অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে মন্দাভাব বজায় রয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্য এনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দরপতনের লাগাম টানতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৭ সালের শেষের দিকে এসে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা গেলেও তা কাক্সিক্ষত মাত্রায় হয়নি। এরই মধ্যে এ বছর জ্বালানি পণ্যটি প্রাপ্তির হিসেবে মন্দাভাব বজায় থাকার খবর মিলেছে। ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী নতুন তেলক্ষেত্র পাওয়ার পরিমাণ আট দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে। খবর অয়েলপ্রাইস ডটকম ও ইউএসএ টুডে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ২০১৬ সালেও মন্দাভাব বজায় ছিল। সেই সময় বিশ্বজুড়ে নতুন কূপ থেকে মোট ৮০০ কোটি ব্যারেলের সমপরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছিল। বিগত শতকের চল্লিশের দশকের পর এটাই ছিল জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক প্রাপ্তির সর্বনিম্ন পরিমাণ। ২০১৭ সালে এ খাতে বিদ্যমান মন্দাভাব আরো জোরালো হয়েছে। বছরটিতে বিশ্বজুড়ে ৭০০ কোটি ব্যারেলের সমপরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ নতুন কূপের সন্ধান মিলেছে। এর আগে ২০১২ সালে বিশ্বব্যাপী তিন হাজার কোটি ব্যারেলের সমপরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের কূপের সন্ধান মিলেছিল। ২০১৪-১৫ সালে এর পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের সমপরিমাণ। সেই হিসাবে ২০১৭ সালে নতুন সন্ধান পাওয়া কূপগুলো থেকে জ্বালানি পণ্যটির প্রাপ্তির পরিমাণ ২০১৪-১৫ সালের তুলনায় অর্ধেক কমেছে। আর ২০১২ সালের তুলনায় কমেছে এক-চতুর্থাংশের বেশি।
মূলত জ্বালানি তেল অনুসন্ধানে ক্রমহ্রাসমান বিনিয়োগের কারণে বিশ্বব্যাপী নতুন কূপ প্রাপ্তির পরিমাণ কমছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০১৪ সালের শেষের দিকে চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্যহীনতার জের ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্রমাগত দরপতন শুরু হয়। এ সময় পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছিল। দরপতনের ধারাবাহিকতায় পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলারের নিচে নেমে যায়। এ সময় সম্ভাব্য লোকসানের আশঙ্কা থেকে বিশ্বজুড়ে অনেক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের নতুন কূপ অনুসন্ধান কার্যক্রমের বাজেট কমিয়ে দেয়। মন্দাভাব দেখা দেয় জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক বিনিয়োগেও। এর জের ধরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের নতুন কূপ প্রাপ্তি কমতে শুরু করেছে। তিন বছরের মন্দাবস্থার ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী নতুন তেলক্ষেত্রের সন্ধান আট দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি খাতে বিনিয়োগবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রেস্টাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ জ্বালানি বিশ্লেষক সোনিয়া পাসোস জানান, ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের নতুন কূপগুলো থেকে তেল প্রাপ্তির মাসভিত্তিক গড় পরিমাণ মাত্র ৫৫ কোটি ব্যারেলের সমপরিমাণ। একই সঙ্গে জ্বালানি পণ্যটির রিজার্ভ-রিপ্লেসমেন্ট অনুপাত (জ্বালানি তেল ও গ্যাসের) কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১ শতাংশে। ২০১২ সালেও এর পরিমাণ ৫০ শতাংশের ওপরে ছিল। প্রতিষ্ঠানটির বিবৃতি অনুযায়ী, ২০১২ সালে সন্ধান পাওয়া কূপগুলোয় গড়ে ১৫ কোটি ব্যারেলের সমপরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ ছিল। ২০১৭ সালে এর পরিমাণ কমে ১০ কোটি ব্যারেলে নেমে এসেছে। অর্থাত্ গত বছর জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট কূপে জ্বালানি তেল অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বেশি করেছে। এর মধ্য দিয়ে তুলনামূলক সীমিত বিনিয়োগে অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা দেখা গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে।
এদিকে অবস্থানগত বিবেচনায় ২০১৭ সালে আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের নতুন কূপের সন্ধান মিলেছে। এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে আফ্রিকার দেশ সেনেগাল। এ সময় দেশটিতে ইয়কার কূপে জ্বালানির সন্ধান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কসমস এনার্জি। অন্যদিকে মেক্সিকোর জামা কূপে জ্বালানি পেয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান টালোস এনার্জি। এ কূপে ১০০ কোটি ব্যারেলের সমপরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। গায়ানায় এক্সন মবিলের পরিচালনাধীন নতুন কূপেও ১০০ কোটি ব্যারেলের সমপরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। জ্বালানি বিশ্লেষক সোনিয়া পাসোস বলেন, ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এসেছে।
বছরের শেষ সময়ে এসে আড়াই বছরের মধ্যে পণ্যটির দাম সর্বোচ্চে উঠেছে। একই সময় নতুন কূপের সন্ধান প্রাপ্তিতে মন্দাভাব আগামী দিনগুলোয় পণ্যটির কাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও আস্থাহীনতার চিত্র উঠে এসেছে।
[সূত্র : পত্রপত্রিকা] আবদুল মুহিদ