাহস করে সত্য উচ্চারণে ছিলেন অটল ও অবিচল। চলবে

লেখক : প্রাক্তন ম্যানেজার, পদ্মা অয়েল কোম্পানী লিমিটেড, চট্টগ্রাম