নীড়পাতা » শেষের পাতা » ১৬ ঘণ্টার হত্যা মিশনে কিলার অপুকে ৩ দফা ইয়াবা সাপ্লাই

১৬৪ ধারায় জবানবন্দি ইলিয়াছের

১৬ ঘণ্টার হত্যা মিশনে কিলার অপুকে ৩ দফা ইয়াবা সাপ্লাই

নিজস্ব সংবাদদাতা রাঙ্গুনিয়া

রাঙ্গুনিয়ার গোচরা বাজারে যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসী নাগিব মাহফুজ অপুর টর্চার সেলে নিহত যুবক আবদুল হামিদকে পিটিয়ে হত্যার ১৬ ঘণ্টা সময়ে তিন দফায় ইয়াবা সাপ্লাই দিয়েছেন উপজেলার গোডাউন এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইলিয়াছ (২৪) গত ২৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সাড়ে ১২টায় আবদুল হামিদকে ধরে নেয়ার পর থেকে শুক্রবার ভোররাত সাড়ে চারটা পর্যন্ত দফায় দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় আবদুল হামিদকে। ১৬ ঘণ্টার হত্যা মিশনে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুক্রবার ভোররাত পর্যন্ত খুচরা ইয়াবা ব্যবসায়ী ইলিয়াছ চারবার আসা যাওয়া করেন অপুর টর্চার সেলে। দুই দফায় হামিদকে তিনি নিজেও পিটিয়েছেন। হত্যার উদ্দেশ্যে পেটানো হয়নি দাবি করা হলেও ভোররাতে হামিদের মৃত্যুর পর লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দিতে ইলিয়াছসহ অন্যান্য খুনীরা মিলে লাশ রশি দিয়ে বাঁধেন এবং অন্ধকার থাকতেই লাশ গুম করতে গোডাউন এলাকায় গিয়ে সিএনজি খোঁজেন ইয়াবা কারবারি ইলিয়াছ। পরে সিএনজি জোগাড়

করতে না পারায় লাশ রেখে টর্চার সেলে তালা লাগিয়ে পালায় খুনীরা। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজেস্ট্রিট মো. হেলালউদ্দিনের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানকালে রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার গোডাউন ব্রিজের পূর্ব

পাশের শামসুল হকের ছেলে ইলিয়াছ একথা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকার করেন বলে আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছেন। গোচরা বাজারের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ ইলিয়াছকে শনাক্ত করেন। মঙ্গলবার রাত নয়টায় রাঙ্গুনিয়ার গোডাউন এলাকা থেকে ইলিয়াছকে আটক করেন মামলার তদন্তকারী কমকর্তা এসআই ইসমাঈলসহ একদল পুলিশ। খুনের ঘটনার দিন পরিহিত শার্টটিই আটককালে পরিহিত ছিল বলে পুলিশ জানায়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পুলিশ আদালতে হস্তান্তর করেছেন। ইলিয়াছকে আটকের পর পুলিশ গতকাল আদালতে সোপর্দ করলে সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠান।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানকালে ইলিয়াছ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বলেন সন্ত্রাসী নাগিব মাহফুজ অপু তার কাছ থেকে নিয়মিত ইয়াবা কিনতেন। ফোন করলেই নিজে গিয়ে অপুর আস্তানায় পৌঁছে দিতেন। ডোর টু ডোর ইয়াবা সাপ্লাইয়ের খুচরা ব্যবসায়ই এখন তার পেশা। অপুর ফোন পেয়ে ২৩ নভেম্বর বিকেল সাড়ে চারটায় গোচরা বাজারের টর্চার সেলে পিস ইয়াবা পৌঁছে দেন। এরপর রাত সাড়ে ৮টায় দ্বিতীয় দফায় পিস ইয়াবা নিয়ে যান ইলিয়াছ। গভীর রাত টায় তৃতীয় দফায় আবারো পিস ইয়াবা নিয়ে যান। প্রতিবারেই ইয়াবা লো অপুসহ সবাই মিলে সেবন করেন। এবং হামিদকে উল্লাস করে পেটান। ইয়াবা সেবনের পর তারা উন্মত্ত ছিলেন। মূলত একটি ল্যাপটপ একটি মোবাইল চুরির অভিযোগে অপুর টর্চার সেলে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়ার যুবক আবদুল হামিদকে (২৫) মারধরের সময় টর্চার সেলে খুনের ঘটনার মূল হোতা নাগিব মাহফুজ অপু, ইমন, টিপু, আকাশ, আরিফ, সোহেল সাঈদসহ আরো অনেকে সেখানে উপস্থিত ছিল। সারারাত দফায় দফায় তাকে মারধর করে হত্যা করা হয়েছে। ঐদিন রাতে অপু ইয়াবার দাম বাবদ ইলিয়াছকে পাঁচশ টাকাও দেন। হামিদকে পেটানোর সময় একটি চেয়ারে বসানো হয়। চেয়ারের সাথে হাতপা বাঁধা ছিল। কান্নার আওয়াজ যাতে বের না হয় সেজন্য মাথায় পরানো হয় ডেকচি। গোচরা বাজারের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় ভোররাত ৩টা ৪০ মিনিটে অপুসহ ইলিয়াছ, ইমন, টিপু, আকাশ সোহেল বের হয়ে যাচ্ছেন।
প্রসঙ্গে ইলিয়াছ আদালতকে বলেন, ‘সারারাত ইয়াবা সেবন করার পর হামিদকে মারধর করে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাই সবাই মিলে গোডাউন বাজারে যাই কিছু খেতে। সেখানে একটি হোটেল সারারাত খোলা থাকে। সেখানে আমরা খিচুড়ি, কলা ডিম খাই।যাবার সময় হামিদকে চেয়ার থেকে নামিয়ে মাটিতে বেঁধে ফেলে রেখে তালা লাগিয়ে যান তারা। কারণ চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় থাকলে উল্টে পড়ে যেতে পারে। ভোররাত সাড়ে ৪টার পর ফিরে এসে দেখি হামিদের মৃত্যু ঘটেছে। তখন প্রচঠা পড়ছিল। তাছাড়া হামিদের পরনে শার্ট ছিল না। সম্ভবত ঠা পেটানোর যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তার মৃত্যু হতে পারে। হত্যার উদ্দেশ্যে তারা হামিদকে মারেননি দাবি করে ইলিয়াছ বলেন, ‘হামিদের মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে আমরা হতভম্ব হয়ে পড়ি। কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে লাশ বেঁধে কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেবার পরিকল্পনা করি। সেজন্য আমিসহ মিলে লাশ রশি দিয়ে বেঁধে রাখি। আমি লাশ গুম করতে একটি সিএনজি আনতে গোডাউন যাই। অনেক চেষ্টা করেও সিএনজি খুঁজে না পাওয়ায় সেখানে লাশ রেখেই বাইরে তালা দিয়ে পালাই।
টর্চার সেলের ভেতরে গর্ত খুঁড়ে লাশ পূঁতে ফেলারও উদ্যোগ নেয়া হয়। মাটি খোঁড়ার কোদাল না পাওয়া ততক্ষণে ভোর হয়ে যাওয়ায় সেই সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। রাত ৯টায় গোচরা বাজারের একটি দোকান থেকে সিলভারের যে ডেকটিট কেনা হয়েছিল তার দামও পরিশোধ করা হয়নি বলে ইলিয়াছ পুলিশকে জানিয়েছেন।
রাঙ্গুনিয়ার পোমরা এলাকার উঠতি সন্ত্রাসী নাগিব মাহফুজ অপু সিকদার (২৬) এর মালিকানাধীন গোচরা বাজারে একটি দোকান থেকে ২৪ নভেম্বর শুক্রবার সকালে আবদুল হামিদের লাশ উদ্ধার করে রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশ। পরিত্যক্ত এই দোকান ঘরটি সন্ত্রাসী অপু মাদকের আস্তানা টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতেন বলে স্থানীয়রা জানায়। যুবলীগের নামধারী সন্ত্রাসী অপু গোচরা বাজার ব্যবসায়ি সমিতির যুগ্ন সম্পাদকের পদে ছিলেন। তার ভয়ে বাজারের ব্যবসায়ী স্থানীয়রা তটস্থ থাকতেন। খুনের ঘটনায় হামিদের খালু সোলায়মান বাদি হয়ে থানায় মামলা করেন।
থানা সূত্র জানায়, মামলায় পোমরা ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামের আবু তাহের প্রকাশ বাবুল মাস্টারের পুত্র সন্ত্রাসী নাগিব মাহফুজ অপু (২৬), পোমরা লোহারপুল এলাকার ফয়েজ আহমদ ফজুর ছেলে মো. টিপু (২২), ইমাম শরীফের ছেলে মো. ইমন (২২), পোমরা হাজী পাড়ার ইমাম বাড়ির দিদারুল আলম দিদু ছেলে মো. আকাশ (২১), পোমরা লোহারপুল এলাকার ইসলাম মিয়ার পুত্র মো. আলমগীর (২৫), গুণগুণিয়া বেতাগী গ্রামের আমিনুল হকের পুত্র মো. আরিফ (২২), দক্ষিণ পোমরা লোহারপুল এলাকার আহমদুর রহমানের ছেলে মো. রবি (১৯) একই গ্রামের মো. বেলাল (২৫) পোমরা ছাইনীপাড়া গ্রামের মো. ইদ্রিসের পুত্র মো. গিয়াস উদ্দিন (২৫) কে আসামি করা হয়। নয়জনকে এজাহারভুক্ত আসামী করা হলেও পুলিশের তদন্ত ধৃত আসামীদের জবানবন্দিতে আরো কয়েকজনের সম্পৃক্ততার সত্যতা মিলছে। এজাহারভুক্ত আসামী গিয়াস উদ্দিনের স্বীকারোক্তিতে মামলার এজাহার বহির্ভুত সাঈদ নামের একজনও হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আদালতকে। গতকাল ইলিয়াছের জবানবন্দিতে প্রকাশ পেয়েছে সোহেল নামের আরো এক খুনীর নাম। সাঈদ সোহেল এজাহারভুক্ত আসামি নয়। এর বাইরে আরো কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য নিশ্চিত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ।
রাঙ্গুনিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ ইমতিয়াজ মো. আহসানুল কাদের ভুঁঞা জানান, হত্যাকাের সাথে জড়িত এপর্যন্ত দুই খুনী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মূল খুনী অপুসহ অন্যান্য আসামীদের ধরতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। শীঘ্রই এদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান