নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » জলাধারশূন্য চট্টগ্রাম মহানগরী কারো কাম্য নয়

জলাধারশূন্য চট্টগ্রাম মহানগরী কারো কাম্য নয়

প্রকৃতির দানে সমৃদ্ধ রূপময় চট্টগ্রাম তার স্বকীয়তা হারাতে চলেছে ধীরে ধীরে। উন্নয়নের হাওয়া যদি কোনো অঞ্চলের প্রকৃতিবান্ধব চরিত্র পালটে দেয়, তবে সেই উন্নয়নকে প্রকৃতিসহায়তা দানের দাবি তোলাই যায়। তাই, প্রকৃতি কন্যা রম্যনগরী চট্টলার স্বকীয়তা সংরক্ষণের বিষয়টি মনে রেখেই উন্নয়নঅভিযান পরিচালনাকে বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।
ভূপ্রকৃতিগত অবস্থানের দিক থেকে পরিবেশবান্ধব নগরী চট্টগ্রামের একটি বহুল পরিচিতি ছিলো। দুঃখজনক তথ্যাবলীর একটি বিশেষ দিক হলো, উন্নয়ন নগরায়নের প্রবল তোড়ে এককালের পুকুর, দীঘি জলাশয়সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম মহানগরী বর্তমানে জলাধারশূন্য হয়ে পড়েছে। এক শ্রেণীর কাজ্ঞানহীন অদূরদর্শী মানুষের আগ্রাসী জমি ক্ষুধার মুখে এই নগরীর সৌন্দর্যবৃদ্ধিকারী উপকারী পুকুরদীঘি, জলাশয়গুলো একে একে ভরাট হয়ে গেছে। তার জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক প্লট, সুউচ্চ ইমারতরাজি, বহুতল মার্কেট এবং কংক্রিটের নানা ধরনের স্থাপনা জড়স্থাপনাসমূহের প্রবল প্রতাপে এই মহানগরী এখন বসবাসের অনুকূল পরিবেশ হারিয়ে প্রায় অস্বাস্থ্যকর নগরীর অবয়ব পেতে চলেছে।
এই সংক্রান্ত বিষয়ে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা তৈরী করা না হলে এবং একশ্রেণীর লোভীস্বার্থপর অপরিণামদর্শী মানুষের হঠকারী পদক্ষেপগুলোকে আইনী প্রক্রিয়ায় কঠোরভাবে প্রতিহতপ্রতিরোধ করা না গেলে এই চট্টগ্রাম একদিন পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হবে। চট্টগ্রাম দশক কয়েক আগেও প্রাকৃতিক ভৌগোলিক পরিবেশের দিক থেকে আজকের চাইতে অনেক বেশী আকর্ষণীয় ছিলো। একে রক্ষা করার দায়ভাগ এখন সচেতন নগরবাসীর। অনেক আগেই এই মহানগরীর পুকুর, দীঘি জলাশয়গুলোকে রক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিলো। সময়ের পরিবর্তনে অনেক সরকারই রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তাদের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সংস্থা প্রতিষ্ঠানসমূহ যথোচিত দায়িত্ব পালন করেনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব হচ্ছে, বিভিন্ন এলাকার বায়ু, পানি, শব্দ মৃত্তিকাসহ পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের মান মাত্রা নির্ধারণ, পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শিল্পকারখানা স্থাপন অন্যান্য উন্নয়নকর্মকানিয়ন্ত্রণ, বিপজ্জনক পদার্থের ব্যবহার সংরক্ষণ পরিবহনের নিরাপদ পদ্ধতি নিরূপণ,পরিবেশ দূষণের কারণ হতে পারে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিরাপদ পদ্ধতি প্রতিকারমূলক কার্যক্রম প্রণয়ন, বর্জ্য নিঃসরণ নির্গমণের মান মাত্রা নির্ধারণ, বিভিন্ন প্রকল্প কার্যাদির পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ, পর্যালোচনা অনুমোদনের পদ্ধতি, পরিবেশ প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষা করার পদ্ধতি এবং ছাড়পত্র অন্যান্য সেবার ফিস নির্ধারণ ইত্যাদি।
পরিতাপের বিষয় হলো, পুকুর, দীঘি, জলাশয় ইত্যাদি সংরক্ষণে নজর দেবার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের কোথাও উল্লেখ নেই। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে সুনির্দিষ্টভাবে কোথাও কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় মহানগরীর জলাধারসমূহ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পরিবেশ অধিদপ্তর ব্যর্থ হচ্ছে বলে ধারণা করি। এই দপ্তরের এই ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। জলাধারসমূহের লোপাট প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য এবং মহানগরীতে মানব বসবাসের পরিবেশের ভারসাম্য অটুট রাখার প্রয়োজনে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের কিছু গুণগত পরিবর্তন সাধনে আমাদের মতে জরুরীভাবে উদ্যোগী হওয়া আবশ্যক। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ফলপ্রদ অভিভাবকত্বে মহানগরীর অবশিষ্ট জলাধারসমূহকে ভরাট করে ফেলা থেকে বাঁচানোর লক্ষ্যে জনস্বার্থেই এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে