(গত সংখ্যার পর)

এছাড়া উচ্চফলনশীল কতিপয় ধান চাষের ফলে দেশী প্রজাতির বহু ধান এখন আর নজরে পড়ে না বা চাষ হয় না। এভাবে স্থানীয় জাতের তেল, ডাল, সবজি ও ফলও এখন তথাকথিত আধুনিক জাতের ভিড়ে হারিয়ে গেছে। অধিকন্তু দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বর্ধিত জনগোষ্ঠী খাদ্য ও বাসস্থান সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে ধ্বংস হয়েছে বনভূমি। ফলে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। একই সঙ্গে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো আছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেখানে মুনাফাই মুখ্য, সেখানে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তাদের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য বিক্রি করে চলেছে ভেজাল সার ও বালাইনাশক, যা জমির ক্ষতির মাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি ১২ দেশের ধানের নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণের পর এতে ক্ষতিকর ভারী ধাতু ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ক্যাডমিয়াম মানুষের দেহে খাদ্যের সঙ্গে প্রবেশ করে হয়ে উঠছে দুরারোগ্য ব্যাধি ও প্রাণহানির কারণ। তাই সবুজ বিপ্লবের বিকল্প হিসেবে দেখা দিয়েছে নতুন অর্গানিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা। একই সঙ্গে অর্গানিক খাদ্যপণ্যের চাহিদা তৈরি হওয়ায় কয়েক বছর ধরে এর বাজারও সম্প্রসারণ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান হারে।
অর্গানিকের বৈশ্বিক বাজার ও বাংলাদেশ : বিশ্বের ১৭৯টি দেশে অর্গানিক কৃষিপণ্যের আবাদ করা হচ্ছে। বিশ্বের ২৪ লাখ কৃষক এখন প্রায় ৫ কোটি ১০ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক কৃষিপণ্যের আবাদ করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃষক রয়েছে ভারতে ৫ লাখ ৮৫ হাজার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইথিওপিয়ায় অর্গানিক কৃষিপণ্য উৎপাদনকারীর সংখ্যা ২ লাখ ৩ হাজার ৬০২। ২ লাখ কৃষক নিয়ে পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে মেক্সিকো। অন্যদিকে জমি আবাদের দিক থেকে শীর্ষ তিনে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্র।
এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় ২ কোটি ২৭ লাখ হেক্টর, আর্জেন্টিনায় ৩১ লাখ ও যুক্তরাষ্ট্রে ১০ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক কৃষিপণ্য আবাদ হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী অর্গানিক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে। ১৯৯৯ সালে অর্গানিক পণ্যের বৈশ্বিক বাজার পরিধি ছিল ১ হাজার ৫০০ কোটি ইউরো। ২০১২ সালে তা দাঁড়ায় ৬ হাজার ৪০০ কোটিতে। অন্যদিকে ২০১৫ সালে এসে সারা বিশ্বে অর্গানিক পণ্যের বাজার দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি ইউরো বা ৮ হাজার ৮২৪ কোটি ডলারের বেশিতে। এর মধ্যে অর্ধেক বা ৩ হাজার ৫৮০ কোটি ইউরোর বাজার রয়েছে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে জার্মানি ও ফ্রান্সে এ বাজার ব্যাপ্তির পরিমাণ যথাক্রমে ৮৬০ কোটি ও ৫৫০ কোটি ইউরো। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ মূল্যমান ১৫ হাজার কোটি ইউরো ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী অর্গানিক কৃষিপণ্যের এ সম্প্রসারণশীল প্রবণতার সঙ্গে মিশে যাওয়ার বিষয়টি এখন বাংলাদেশের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। সারা দেশে ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সার ও বিষ প্রয়োগের কারণে খাদ্যে নানা মাত্রায় বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি বেড়ে যাচ্ছে। মানবদেহে জমা হচ্ছে ভারী বিষাক্ত ধাতব পদার্থ। দেশের প্রাণবৈচিত্র্য এরই মধ্যে ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩২ প্রজাতির মাছ এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। আরো অনেক প্রজাতি
বিলুপ্তির পথে। এ রকম মুহূর্তেই অর্গানিক পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। জৈব পদ্ধতিতে চাষবাসের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দেয়া ফসলের তুলনায় খাদ্যগুণ বেশি। দেশে অর্গানিক পণ্যের উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে কিছুটা পুরোধা ভূমিকা রয়েছে প্রবর্তনার। এছাড়া জেমকন গ্রুপের পাশাপাশি প্রশিকাসহ কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজিজাতীয় পণ্য উৎপাদন করছে। তবে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা, পাট, তুলা, চাল, মাংস ও মাছ চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলার পতিত জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে বিশ্ববাজারে স্বকীয় অবস্থান সৃষ্টি করতে পারে বাংলাদেশ। এতে একদিক থেকে যেমন রফতানি পণ্যের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বাড়বে, তেমনি আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে দেশের অর্থনীতি।
অর্গানিক বা জৈব কৃষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নামটি দেশ ও বিদেশের বাজারে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে জেমকন গ্রুপ। ২০০০ সালে তারা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় শুরু করে দেশের প্রথম অর্গানিক চা বাগান। প্রতিষ্ঠানটির তেঁতুলিয়া ব্র্যান্ডের চা এখন লন্ডনের সবচেয়ে দামি স্টোর হ্যারডসে প্রিমিয়াম মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্গানিক সুপার স্টোর ‘হোল ফুডের’ বিভিন্ন আউটলেটে বিক্রি হচ্ছে তেঁতুলিয়া। সম্প্রতি নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও কুয়েতের বাজার ছাড়াও বিশ্বের নানা দেশে তেঁতুলিয়া ব্র্যান্ডের চায়ের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ সালে ৩০ হাজার কেজি, ২০০৯ সালে ৫০ হাজার ও ২০১০ সালে ৬০ হাজার কেজি অর্গানিক চা রফতানি করে। হোয়াইট, লেমন গ্রাস, মিন্ট, বেঙ্গল ব্রেকফাস্টসহ মোট নয়টি ফ্লেভারে তেঁতুলিয়া টি বিদেশে বাজারজাত করছে জেমকন গ্রুপ। বিদেশের পাশাপাশি দেশের বাজারেও বিক্রি হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির অর্গানিক চা। অর্থডক্স টি, ব্ল্যাক টি, গ্রিন টি ও তুলসি টি নামে চারটি ভিন্ন ভিন্ন ফ্লেভারের চা বাজারে বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। চায়ের নিলামের বাজারেও গত পাঁচ বছর সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হয়েছে এ অর্গানিক চা। প্রতিষ্ঠানটি তেঁতুলিয়া এলাকায় চার হাজার একর জমিতে চা বাগান করার পরিকল্পনা নিয়েছে। বর্তমানে এক হাজার একরের বেশি জমিতে চা উৎপাদন হচ্ছে।
এছাড়া দেশে অর্গানিক কৃষি উৎপাদনের পেছনে ক্ষুদ্র ব্যক্তি-উদ্যোগও রয়েছে। চট্টগ্রামে সাতকানিয়া উপজেলার মো. ফখরুল ইসলাম ছয় বছর নিরলস পরিশ্রমের পর ২০১২ সালে মার্চে ৪০০ পিস অর্গানিক ডিম উৎপাদন করেন। বর্তমানে রহমানিয়া অর্গানিক এগ্রো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ ডিম দেশের বাজারে সরবরাহ করছেন তিনি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে সরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহায়তা নিয়ে তিনি প্রযুক্তিগত জ্ঞানটি রপ্ত করেন। এ প্রতিষ্ঠানটির পাশাপাশি দেশে বেশকিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানও অর্গানিক ডিম বা ওমেগা ডিম বাজারজাত করছে।
দেশে ৪০ লাখের বেশি অর্গানিক ডিম উৎপাদন হচ্ছে বলে দাবি করেছে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান।
মৎস্য খাতেও দেখা যাচ্ছে অর্গানিক সাফল্যের ছাপ। চট্টগ্রামের আপডেট ফিশারিজ ও গরীবে নেওয়াজ অর্গানিক এগ্রো ফার্ম প্রতি বছর প্রায় ২০০ টন মাছ উৎপাদন করছে। এছাড়া অর্গানিক পদ্ধতিতে বছরে প্রায় ২৭০ টন সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াজাত করছে চট্টগ্রামের আপ-ডেট ফিশারিজ। বাংলাদেশ মত্স্য উন্নয়ন করপোরেশনের কক্সবাজার কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে অর্গানিক পদ্ধতিতে ১৫০ টন শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শুরু করেছে। দিনাজপুরের কৃষক ফখরুদ্দিন খোকন, মানিকগঞ্জের মার্কেন্টাইল অর্গানিক এগ্রো ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কয়েকজন কৃষক সবজি আবাদ করছেন। খাগড়াছড়ি অঞ্চলের রিয়েল অর্গানিক এগ্রো, বান্দরবান এলাকায় তরঙ্গ অর্গানিক এগ্রো এবং বাঁশখালীর কয়েকজন ক্ষুদ্র খামারি বিভিন্ন ফল উৎপাদন করছেন। অর্গানিক পদ্ধতিতে জৈব সার বাজারজাত করছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকার সেবক এগ্রোভেট।
আবার অর্গানিক পণ্য বিপণনে তরুণরাও এগিয়ে এসেছেন। রাজধানীতে অনেকেই এখন ক্ষুদ্র উদ্যোগে কীটনাশকমুক্ত অর্গানিক পণ্য বিপণন করছেন। এ রকমই একজন দেলোয়ার জাহান। দেশের একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সে দ্বিতীয় ও মাস্টার্সে যৌথভাবে প্রথম হয়েছিলেন তিনি। এরপর সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে না গিয়ে ঢাকায় সাংবাদিকতার পাশাপাশি দেশের কৃষকদের সার ও কীটনাশকমুক্ত ফসল উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করছেন তিনি। দেলোয়ার জাহান আর তার সঙ্গীরা মিলে ‘প্রাকৃতিক কৃষি’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে কৃষকদের পরিবেশবান্ধব উপায়ে কৃষিতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি রাজধানীতে পণ্য বিপণনের মাধ্যমে তাদের সহায়তাও করা হচ্ছে।
দেশে অর্গানিক চাষের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিষের অবাধ আমদানি। নীতিগত সমস্যার কারণেও অর্গানিক কৃষি ব্যবস্থা বিকাশ লাভ করছে না। কৃষক পর্যায়ে সচেতনতার অভাব, অর্গানিক সনদদাতা কর্তৃপক্ষের অভাব এবং বাজারজাতে সমস্যাসহ কৃষিজমির অভাবে এর বিস্তার হচ্ছে না। সীমিত কৃষিজমি, অবকাঠামো সমস্যা ও তদারকির অভাবেও বিকশিত হচ্ছে না খাতটি। সত্তরের দশকের আগে দেশের কৃষি ব্যবস্থা মূলত অর্গানিক পদ্ধতির ওপরই নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ওই সময়ের পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে রাসায়নিক সারের মাধ্যমে উচ্চফলনশীল শস্যের চাষাবাদ শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় অর্গানিক পদ্ধতি।
দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিষমুক্ত খাবার এবং কৃষিপণ্য উৎপাদনে ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অনেকে এগিয়ে এলেও এ নিয়ে কোনো নীতিসহায়তা দেয়া হচ্ছে না। এছাড়া বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে দেশে এ ধরনের উদ্যোগ কীভাবে আরো শক্তিশালী করা সম্ভব, সে বিষয়েও নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। দেশে অর্গানিক কৃষির যথাযথ সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হলে সেজন্য অবশ্যই একটি নিয়ন্ত্রক বা তদারকি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে। আন্তর্জাতিক যেসব প্রযুক্তি এবং বিপণন পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো দেশে চালু করতে হবে। তা না হলে উৎপাদনে কৃষককে ধরে রাখা সম্ভব হবে না। আর চাহিদা ধরে রাখতে বিক্রেতা ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি অর্গানিক পণ্য বিষয়ে ভোক্তা আস্থা বাড়ানোর কার্যকরও উদ্যোগ নিতে হবে।
এর সবই নিশ্চিতের জন্য নিয়ন্ত্রক বা তদারকি প্রতিষ্ঠান স্থাপন জরুরি।
তদারকি কিংবা নীতিমালা না থাকলে বাড়তি চাহিদার কারণে একসময় অর্গানিকের বাজারে প্রতারণা দেখা দেবে। তখন এ পণ্যেও মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। তাই পণ্যের মান নির্ধারণের জন্য মানদ- ঠিক করে দিতে হবে। একটি অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডও গঠন করতে হবে, যাতে অর্গানিক পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে মান নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা না হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্যক্রমও চলমান রাখতে হবে।
[সূত্র : পত্রপত্রিকা] (শেষ)
মরিয়ম আকতার ব্যাংকার