নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » শিশুদের প্রতি দরদী নবীজীর (স.) দরদ ও ভালবাসা

শিশুদের প্রতি দরদী নবীজীর (স.) দরদ ও ভালবাসা

অশেষ দু: কষ্ট সীমাহীন দুর্গতির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন আল্লাহর পেয়ারা হাবীব। তাই তিনি গোটা জীবন মানুষের দু: কি জিনিস পরিবারের কিসে আনন্দ কিসে দু: তা হাড়ে হাড়ে বুঝতেন, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন আর নিজের ভাষার লালিত্যে কর্মের মোহনীয়তায় গোটা দুনিয়া থেকে মানুষের দু: যাতনা পেরেশানি লাঘব করেছিলেন। তাই পরবর্তী যুগে অন্য যে কোন শিশু, অনাথ দেখলে তিনি অতি আপন মনে করে বুকে টিনে নিতেন। অনুভব করতেন পরম প্রশান্তি।
হিজরী তৃতীয় সনে হযরত আলী ফাতিমা (রাদি.) দম্পতির কোল জুড়ে প্রথম সন্তান আসল হাসান। ফাতিমার পিতা নবী (সা.) কে সুসংবাদ দেয়া হল। তিনি দ্রুত ছুটে গেলেন এবং আদরের মেয়ে ফাতিমার সদ্যপ্রসূত সন্তানকে দুহাতে তুলে তার কানে আযান দেন এবং গভীরভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন। গোটা মদীনা যেন আনন্দউৎসবে মেতে ওঠে। রাসূল (.) দৌহিত্র হাসানের মাথা মুড়িয়ে তার চুলের সমপরিমাণ ওজনের রূপা গরীবমিসকীনদের মধ্যে দান করে দেন। শিশু হাসানের বয়স এক বছরের কিছু বেশী হতে না হতেই চতুর্থ হিজরীর শাবান মাসে ফাতিমা (রাদি.) আরেকটি সন্তান উপহার দেন। আর এই শিশু হলেন হুসাইন। তিনি শিশু হাসানকে দুহাতে দুলাতে দুলাতে নি¤œ চরণটি আবৃত্তি করতেন: ইন্না বুনাইয়া শিবহুন নাবী; লাইসা শাবীহা বি আলী’ /‘আমার সন্তান নবীর মত দেখতে , আলীর মত নয়।
Ñ (লামÑআনÑনিসা /১১২)
হযরত রাসূলে কারীমের (সা) অতি আদরের দুই দৌহিত্র তাঁর অন্তরে প্রশান্তি বয়ে আনে হযরত খাদীজার (রা) ওফাতের পর রাসূল (সা.) বেশ কয়েকজন নারীকে বেগমের মর্যাদা দান করেন, কিন্তু তাঁদের কেউই তাঁকে সন্তান উপহার দিতে পারেননি। পুত্র সন্তানের যে অভাববোধ তাঁর মধ্যে ছিল তা এই দুই দৌহিত্রকে পেয়ে দূর হয়ে যায়। পৃথিবীতে তাঁদের মাধ্যমে নিজের বংশধারা বিদ্যমান থাকার সম্ভাবনায় নিশ্চিন্ত হন। কারণে তাঁর পিতৃস্নেহও তাঁদের উপর গিয়ে পড়ে। আর তাই এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, তিনি তাঁদের দুজনকে নিজের ছেলে হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলতেন: এরা দুজন হলো আমার ছেলে এবং আমার মেয়ের ছেলে। হে আল্লাহ! আমি এদের দুজনকে ভালবাসি, আপনিও তাদেরকে ভালবাসুন। আর তাদেরকে যারা ভালোবাসে তাদেরকেও ভালোবাসুন। Ñ (সিআরু লাম আন নুবালা /২৫১) একদিনের ঘটনা। রাসূল (সা) ফাতিমাÑ‘আলীর (রা) বাড়ীর পাশ দিয়ে ব্যস্ততার সাথে কোথাও যাচ্ছেন। এমন সময় হুসাইনের কান্নার আওয়াজ তাঁর কানে গেল। তিনি বাড়ীতে ঢুকে মেয়েকে তিরস্কারের সুরে বললেন: তুমি কি জান না, তার কান্না আমাকে কষ্ট দেয়?’
একদিন রাসূল (সা) কয়েকজন সাহাবীকে সংগে করে কোথাও দাওয়াত খেতে যাচ্ছেন। পথে হুসাইনকে তার সমবয়সী শিশুদের সাথে খেলতে দেখলেন। রাসূল (সা) দুহাত বাড়িয়ে তাকে ধরার জন্য এগিয়ে গেলেন। সে নানার হাতে ধরা না দেওয়ার জন্য একবার এদিক, একবার ওদিক পালাতে থাকে। রাসূল (সা) হাসতে হাসতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ান। এক সময় তাকে ধরে নিজের একটি হাতের উপর বসান এবং অন্য হাতটি তার চিবুকের নীচে রেখে তাকে চুমু দেন। তারপর বলেন : হুসাইন আমার অংশ এবং আমি হুসাইনের অংশ।
সমসাময়িক আরেকটি বিখ্যাত ঘটনা, সাহাবী হযরত যায়িদ ইবনুল হারিছা (রা.) পাচারের শিকার হয়েছিলেন। যায়িদের বয়স যখন আট বছর, লুটেরা তাঁকে বিক্রির উদ্দেশ্যে তদানিন্তন আরবের প্রসিদ্ধওকাযমেলায় নিয়ে যায়। হাকীম ইবনে হিযাম ইবনে খুয়াইলিদ নামে এক কুরাইশ নেতা চারশো দিরহামে তাঁকে ক্রয় করেন। তিনি শিশু যায়িদকে ফুফু খাদিজাকে উপহার দেন ঘটনার কিছুদিন পর হযরত মুহাম্মদ (.) এর সাথে খাদিজা (রা.) পরিণয় সুত্রে আবদ্ধ হলেন। তিনি স্বামীকে কিছু উপহার দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। প্রিয় ক্রীতদাস যায়িদ ইবনে হারিছা অপেক্ষা অধিকতর সুন্দর কোন জিনিস তিনি খুঁজে পেলেন না। এই ক্রীতদাসটিকেই তিনি স্বামীর হাতে তুলে দিলেন।
এভাবে হাত বদল হয়ে সৌভাগ্যবান ক্রীতদাস বালক জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ হযরত মুহাম্মদ (.) এর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হতে লাগলেন। তাঁর মহান সাহচর্য লাভ করে উত্তম চারিত্রিক সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেলেন। দিকে তাঁর স্নেহময়ী জননী পুত্র হারানোর শোকে অস্থির হয়ে পড়লেন, তার চোখের পানি কখনও শুকাতো না। রাতের ঘুম তার হারাম হয়ে গিয়েছিল। হযরত যায়িদ (রা.) এর পিতা হারিছ সম্ভাব্য সব স্থানে পাচার হয়ে যাওয়া হারানো ছেলেকে খুঁজতে থাকেন। পরিচিত, অপরিচিত, প্রতিটি মানুষের কাছে ছেলের সন্ধান জানতে চাইলেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন বিশিষ্ট কবি। সময়ে রচিত বহু কবিতায় তাঁর সন্তান হারানোর বেদনা মূর্ত হয়ে উঠেছে।
একটি কবিতায় তিনি বলেন:
যায়িদের জন্য আমি কাঁদছি, জানিনে/ তার কি হয়েছে, সে কি জীবিত?/তবে তো ফেরার আশা আছে, নাকি মারা গেছে?
আল্লাহর কসম! আমি জানিনে, অথচ জিজ্ঞেস করে চলেছি।
তোমাকে অপহরণ করেছে সমতল ভূমির লোকেরা, না পাবর্ত্য ভূমির?…’
হজ্ব মৌসুমে যায়িদের গোত্রের কতিপয় লোক মক্কায় এলো। কাবার চতুর্দিকে তাওয়াফ করার করার সময় তারা যায়িদের মুখোমুখি হলো। তিনি খুলে বললেন তার অপহরিত সময়ের নানা যাতনার কথা ,এক পর্যায়ে সৌভাগ্যক্রমে হযরত খাদীজার মাধ্যমে মহানবীর (.)দুর্লভ সাহচর্য প্রাপ্তির ঘটনা অবশেষে যায়িদের পিতা তাঁর হারানো ছেলের সন্ধান পেলো।
জাহিলী সমাজে নারী ছিল পণ্যের মতো ভোগের সামগ্রী, কন্যা শিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো, দাসদাসী হিসেবে কেনাবেচা করা হতো, অপহরণ করে পাচার করা ছিল যে সমাজে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ইসলামের মহান নবীর (.) আবির্ভাবের বদৌলতে সে সমাজেই এগুলো বন্ধ হয়ে ফিরে এসেছিল জান্নাতি পরিবেশ। শিশুদের প্রতি নবী করীম (.) এর ছিল বিশেষ দরদ আজীবন তিনি নিজের চরিত্র মাধুর্য অনুপম আচরণ বিভিন্নভাবে শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠ করে তাদের জন্য বসুন্ধরাকে করে গেছেন নিরাপদ উপভোগ্য। আমাদের উচিত শুধু তার পবিত্র পয়দায়েশ ওফাতের স্মৃতিধন্য মাহে রবিউল আউয়ালে নয় সর্বদা তাকে স্মরণে আমলে রাখা

লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব