বাংলাদেশ-ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে নৌপথে পণ্য পরিবহন বিকাশমান ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গত সপ্তাহে ইন্দো-বাংলা মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য এক হাজার টন স্টিল ছিল উল্লেখযোগ্য বিনিময়। কলকাতা বন্দর দিয়ে তা বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।
চেন্নাই বন্দর দিয়ে অশোক লেইল্যান্ড (এএল) কোম্পানির নির্মিত ১৮৫টি ট্রাক মোংলা বন্দরের হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছানো বড় ধরনের চালানের পর এই বিনিময় হলো। ২০১৭ সালের অক্টোবরে ট্রাকের চালানটি বাংলাদেশে পৌঁছায়। চালানটি রওনা দেওয়ার সময় চেন্নাই বন্দরে উপস্থিত ছিলেন ভারতের নৌমন্ত্রী নিতিন গাড়করি।
চেন্নাইয়ের ওই অনুদানে উপস্থিত থাকা বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, নৌপথে পণ্য বাণিজ্যের ফলে উভয় দেশের সড়ক পথে তিন লাখ কিলোমিটার পথ কম ব্যবহার করতে হবে। সড়ক পথে দক্ষিণ ভারত থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব দেড় হাজার কিলোমিটার। সড়কের শোচনীয় অবস্থা, নিরাপত্তা, আনুদানিকতা, যানজট ও অন্যান্য অবকাঠামোগত বিষয় বিবেচনায় এই দূরত্ব অতিক্রম করতে প্রায় ১৫ দিন সময় লাগে। পরিবেশ রক্ষা ছাড়াও সময় ও জ্বালানি কম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সড়ক পথের চেয়ে নৌপথ ব্যবহার কোম্পানিগুলোর জন্য বেশি লাভজনক।
অশোক লেইল্যান্ড কোম্পানি আগামী দিনগুলোতে কয়েক হাজার (১২ হাজারের মতো) ট্রাকের চেসিস পাঠাবে বাংলাদেশে। যা সরাসরি নৌপথে বাংলাদেশে আসবে। এতে করে বঙ্গোপসাগর হয়ে চেন্নাই ও মোংলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে।
২০১৫ সালে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ায় নৌপথে বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান ধারা অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনা করে বিশ্লেষকরা আশা করছেন, পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের সাফল্য ঘটবে। ২০১৩-১৪ সাল পর্য্যন্ত যখন শুধু সড়ক পথে পণ্য আনা-নেওয়া হতো তখন বার্ষিক বিনিময় ছিল ১৮ লাখ টন। তখন ব্যবসায়ীদের চালানের আকার নিয়েই যে শুধু সমস্যায় পড়তে হতো তা নয়, তাদেরকে পণ্যের মান নিয়েও সীমাবদ্ধতায় পড়তে হতো।
এক রফতানিকারক ওই সময়কার কথা তুলে ধরে বলেন, দভারত থেকে সিমেন্ট তৈরির উপাদান ফ্লাই অ্যাশ ও যন্ত্রাংশ কলকাতা থেকে পেট্রাপোল হয়ে বাংলাদেশ রফতানি করা হতো বেশি। আর বাংলাদেশ থেকে আসতো ফল, শুটকি, পাটজাত পণ্য ও গার্মেন্টস।’
ভারতের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দবর্তমানের চিত্রটা ভিন্ন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহার করে ত্রিপুরায় পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়েকশ’ টন ভারী যন্ত্রপাতি পাঠানো হয়েছে। পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুতের কিছু অংশ পাবে বাংলাদেশ। একইভাবে বাংলাদেশের নৌপথ দিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় অঞ্চল থেকে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে যেসব পণ্য পাঠানো হচ্ছে, তা উভয় দেশকে সম্পৃক্ত করছে। এ পর্য্যন্ত আটটি নৌপথ চিহ্নিত করা হয়েছে, শিগগিরই কাজে লাগানোর জন্য। ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এই সংখ্যা আরও বাড়বে।
উত্তরপ্রদেশের বারানসির সঙ্গে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের নিয়মিত নৌযোগাযোগ শুরু হওয়ার পর উত্তর ভারতের বাজারে প্রবেশে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রকল্প। এতে গঙ্গা নদীর কয়েকটি স্থানে খনন অভিযান করা হবে। বর্তমানে বাংলাদেশি রফতানিকারকরা দিল্লিতে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে সড়ক পথ ব্যবহার করেন। উত্তর ভারতের ক্ষেত্রে সড়ক ট্রানজিট চুক্তি আনুদানিকভাবে স্বাক্ষরের পর পণ্য পাঠাতে পারবে বাংলাদেশ।
সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিতভাবেই ভারত এগিয়ে রয়েছে। ২০১৬-১৭ সালে বাংলাদেশে ভারতের রফতানি দাঁড়িয়েছে ৬৮০ কোটি ডলার। এর আগের অর্থ বছরের তুলনায় বেড়েছে ১৩ শতাংশ। মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৭৫০ কোটি ডলার।
অবশ্য কয়েকটি পণ্যে ভারত কর কমানো ও শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ায় বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল রফতানির পরিমাণ বেড়েছে আগের তুলনায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে আগ্রহী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তেলেঙ্গানার কাকিন্দার ব্যবসায়ী মহল সম্প্রতি বাংলাদেশের মোংলা বা অন্যকোনও বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগযোগ ব্যবস্থা চালুর দাবি করেছেন। তারা কাকিন্দা বন্দরের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন চাইছেন। তারা পাটজাত পণ্য, টেক্সটাইল, সার ও সিফুড আমদানিতে আগ্রহী। কলকাতায় এমন ধরনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেন, নৌপথে পণ্য পরিবহন শুরু হওয়ায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ট্রানজিট ফি আয় করেছে। শিল্পের যন্ত্রপাতি ও ত্রিপুরা থেকে কলকাতা/হলদিয়াতে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতি টনে ১৯২ দশমিক ২৫ রুপি পায়। এর সঙ্গে আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়ায় পণ্য পাঠানোর জন্য যুক্ত হয় টনপ্রতি আরও ৫০ রুপি। ]সূত্র : পত্রপত্রিকা]
রাকিবুল হক